কামরা সৌন্দর্যময় সুগন্ধে ভরে গেল।
ব্যবসায়ীদ্বয়ের অবচেতনায় তার তীক্ষ্ণ বিচ্ছুরণ ঘটে থাকবে। কারণ দুজনেই চোখ খুলছেন এবং সোজা হয়ে বসলেন। জানলার দিকে ঘুরে আবার প্রকৃতি দর্শনে মন দিলুম।
–এক্সকিউজ মি! দ্রুত ঘুরে দেখি আমি তার লক্ষ্য। ভ্যাবার মতো হেসে বললুম,–বলুন!
–আপনি কি গয়া যাবেন?
–না। কেকরাডিহা।
–বাঃ! তাহলে একজন সঙ্গী পাওয়া গেল।
–আপনি কেকরাডিহা যাচ্ছেন? যুবতী ঠোঁটের কোণে হেসে মাথাটি একটু নাড়ল।
ব্যবসায়ীদ্বয়ের একজন বলে উঠলেন,–তো আপ হঁহা জংলি হল্টমে কাঁহা গেয়িথি ম্যাডাম?
জেরা সা ঘুমনে।–যুবতী আমার দিকে ঘুরল।–কেকারাডিহি কেন যাচ্ছেন?
প্রশ্নটা সোজা চার্জ। যেন মহিলা দাবোগা। তবু সৌন্দর্য এবং যৌবনের মর্যাদা রক্ষায় আস্তে-আস্তে বললুম,–জাস্ট সাইট-সিইং।
নেচার-লাভার! যুবতী উজ্জ্বল হাসল। বলতে পারেন, আমিও তা-ই।
–ও!
–ও কী? আমি প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিই মাঝে-মাঝে। কখনও বেরিয়ে আসি। ভয় পাই। দেয়ার ইজ সামথিং ভেরি ক্রুড ইন দা নেচার। দ্যাটস ডেঞ্জারাস। স্ট্রেঞ্জ! আপনাকে বোঝাতে পারব না।
এই দার্শনিক তত্ত্বটত্ত শুনে একটু সম্ভ্রম জাগল। শুধু বললুম,–তাই বুঝি?
একটু হেসে বললুম, আপনি স্কুলটিচার, নাকি অধ্যাপিকা?
–কেন এ কথা বলছেন?
এবার কণ্ঠস্বরে ঈষৎ নম্র ব্যাকুলতা ছিল। যেন সেন্টিমেন্টে আঘাত দিয়ে ফেলেছি। বললুম,–আপনার চিন্তাভাবনার ডেপথ দেখেই।
যুবতী হাসল, ও নো নো! জাস্ট আ সিম্পল আইডিয়া। অ্যাসোসিয়েশন অব দা নেচার। আপনি একজন নিরক্ষর জংলি মানুষকে জিগ্যেস করুন। সেও বলবে, দা নেচার স্পিকস টু ম্যান। প্রকৃতি কথা বলে। যে কাছে থাকে, সে বোঝে।
–আপনার নামটা জানতে পারি কি?
–শিওর। পর্ণা চোধুরী।
একটু ইতস্তত করে বললুম, কেকরাডিহার মুনভিলার চৌধুরীদের সঙ্গে আপনার কোনও সম্পর্ক নেই তো?
–আছে।
–অরীন্দ্র চৌধুরীকে তাহলে চেনেন?
–খু-উ-ব। আমার মাততুতো দাদা।
নড়ে উঠলুম, মাই গুডনেস! অরীন্দ্র আমার বন্ধু। আমি মুনভিলাতেই যাচ্ছি।
পর্ণা হঠাৎ ঠোঁট কামড়ে ধরল। আমার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে চাপা শ্বাস ফেলে বলল,–বাড়িটায় কেউ থাকে না আর। একজন আদিবাসী খ্রিস্টান কেয়ারটেকার রেখেছে। সে মাইনে নেয়! কিছু দেখাশোনা করে না। দূরে বসতি এরিয়ায় থাকে। আপনার অসুবিধে হবে।
–আপনাদের ফ্যামিলি…..
কথা কেড়ে পর্ণা বলল, একটা কথা, প্লিজ! কেয়ারটেকার ম্যাথু কিংবা অরুদাকে আমার কথা বলবেন না। প্লিজ, কথা দিন!
