–পর্ণা! তুমি পর্ণা তাহলে…
–তাহলে? তাহলে কী? হঠাৎ থেমে গেলেন যে?
–ওই ঘরে একটা ডেডবডি। জাস্ট নাও মার্ডার্ড! অবিকল তোমার মতো একটা মেয়ে।
অবিকল আমার মতো! –পর্ণার কণ্ঠস্বরে চিড় খেল। সে তো আমিই।
–পর্ণা! আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এ হেঁয়ালির অর্থ কী?
পর্ণা আরও এগিয়ে এল। সেই তীব্র সৌরভ আবার। কিন্তু এই জ্যোৎস্নায় সৌরভের সঙ্গে আরও কী মিশে আছে। সুঘ্রাণটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হিংস্রতর হচ্ছে। সে শ্বাসপ্রশ্বাসময় কণ্ঠস্বরে বলল, আপনা মাসে হরিণা বৈরী। তুমি চর্যাপদ পড়োনি?
-–পর্ণা! দোহাই তোমার, বুঝিয়ে দাও এর অর্থ কী?
–আমাকে কেউ ভালোবাসেনি। সবাই ভালবাসত আমার এই শরীরটাকে। তাই এখন এই শরীরটাই সাজিয়েগুছিয়ে সেন্ট মেখে ঘুরে বেড়াই। অথচ আমি চেয়েছিলুম, আমার আত্মাকে কেউ ভালোবাসুক।
–পর্ণা! পর্ণা তুমি…
চুপ! এখন আমি তোমার কাছে একটু ভালোবাসা চাইতে এসেছি। দেবে তুমি? –বলে সে আরও কাছে এগিয়ে এল। তারপর আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুহাতে জড়িয়ে ধরল আমাকে। কিন্তু কী অসহ্য হিম তার শরীর! নিষ্ঠুর হিম আর কামনায় হিংস্র শরীরের চাপে আমার দম আটকে গেল। প্রচণ্ড আতঙ্কে মাথা ঘুরে উঠল। মনে হল, অতল শূন্যে তলিয়ে যাচ্ছি।…..
স্যার-স্যার!–শুনে চোখ খুলে দেখি, জেভিয়ার আমার পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে একটুকরো গরম পশমি কাপড়। আমার পায়ের তলায় সেঁক দিতে দিতে বললেন,-মর্নিংয়ে এসে দেখি আপনি লনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। হোয়াট হ্যাপেন্ড?
মিঃ জেভিয়ার! অতিকষ্টে বললুম, পর্ণা কে?
জেভিয়ার চমকে উঠে বললেন,–ও মাই গড। তারপর দ্রুত বুকে ক্রুশ আঁকলেন। একটু পরে আস্তে বললেন, শি ওয়াজ আ স্কুল টিচার। এই ফ্যামিলিরই মেয়ে। মুনভিলায় মায়ের সঙ্গে থাকত। হঠাৎ একরাত্রে খুন হয়ে যায়। সরি স্যার, শি ওয়াজ জাস্ট আ নটি লাভগার্ল! ওকে! ডোন্ট ওরি! আর আপনাকে এখানে থাকতে হবে না। আমি বরং অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।…
জ্যোৎস্নারাতে আপদ-বিপদ
ছোটমামার সঙ্গে পাশের গ্রামে যাত্রা শুনতে গিয়েছিলুম। যাত্রার আসর যখন হোভাঙল তখন অনেক রাত। ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। ছোটমামা বললেন, এত রাতে আর বাস পাওয়া যাবে না। আয়, বরং হাঁটাপথে শর্টকাট করি।
পিচের রাস্তা থেকে ছোটমামার পিছন পিছন মাঠে নেমে বললুম,–পথ কোথায় ছোটমামা? আপনি যে হাঁটাপথ বলছেন?
