ঝোঁপঝাড়ের পর একটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে একটা ঝুপসিকালো গাছ। তার তলায় কারা বসে চাপাস্বরে কথাবার্তা বলছে! কিন্তু যেই আমরা সেখানে গেছি, লোকগুলো, ওরে বাবা! এরা আবার কারাবলে চ্যাঁচিমেচি করে দৌড়ে উধাও হয়ে গেল।
ছোটমামা বললেন,-যা বাব্বা! আমাদের দেখে ওরা ভয় পেল কেন? আমরা মানুষ না ভূ-ভূত?
গাছটার তলায় গিয়ে দেখি, কে খাঁটিয়ায় শুয়ে আছে। ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন,–সর্বনাশ! এখানেই তো তাহলে কঙ্কালিতলার শ্মশান। ওরা একটা মড়া পোড়াতে এসেছিল।
মড়াটা দেখে গা ছমছম করছিল। গলা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে। জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোটমামা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে পা বাড়িয়েছেন, সেই সময় খাঁটিয়া থেকে মড়াটা বলে উঠল,–চিতা সাজানো হয়েছে?
ছোটমামা বললেন, ওরে বাবা। এ যে দেখছি জ্যান্ত মড়া! পালিয়ে আয় পুঁটু!
মড়াটা তড়াক করে উঠে বসে বলল,–পালিয়ে যাবেন না, পালিয়ে যাবেন! একা থাকতে আমার বড্ড ভয় করবে।
পুঁটু! রেডি স্টেডি গো! বলে ছোটমামা দৌড়তে শুরু করলেন।
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছোটমামার পিছনে ছুটতে থাকলুম। কিন্তু বড় বিচ্ছিরি ঝোঁপঝাড়। কোথাও চষা খেতের মাটি গাদা হয়ে আছে! তার ওপর দৌড়নো কঠিন। বারতিনেক আছাড় খেলুম। ছোটমামা একবার থেমে পিছনে তাকিয়ে বললেন, সর্বনাশ! মড়াটা ছুটে আসছে যে!
মড়াটার আর্তনাদ শুনতে পেলুম, দাদা! আমাকে ফেলে যাবেন না!
আবার আমাদের দৌড়নো শুরু হল। এবার এসে পৌঁছলুম গাছপালা ঘেরা একটা বাড়ির কাছে! ছোটমামা বললেন, আবার ভুল হয়ে গেছে রে পুঁটু! অন্য একটা গ্রামে চলে এসেছি মনে হচ্ছে। আয় তো এদের ডাকি!
কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর দরজা খুলে কে একজন বলল, কাকে চাই?
ছোটমামা বললেন,–দেখুন, আমরা বড় বিপদে পড়েছি। তাই…
–বিপদটা কী আগে শুনি?
–কঙ্কালিতলার শ্মশানের ওখানে একটা মড়া ছিল। হঠাৎ সে…
লোকটা ঝটপট বলল,–থাকারই কথা। আমাদের ছোটকর্তার মড়া। তা এখনও চিতেয় ওঠেননি বুঝি?
ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, আমাদের ফলো করে আসছিলেন ভদ্রলোক। বলছিলেন শ্মশানে ওঁর একা থাকতে বড্ড ভয় করবে।
–মলোচ্ছাই! আমাদের লোকগুলো কোথায় গেল? তারা ছিল না?
–ছিল তো! হঠাৎ ওখানে দেখে ওরা কেন যে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল!
লোকটা খি-খি করে হেসে বলল,–তা ভয় পাওয়ারই কথা। রাতবিরেতে কাকেও চেনা কঠিন। এই তো আপনাদের দেখেও আমি দিব্যি ভয় পাচ্ছি।
ছোটমামা জোরে হাত নেড়ে বললেন,–আমরা মানুষ! মানুষ! আমাদের ভয় পাবেন কেন?
