আর পর্ণা বলেছিল–পা তুললেই ঘাস গজায়। প্রকৃতি সর্বগ্রাসী।
বাড়িটার সামনের দিকটায় কবেকার মেরামতের কিছু ছাপ। পেছনদিকটা প্রকৃতি গিলে খাচ্ছে। কার্নিশে গাছ। দেয়ালে হিংস্র শেকড়-বাকড়। তারপর জঙ্গল হয়ে ওঠা লনের দিকে তাকাতেই অস্বস্তি জাগল। প্রতিটি গাছ যেন ভীষণ জৈব। ক্রুর চোখে আমাকে তাকিয়ে দেখছে।
অক্টোবরের শ্যামলা চারদিকে। সেই শ্যামলতাকে কেন যেন নির্দয় দেখাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে পেছনে কোনও আততায়ীর পায়ের শব্দ এবং মুখ ঘোরাতেই সে অশরীরী!
–স্যার!
জেভিয়ার এসে ডাকলেন।
হঠাৎ ডাকে চমকে উঠেছিলাম। জেভিয়ার বললেন, লাঞ্চ রেডি।
তারপর একটু হাসলেন, এনিথিং রং স্যার?
–না তো।
–আপনাকে তখন বলেছিলুম, লোনসিনেস কখনও অসহ্য হয়ে ওঠে। টেক ইট ইজি, স্যার।
–আচ্ছা মিঃ জেভিয়ার, এ বাড়িটার নাম মুনভিলা কেন?
জেভিয়ার আঙুল তুলে নিচের দিকটা দেখালেন, জাস্ট লুক অ্যান্ড ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড! ওই ছোট্ট নদীটা, স্যার! কী দেখছেন, বলুন!
–চন্দ্রকলার মতো। দা ক্রিসেন্ট মুন!
ঠিক তা-ই। জেভিয়ার বিনীতভাবে বললেন, যদি দয়া করে লাঞ্চ খেয়ে নেন, ভালো হয়। আমাকে একবার বেরুতে হবে কিছুক্ষণের জন্য।…
রান্নাটা বিলিতি ধাঁচের হলেও মন্দ নয়। খিদেও পেয়েছিল। জেভিয়ার চলে গেলে সেকেলে উঁচু খাটের ওপর শুয়ে পড়লুম। ট্রেনজার্নিতে যথেষ্ট ক্লান্ত। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। দরজা ভেজানো ছিল। সেটা কাঁচ শব্দে খুলে যাওয়ার জন্যই হয়তো ঘুমটা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাকিয়ে রইলুম। বাইরে নরম বিকেল।
বাতাসের চাপেই কি দরজা খুলে গেছে? হুহু করে বাতাস ঢুকছে ঘরে।
তারপরই তীব্র সেন্টের আভাস পেলুম। ট্রেনে দেখা পর্ণার সেই সৌরভ! ঝটপট উঠে বসে বললুম,–পর্ণা নাকি?
বললুম নয়, মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। অথচ একই সুগন্ধ। ঝাঝালো, তীক্ষ্ণ। চটিতে পা গলিয়ে এবার নিজের ইচ্ছায় ডাকলুম, পর্ণা! পর্ণা! কারণ সে নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও এসে গেছে। খেয়ালি বা ছিটগ্রস্থ মেয়ে, তাই আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।
একধারে বাথরুম, অন্য দুদিকে দরজাবন্ধ আরও ঘর। পর্ণা কি বাথরুমে এসে ঢুকেছে? বাথরুমের দরজা ভেজানো। একটু ইতস্তত করে দরজায় চাপ দিলুম। খুলে গেল। কিন্তু কেউ নেই।
অথচ ঘরভরা দুর্দান্ত সৌরভ। আর ক্রমশ, এতক্ষণে সেই সৌরভ মেয়েদের চুলের ঘ্রাণের মতো আকর্ষণ করছে। চাপা আর আকুল কণ্ঠস্বরে আবার ডাকলুম, –পর্ণা! পর্ণা! সহসা সুগন্ধটা মিলিয়ে গেল। লজ্জিত বোধ করলুম। ছি-ছি! এ কী রূপান্তর আমার মধ্যে! সমস্ত ভব্যতাকে এই জীর্ণ পুরোনো বাড়িটাই কি ঘষে তুলে ফেলতে চাইছে আমার চেতনা থেকে? প্রকৃতি কি মানুষকে নিছক জৈব করে ফেলে?
