চমকে উঠে দেখি, সামনে একটু তফাতে কেউ সদ্য উঠে দাঁড়াল। জ্যোৎস্নায় চেহারাটা আবছা কালো। ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন,–কে, কে?
–আজ্ঞে আমি।
–আমি মানে কী? তোমার নাম?
–নাম শুনে কী হবে? দারোগাবাবু কোথায় লুকিয়ে আছেন বলুন।
ছোটমামা কিছু বলার আগে আমি বলে দিলুম,–দিঘির পাড়ে একটা তালগাছের ডগায়।
অমনি ছায়া কালো লোকটা বলে উঠল, ওরে বাবা! আমি তো ওখানেই ঘুমোতে যাচ্ছিলুম। সর্বনাশ!
বলেই সে উধাও হয়ে গেল। ছোটমামা হেসে ফেললেন,–এই লোকটাই চোর। বুঝলি তো পুঁটু? একে ধরার জন্যই দারোগাবাবু ওখানে ওত পেতেছেন।
বললুম,–কিন্তু উনি তো ঘুমোচ্ছেন বললেন! নিজের বাড়িও বললেন!
–ধুর বোকা! পুলিশের কথা ওইরকমই। আসল কথাটা বললে চলে? চোর সাবধান হয়ে যাবে না?
–কিন্তু শেষপর্যন্ত চোর সাবধান হয়ে গেল তো!
ছোটমামা গুম হয়ে বললেন, আমার কী দোষ? চোর যে এখানে লুকিয়ে আছে, জানতুম নাকি?
আবার দুজনে হাঁটতে থাকলুম। ছোটমামার গানের মুডটা চলে গেছে মনে হচ্ছিল। চুপচাপ হাঁটছেন আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। বরাবর দেখেছি, ছোটমামার সঙ্গে রাতবিরেতে বেরোলে বড্ড গোলমেলে কাণ্ড হয়। আমার গা ছমছম করছিল। ছোটমামাকে এদিক-ওদিক তাকাতে এবং কখনও হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে কান ধরে কিছু শুনতে দেখছিলুম। তারপর বললেন,–শোন পুটু! কথাটা মনে আছে তো? দরকার হলে দৌড়নোর জন্য রেডি থাকতে হবে।
ভয়ে ভয়ে বললুম, আবার দৌড়তে হবে কেন ছোটমামা?
–কিছু বলা যায় না! সামনে কালোমতো যে গাছটা দেখছিস, ওটা জটাবাবার থান। একবার এমনি রাত্তিরে জটাবাবার পাল্লায় পড়েছিলুম। ওঃ! সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড।
আরও ভয় পেয়ে বললুম,-তাহলে ওখান দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না ছোটমামা।
ছোটমামা পা বাড়িয়ে বললেন, আয় না দেখি কী হয়। সেবার আমি একা ছিলুম। এবার দুজনে আছি। জটাবাবা আমাদের ঘাঁটাতে সাহস পাবে না!
–জটাবাবা কে ছোটমামা?
–একটা বুড়োমতো লোক। মাথায় প্রচুর জটা।
–সে ওখানে কী করে?
–বললুম না ওখানে ওর থান আছে? দিনের বেলা লোকেরা এসে ওখানে মানত করে। ঢাকঢোল বাজিয়ে জটাবাবার পুজোও দেয়। তবে দিনের বেলা জটাবাবা কাকেও দেখা দেয় না।
–দিনের বেলা জটাবাবা কোথায় থাকে?
ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, চুপচাপ আয় তো, জটাবাবা শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি।
গাছটা প্রকাণ্ড। তলায় ঘন ছায়া। বাতাসে ডালপালা কেমন অদ্ভুত শব্দ করছিল। ছোটমামা আবার একটুখানি দাঁড়িয়ে গাছটাকে দেখে নিলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, রেডি স্টেডি, গো-ও।
ছোটমামার পিছন পিছন গাছটার তলায় যেই গেছি, আমার মাথায় কী একটা ঠেকল। চমকে উঠে হাত তুলে দেখি, একটা পা। বারণ ভুলে চেঁচিয়ে উঠলুম, ছোটমামা! ছোটমামা!
