–চোর-ডাকাত আছে নাকি?
–সে আর কোথায় নেই? তবে…এনিওয়ে, বাইরে যা কিছু ঘটুক, যেন দরজা খুলে বেরুবেন না।
–আচ্ছা মিঃ জেভিয়ার, জংলি জানোয়ার আছে নাকি ওইসব জঙ্গলে?
শেয়াল আছে। জেভিয়ার শিশুর মতো হাসলেন, অবশ্য ওই যে নদীর ওপারে টিলা, ওখানে নাকি একটা শম্বর আছে। রাত্রে ডাক শোনা যায়। আমি কিন্তু শুনিনি স্যার!
জেভিয়ার চলে গেলেন কিচেনের দিকে। দিনশেষের ধূসরতা ঘনিয়েছে। লনের ডানদিকে বিধ্বস্ত ফোয়ারা ঘিরে প্রকাণ্ড গুল্মলতা। আবছা একটা মূর্তি ভেসে উঠল সেখানে। পর্ণা! সঙ্গে সঙ্গে চাপাস্বরে ডাকলুম,–পর্ণা! পর্ণা! জেভিয়ার বুড়োর যেন জন্তুর কান। কিচেন থেকে সাড়া দিলেন, জাস্ট আ মিনিট স্যার। পর্ণা মুছে গেল অমনি।…
জেভিয়ার সাইকেলে চেপে চলে যাওয়ার পর পর্ণার প্রতীক্ষায় ছটফট করছিলুম। বারান্দায় বসে বারবার টর্চের আলো ফেলছিলুম। ভাবছিলুম, এবার ওকে দেখে প্রকৃতিকন্যা বলে সম্ভাষণ করব। তারপর মনে হল, সন্ধ্যার পর আর কি ওকে বাড়ি থেকে বুেরতে দেবে, অথবা বসতি থেকে দূরে এই মুনভিলায় রাতের দিকে কেনই বা সে আসবে? আমি তার প্রেমে পড়তেই পারি, সে কেন পড়তে যাবে?
নদীর ওধারে টিলার মাথায় কতক্ষণ পরে চাঁদ উঠল। কুয়াশা তার জ্যোৎস্নাকে নিষ্প্রভ করে দিল। নিচের দিকে একদল শেয়াল ডাকাডাকি করে সহসা থেমে গেল। একটা পেঁচা কাওকাঁও শব্দ করতে করতে মুনভিলার ওপর দিয়ে চলে গেল। ক্রমে টের পেলুম জীবজগতে সাড়া পড়ে গেছে। পোকামাকড় ডাকছে। কখনও মাথার ভেতর, কখনও পারিপার্শ্বিকে আশ্চর্য প্রাকৃতিক সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা। আর কোনও মৌন নেই, শুধু শব্দ। ধ্বনিময়তা। বৃক্ষলতা থেকে শিশির পড়ার শব্দগুলিও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু নির্জনতা বড় অসহ্য। পর্ণা যদি আসত।
আটটা বাজলে কিচেনে হ্যারিকেনের আলোয় ডিনার খেয়ে নিলুম। খাদ্যের ব্যাপারেও জেভিয়ার ব্রিটিশ ঐতিহ্যের পক্ষপাতী। তবে আমি একেবারে ভে্তো বাঙালি। কাল বরং ওঁকে বলব, ডাল-ভাত আর একটুকরো মাছই আমার জন্য যথেষ্ট।
কিচেন বন্ধ করে তালা এঁটে হ্যারিকেন হাতে আমার ঘরে ফিরলুম। সিগারেট টানতে-টানতে আবার পর্ণার প্রতীক্ষা! কোথাও রাতপাখি ডাকতে থাকল। দরজা বন্ধ করে হ্যারিকেনের দম কমিয়ে খাটের তলায় রেখে শুয়ে পড়লুম। জানালাগুলি খোলা রইল। বন্ধ করলে স্বস্তি পাওয়া যেত। কিন্তু বদ্ধ ঘরে শুতে পারি না। একটা পোডো বাড়িতে একা রাত কাটানো এই প্রথম। খালি গা ছমছম আর অস্বস্তি। অথচ পর্ণার কথা ভাবতেই কেন যেন মনে হচ্ছে, আমি একা নই।