একটু অবাক হয়ে বললুম, ঠিক আছে। কিন্তু…
–কোনও কিন্তু নয়। কথা দিন।
–দিলুম।
ব্যবসায়ীদ্বয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কথা শুনছিলেন আর পরস্পর চোখে চোখে কথা বলছিলেন। বাঁকা ঠোঁট। ভাবখানা এরকম, যেন ওঁদের প্রাপ্য নাফা আমি হাতিয়ে নিয়েছি। কেকরাডিহা প্ল্যাটফর্মে ঢুকছিল। পর্ণা উঠে দরজার কাছে গেল এবং ট্রেন থামার আগেই পাখির মতো নেমে গেল। লাগেজ গুছিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে তাকে খুঁজলুম। দেখতে পেলুম না। ছোট্ট স্টেশন। মানুষজন কম। এদিকে-ওদিকে পাহাড় আর জঙ্গল। স্টেশনের বাইরের চত্বরে কয়েকটা এক্কা আর সাইকেল রিকশা। ছোট্ট একটা বাজার।
কেয়ারটেকার ম্যাথু জেভিয়ারের থাকার কথা স্টেশনে। অরীন্দ্র চেহারার একটা বর্ণনা দিয়েছিল। রোগা, কালো, মাথায় ভীষণ সাদা চুল এবং মধ্যিখানে টাক। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা, দাড়িটি নাকি কুচকুচে কালো। অরীন্দ্র বলেছিল,–ওকে মিঃ জেভিয়ার বলবি যেন। খুব কেতাদুরস্ত দিশি সাহেব, প্রাক্তন রেলকর্মী। সব সুব্যবস্থা করে দেবে খাতির দেখালে।
কিন্তু অরীন্দ্র তার মাসতুতো বোন পর্ণার কথা যেন বলল না? এতক্ষণে মনে হল, পর্ণা শিক্ষিত মেয়ে, কিন্তু একটু ছিটগ্রস্তা নির্ঘাত! হয়তো মানসিক রুগিই বা! তাই একা-একা যেখানে-সেখানে চলে যায়। জঙ্গলে ঘোরে। কিন্তু এ তো তার পক্ষে বড় বিপজ্জনক।
ফ্যামিলিতে কি ওকে শাসন করার কেউ নেই। নিশ্চয় নেই। কিংবা আছে। পর্ণা তাদের চোখের আড়ালে এভাবে ঘুরে বেড়ায়। তাই আমাকে নিষেধ করছিল।
একটা সিগারেটের দোকানের সামনে যেতেই বাঁকের মুখে সাইকেলে একজনকে দ্রুত আসতে দেখলুম। কাছাকাছি আসতেই মনে হল, ম্যাথু জেভিয়ার না হয়ে যান না। ডাকলুম,–মিঃ জেভিয়ার!
হ্যাঁ, তিনিই। রীতিমতো ভদ্রলোক এবং দিশি সায়েব। স্যুট পুরোনো হলেও স্যুট। টাইটা অবশ্য নতুন। টুপিট জীর্ণ, সাইকেল থেকে নেমে জোরালো হ্যান্ডশেক করে বললেন,–ভেরি সরি স্যার! আপনার রুম গোছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। রান্নার জন্য লোক খুঁজে সারা। তেমন কাউকে পেলুম না। ও নো, নো। ডোন্ট ওরি, স্যার! আমি আছি। আমি আপনার সেবা করতে পারলে ধন্য হব। তবে ভেরি লোনলি প্লেস! লোনলিনেস যাঁদের পছন্দ, তাঁরা মুনভিলাকে ভালো না বেসে পারবেন না। জাস্ট সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন!
জেভিয়ার একটু বেশি কথা বলেন, সেটা ঠিক। তবে মানুষটিকে ভালো লাগল।…
সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন! জেভিয়ারের মুখ থেকে উচ্চারিত পুরোনো এই বিলিতি প্রবচনটি মাথার ভেতরে ধ্বনিত হয়েছিল বাড়িটাকে দেখার সঙ্গে-সঙ্গেই। সত্যিই কি মুনভিলা প্রতীক সাইলেন্স, সুবর্ণ মৌন। জীর্ণ স্থাপত্যটি সারা ধূসর শরীরে শব্দময়। যে ভাষা আমি বুঝি না, তেমনি এক আদিম কোনও ভাষায় যেন কথা বলছে। শুনছি, বুঝতে পারছি না।