–ধ্যাত্তেরি! চ্যাঁচিচ্ছিস কেন? বললুম চুপচাপ চলে আয়।
–একটা পা বড় ঠান্ডা, ছোটমামা!
–চলে আয় না হতভাগা!
আমাকে যেতে দিচ্ছে না যে?—কাঁদ-কাঁদ হয়ে বললুম। বরফের মতো ঠান্ডা একটা পা আমার গলা আঁকড়ে ধরে আছে। দু-হাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলুম। দম আটকে যাচ্ছিল।
ছোটমামা কাছে এসে বললেন, কই, কোথায় পা?
–আমার গলায়।
ছোটমামা সেই ঠান্ডা ঝুলন্ত পা ধরে টানাটানি শুরু করলেন। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। খুব জোরে পায়ে চিমটি কেটে দিলুম। অমনি পা টা গলা থেকে সড়ে গেল আর কে ওপর থেকে আর্তনাদ করে উঠল, উচ্ছ। গেছি, গেছি! কী বিষ্টু ছেলে রে বাবা!
আমিও সাহস পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম,–ছোটমামা! টানুন! দুজনে টেনে নামাই জটাবাবাকে।
ছোটমামাও ততক্ষণে সাহসী হয়ে উঠেছেন। দুজনে ঠান্ডা পা ধরে টানতে থাকলুম। জটাবাবা ঠ্যাং ঝুলিয়ে ডালে বসে থাকার বিপদ টের পেল এতক্ষণে। কাকুতিমিনতি করে বলতে থাকল,–ঘাট হয়েছে বাবারা! ছেড়ে দে! উঁহুহুহ, বড্ড ব্যথা করছে রে!
ছোটমামা পা ছেড়ে দিলেন। আমিও ছেড়ে দিলাম। তারপর ছোটমামা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, কী জটাবাবা! সেবার তো আমাকে একা পেয়ে খুব ভয় দেখিয়েছিলে? এবার আর ভয় পাচ্ছি না। কই নেমে এসো। দেখি তোমার কত বুজরুকি?
গাছের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে। ওপরের ডালে জটাবাবাকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। পায়ে হাত বুলিয়ে আহা-উঁহু করছে। মাথার প্রকাণ্ড জটা পুঁটুলির মতো দেখাচ্ছে। ছোটমামার চ্যালেঞ্জ শুনে কোনও জবাব দিল না! চিমটিটা খুব জোর হয়ে গেছে–তাহলে।
বললুম,–আমার ঘুম পাচ্ছে। চলুন ছোটমামা!
ছোটমামা বীরদর্পে হাঁটতে থাকলেন। বললেন,–তোর বুদ্ধি আছে পুঁটু! খুব জব্দ হয়ে গেছে জটাবাবা।
–জটাবাবার পা অত ঠান্ডা কেন ছোটমামা?
–ঠান্ডা হবে না? জটাবাবাকে তুই জ্যান্ত মানুষ ভেবেছিস নাকি?
চমকে উঠে বললুম, জ্যান্ত মানুষ নয়? তা হলে কী?
ছোটমামা চাপাস্বরে বললেন, বাড়ি ফিরে বলবখন। রাত-বিরেতে নিরিবিলি জায়গায় ওসব কথা বলতে নেই।
এবার ছোটমামার মনে সাহস জেগেছে। তাই যাত্রদলের বিবেকের সেই গানটা গাইতে শুরু করলেন। কিছুটা চলার পর হঠাৎ গান থামিয়ে বললেন, ভুল হয়ে গেছে। বুঝলি পুঁটু?
–কী ভুল ছোটমামা?
ডান দিকে আঙুল তুলে ছোটমামা বললেন, ভুল করে কঙ্কালিতলায় ঝিলের ধারে এসে পড়েছি। এখানে কোথায় একটা শ্মশান আছে যেন। বড় বিপদে পড়া গেল দেখছি।
একটু ভেবে নিয়ে ঝিলের ধারে ধারে হাঁটতে শুরু করলেন। ঝিলের জল জ্যোৎস্নায় ঝিকমিক করছে। ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কিছুটা চলার পর কারা কথা বলছে শোনা গেল। ছোটমামা বললেন,–মনে হচ্ছে, জেলেরা ঝিলে মাছ ধরতে এসেছে। আয় তো! ওদের কাছে রাস্তাটা জেনে নিই।