–কিছু বলা যায় না মশাই! দিনকাল যা পড়েছে। কে জানে কে কোন রূপ ধরে ঘোরে।
ছোটমামা তার দিকে এক পা এগিয়ে বললেন, আপনি আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখুন। আমরা মানুষ। এই ছেলেটা আমার ভাগ্নে। আমি ওর মামা। আমরা যাত্রা দেখে বাড়ি ফিরছিলাম। রাস্তা ভুল করে এই অবস্থা। এই নিন, আমার হাতটা ঠান্ডা না গরম দেখুন। আমরা ভূত হলে হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হবে।
ছোটমামা হাত বাড়িয়ে আর এক পা এগোতেই লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, হাত সরান! হাত সরান। ওরে বাবা! হাত বাড়িয়ে ঘাড়টি ধরে মটকাবার মতলব? বড়কর্তা? বড়কা! একবার আসুন তো!
হেঁড়ে গলায় বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বলল, কী হল রে ভূতু?
লোকটা বলল,-কারা এসে গণ্ডগোল বাধাচ্ছে।
–দরজা বন্ধ করে দে।
আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ছোটমামা বললেন,–কোনও মানে হয়?
বললুম, চলুন ছোটমামা! অন্য কোনও বাড়ির লোক ডেকে জিগ্যেস করে নিই।
দুজনে হাঁটতে থাকলুম। আশেপাশের আর কোনও বাড়ি নেই। ঝোঁপজঙ্গলে আর উঁচু-নিচু সব গাছ বাতাসে দুলছে। একটু পরে আর একটা বাড়ি দেখতে পেলুম। ছোটমামার ডাকাডাকিতে বাড়ির ভেতর থেকে কে ঘুমজড়ানো গলার সাড়া দিল, কী হয়েছে?
ছোটমামা বললেন, দয়া করে একটু বাইরে আসবেন?
–না বাইরে যাওয়ার সময় নেই। আমি ঘুমুচ্ছি।
ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন,–কোথায় ঘুমুচ্ছেন? এই তো দিব্যি কথা বলছেন।
–ঘুমুতে-ঘুমুতে কথা বলা আমার অভ্যাস।
–কী অদ্ভুত! আচ্ছা, ঠিক আছে। ঘুমুতে-ঘুমুতে বলুন, আমরা কনকপুর যাব কোন রাস্তায়?
–কনকপুর? সে আবার কোথায়?
–কনকপুর চেনেন না? বাসরাস্তার ধারে অত বড় গ্রাম।
–বাসরাস্তার ধারে তো কত বড়-বড় গ্রাম আছে।
ছোটমামা হতাশ ভঙ্গিতে বললেন,–ভারি বিপদে পড়া গেল দেখছি। আচ্ছা, এ গ্রামের নাম কী?
জবাব এল তেমনি ঘুমজড়ানো গলায়, নাম একটা ছিল যেন। মনে পড়ছে না।
ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন, আপনি দেখছি ভারি অদ্ভুত লোক। নাম ছিল মানে কী!
এবার জোরালো নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল। ছোটমামা খুব রেগে গেছেন। দরজায় দমাদ্দম লাথি মারতে শুরু করলেন। কপাট ভেঙে পড়ল মড়মড় করে। আমার ভয় করছিল ছোটমামার কাণ্ড দেখে। পাশের বাড়ির লোকেরা জেগে গিয়ে হইচই বাধায় যদি? রাতদুপুরে কারও বাড়ির দরজা ভেঙে ঢোকা কি ঠিক হচ্ছে?
কিন্তু ছোটমামা একেবারে মরিয়া। ভেতরে পা বাড়িয়ে বললেন,–আয় পুঁটু! লোকটাকে ঘুম থেকে জাগানো দরকার। ঘুমের ঘোরে মাথামুণ্ডু কী সব বলছে।
ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখলুম, একটা লোক উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার নাক ডাকছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমুতে পারে মানুষ? উঠোনে সাদা হয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে। লোকটার নাক থেকে ঘড়র-ঘড়র শব্দ হচ্ছে। ছোটমামা তার গায়ে ধাক্কা দিয়েই পিছিয়ে এলেন। বললুম, কী হল ছোটমামা?