বেরিয়ে গেলুম। হাল্কা গোলাপি রোদ্দুরের গায়ে নীলাভ ধূসরতার মতো কী এক রং। হয়তো এখনই কুয়াশা ঘনিয়ে আসছে। ঢেকে দিতে চাইছে ক্রুর ও ভয়াল বৃক্ষলতাকে।
তাদের জৈবতাকে বিষাদের আড়ালে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। বিষাদ কথাটাই মনে এল। কারণ ততক্ষণে টের পেয়েছি, বাড়িটার জীবনে অনেক স্মৃতি আছে। তাই নস্টালজিয়ার বিষাদ আছে। গেটের দিকে এগিয়ে এলুম। ঢালু ঘাসে ঢাকা জমি নিচের নদীটিতে গিয়ে মিশেছে। তীব্র স্রোতের চাপা বিষণ্ণ শব্দ কানে এল। তারপর বাঁ-দিকে কিছুটা দূরে একটা গাছের তলায় আবিষ্কার করলুম পর্ণাকে! সে জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেঁচিয়ে ডাকলুম,–পর্ণা।
পর্ণা মুখ তুলে তাকাল। কোমল রোদ্দুরে তার সুন্দর দাঁতগুলি ঝিকমিক করে উঠল। গেট খুলে ঢালু সংকীর্ণ রাস্তায় পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে, আশ্চর্য, পর্ণা হঠাৎ গাছপালার আড়ালে উধাও হয়ে গেল! থমকে দাঁড়িয়ে গেলুম। তাহলে মেয়েটি সত্যি সাইকিক রুগি।
নিচে রাস্তার বাঁকে জেভিয়ারের টুপি দেখা গেল। সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে চড়াই ভাঙছেন। কাছাকাছি এসে বললেন,–গুড ইভনিং স্যার! এবং পুনশ্চ আগের মতো, এনিথিং রং?
আস্তে বললুম,-না।
চলুন। লনে চেয়ার পেতে দিচ্ছি, বসবেন বরং। সরি স্যার! ভালো চায়ের খোঁজে বেরিয়েছিলুম। হোপলেস! কেকরাডি ইজ গোয়িং টু ডাই ডে বাই ডে। নাথিং গুড এনিহোয়্যার। অল ফুল অফ দা এভিল! জেভিয়ার সকৌতুকে হাসছিলেন। তারপর আমি নিচে নদীর ধারে সেই গাছটার দিকে বারবার ঘুরে তাকাচ্ছি লক্ষ করে বললেন,–ওখানে শ্মশান। আর ওই যে ছোট্ট টিলাটা দেখতে পাচ্ছেন, ওটা খ্রিস্টিয়ান সিমেট্রি। আশা করি, আমাদের চার্চের ঐশও দেখতে পাচ্ছেন। ওই যে গাছপালার ফাঁকে।
পর্ণার কথা জিগ্যেস করতে গিয়ে পারলুম না। পর্ণা নিষেধ করেছিল বলেও না। গেটে ঢোকার মুখে আবার পিছু ফিরতেই নিচের দিকে ঝোঁপের আড়ালে পর্ণাকে দেখলুম। ঠোঠে আঙুল। ইশারায় জেভিয়ারকে দেখিয়ে হাত নেড়েছিল। তারপর আবার উধাও …
কিছুক্ষণ পরে লনে বসে চা খাচ্ছি। জেভিয়ার এসে কুণ্ঠিত মুখে বললেন, আমি দুঃখিত স্যার! আপনার ডিনার রেডি, রেখে যাচ্ছি। আপনাকে রাত্রে সঙ্গ দিতে পারছি না। আপনাকে একা থাকতে হবে। ও নো-নো! ডোন্ট ওরি, স্যার। আসলে আমার স্ত্রী অনেকদিন থেকে অসুস্থ। তাকে দেখাশুনোর লোক নেই।
–না না। আমি একা থাকতে পারব! আপনি ভাববেন না।
জেভিয়ার একটু হাসলেন,-খুব পুরোনো বাড়ি। পুরোটা মেরামত হয়নি। প্লাস্টার খসে পড়ার শব্দ শুনলে ভয় পাবেন না। পেছনকার ঘরগুলিকে ছুঁচো চামচিকেরা দখল করে ফেলেছে। রাত্রে ওরা উৎপাত করতে পারে। আর একটা কথা, কেউ ডাকলে যেন দরজা খুলবেন না।