ছোটমামা সবে গুনগুন করে কী গান ধরেছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন,–দিলি তো মুডটা নষ্ট করে! হাঁটাপথ বুঝিসনে? যেখান দিয়ে তুই হাঁটবি, সেটাই হাঁটাপথ। চুপচাপ চলে আয়।
নির্জন মাঠে হু হু করে বাতাস বইছে। এদিকে-ওদিকে দু-একটা গাছ কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শনশন শব্দে ডালপালা দুলছে। ছোটমামার গানের মুডটা ফিরে এসেছে। এবার গলা ছেড়ে গান ধরেছেন। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সুরটা চেনা ঠেকছিল। ছোটমামা তাহলে যাত্রার আসরে শোনা বিবেকের গানই গাইছেন। একটু পরে আমরা একটা দিঘির পাড়ে পৌঁছলুম! অনেকগুলো তালগাছ সেখানে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাতাগুলো অদ্ভুত শব্দে নড়ছে। হঠাৎ কে ধমক দিয়ে বলে উঠল, কী হে ছোকরা, আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে?
কেমন খ্যানখেনে গলার স্বর। ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, অদ্ভুত তো! ঘর ছেড়ে দিঘির পাড়ে ঘুমোতে এসেছ। কে হে তুমি?
–আবার তুমি বলা হচ্ছে? ভারি বেয়াদপ ছোকরা দেখছি।
ছোটমামা একটু ভড়কে গিয়ে বললেন, আপনি কোথায় ঘুমোচ্ছেন?
–তালগাছের ডগায়।
এতক্ষণে টের পেলুম, সামনে একটা তালগাছের মাথা থেকে কেউ কথা বলছে। ছোটমামা হাসতে-হাসতে বললেন, তালগাছের ডগা কি ঘুমোনোর জায়গা? ঘুম পেলে বাড়ি গিয়ে ঘুমোন।
–এটাই তো আমার বাড়ি।
–তার মানে?
–মানে আবার কী? যাও, বিরক্ত কোরো না। আবার বড্ড ঘুম পাচ্ছে।
বিকট হাই তোলার শব্দ শোনা গেল। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ছোটমামা গোঁ ধরে বললেন,-এর একটা এসপার-ওসপার না করে যাব না। তালগাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে বলে তো শুনিনি। গাছের তলায় অবশ্যি অনেক মানুষকে ঘুমোতে দেখেছি। ও মশাই, শুনছেন?
–জ্বালাতন! শোনো হে ছোকরা, এখনই কেটে না পড়লে বিপদ হবে বলে দিচ্ছি।
ছোটমামার হাত ধরে টেনে বললুম,–আমার বড্ড ভয় করছে। চলুন ছোটমামা।
ছোটমামা রেগে গিয়ে বললেন,–তুই বড্ড ভিতু ছেলে দেখছি। ব্যাপারটা তোর গোলমেলে মনে হচ্ছে না? তালগাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে! লোকটা নিশ্চয় চোর। পুলিশের ভয়ে ওখানে লুকিয়ে আছে।
এবার ওপর থেকে হুঙ্কার শোনা গেল, কী বললে! কী বললে? আমি চোর? আমি পুলিশের দারোগা বংকুবিহারী ধাড়া। আমাকে চোর বলা হচ্ছে? রোসো, দেখাচ্ছি মজা।
তালগাছের ডগায় পাতাগুলো প্রচণ্ড নড়তে লাগল। এবার ছোটমামা হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন। চাপাস্বরে বললেন, দরকার হলে দৌডুতে হবে। রেডি হয়ে থাক।
দৌড়নোর দরকার হল না। বংকুবিহারী পাড়ার কোনও সাড়া পাওয়া গেল না আর। কিছুটা চলার পর ছোটমামা বললেন,-ব্যাপারটা বড় রহস্যজনক। বুঝলি পুঁটু? আমার ধারণা, দারোগাবাবু কোনও চোরকে ধরার জন্যে ওখানে লুকিয়ে আছেন।
ছোটমামার কথা শেষ হওয়ামাত্র কে চাপাস্বরে বলে উঠল,–কোথায় লুকিয়ে আছেন দারোগাবাবু?