মশার উপদ্রব। তাই মশারি আছে। চিত হয়ে শুয়ে যতবার অন্য কিছু ভাবতে যাচ্ছি, পর্ণা মনে এসে দাঁড়াচ্ছে। প্রকৃতিকন্যার লাবণ্য, আর সেই ঝাঝালো সৌরভ স্মৃতি যা সমস্ত জীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে।
কতক্ষণ পরে কোথাও কোনও ঘরের ভেতর চাপা শব্দে চমকে উঠলুম। শব্দটা ধস্তাধস্তি কিম্বা শ্বাসপ্রশ্বাসের। জেভিয়ার বলেছিলেন, যেন না বেরোই। কিন্তু শব্দটা বাড়ছে। টেবিলচেয়ার পড়ে যাওয়া, কাঁচ ভাঙা, শ্বাসপ্রশ্বাসটার বাম্প্রয় হয়ে ওঠে। তারপর গোঙানি, ঘড়ঘড়। কী ঘটছে? হুড়মুড় করে উঠে বসলুম। ঘড়ঘড় শব্দটা মৃদু হয়ে আসছে।
আর চুপ করে থাকা অসম্ভব। চরম ধরনের আতঙ্ক মরিয়া করে তোলে খুব ভিতু মানুষকেও। তাছাড়া হঠাৎ মনে হল পর্ণা এসেছিল এবং তাকে অনুসরণ করে কোনও দুবৃর্ত ওর ওপর ঝাঁপ দিয়েছে। হিংস্র গর্জনের ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলুম, কে? কে?
তারপর টর্চ হাতে মশারি ঠেলে বেরিয়ে পড়লুম। ঘরের কোণায় একটা মরচে ধরা বল্লম দেখেছিলুম। বল্লমটা হাতে নিয়ে সেই শব্দটা কোন ঘরে থেকে আসছে জানতে কান পাতলুম। পেছনদিকের ঘর থেকে শব্দটা আসছে মনে হল। প্রচণ্ড জোরে লাথি মারলুম দরজায়। কপাটে মচমচ করে উঠল। দমাদ্দম লাথির পর একটা কপাট মড়মড় করে একপাশে ঝুলে গেল। ফাঁক দিয়ে টর্চের আলো ফেলেই আমার মাথা ঘুরে গেল। রক্ত হিম হয়ে পড়ল। দম আটকে গেল।
পর্ণাই! পুরোনো আসবাবপত্রের স্তূপে হেলান দেওয়ার ভঙ্গিতে দুপাশে হাত ছড়িয়ে আছে। শ্বাসনালি ফাঁক। চাপচাপ রক্ত।
চিৎকার করতে গিয়ে দেখি, গলা থেকে স্বর বেরুচ্ছে না। তারপর সেই ঘরে সৌরভ সহসা ঝাঁপিয়ে এলে ধাতস্থ হলুম। হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরের দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় গেলুম। এখনই জেভিয়ারের কাছে যাওয়া দরকার।
কিন্তু তার বাড়ি তো চিনি না।
বস্তি এলাকায় বাজারে এখনও লোক থাকা সম্ভব। বারান্দা থেকে নামছি, তখনও শরীর পাষাণভার। পা টলছে। গলা শুকনো। এখন চারদিকের কুয়াশা ঝলমলে জ্যোৎস্নায় ফাই। কালোকালো বৃক্ষলতা আবার ভয়াল জৈব হয়ে উঠেছে। নিচের নদীর জলে জ্যোৎস্না, নদীটাও হিংস্র নিষ্ঠুর হাসছে। গেটের কাছে সহসা আবছা এক মূর্তি। পর্ণার আততায়ীই বা! মরিয়া হয়ে বম তুলে এগিয়ে গেলুম। পারিপার্শ্বিক নিষ্ঠুর হিস্রেতা মুহূর্তে আমাকে ভর করেছিল।
কিন্তু তার ওপর টর্চের আলো পড়তেই থমকে দাঁড়ালুম। ভুল দেখছি না তো? পর্ণা! এ তো পর্ণাই।
সে হাত তুলে চোখ আড়াল করে চাপাস্বরে বলে উঠল, আঃ আলো নেভান।
তাহলে শ্বাসনালি কাটা রক্তাক্ত কার শরীর দেখে এলুম? নিশ্চয় অন্য কাউকে দেখেছি। পর্ণা এগিয়ে এসে তেমনি শ্বাস-প্রশ্বাসময় কণ্ঠস্বরে আবার বলল,–এমন করে কোথায় যাচ্ছেন?
