সুতো খুলে ফেলে দিলুম। ভাঙা পালকটা হাতে নিয়ে ফের আমার গা শিরশির করতে থাকল। বললুম,–পালকটা তাহলে সত্যি জটায়ুর! হারুর কাছে কত দিয়ে কিনেছিলি রে?
ডন আবার ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। জ্যোৎস্নায় ওর সাদা সরু দাঁতগুলো ঝিমিক করছিল। বললুম, হাসছিস যে?
ডন জবাব দিল না। গুলতির মতো হঠাৎ বোঁও করে ছুটে গেল। অদ্ভুত ছেলে তো! এমন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পালকটার ওপর একটুও মায়া করল না দেখে অবাক লাগছিল।
কিন্তু হাসল কেন অমন করে? ভাঙা পালকটা পকেটে ভরে খুব ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে চললাম। হুঁ, ব্যাপারটা ভাববার মতো।…
জ্যোৎস্নায় মৃত্যুর ঘ্রাণ
কেকরাডিহাকে নেচারস ডেন বলা চলে।–ভদ্রলোক মিটিমিটি হেসে বললেন।
অপূর্ব মনোরম জায়গা কিন্তু…উনি হঠাৎ থেমে গেলে বললুম, কিন্তু কী? নামটা বড় বিচ্ছিরি। তাছাড়া…।
ওঁর কথার ঢংটিও বিচ্ছিরি। একটি বাক্য বলেই যেন সাসপেন্সের আলপিন দিয়ে একটু খোঁচা। বিরক্তি চেপে বললুম,–তাছাড়া কী?
একটু চুপ করে থাকার পর ফিক করে হাসলেননামেই মালুম। শেক্সপিয়ার যদিও বলেছেন নামে কী আসে-যায়! যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে যায়। ট্রেন তখন একটা পাহাড়ের সুড়ঙ্গে সবে ঢুকেছে। গতিও মন্থর। কামরা গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল।
অন্ধকারে ওঁর কথা অবশ্য থামল না,–এই যে দেখুন, আমি যাচ্ছি চরডিহায়। ঘন জঙ্গল এলাকা। সেখানে বসতি একেবারে কম। মানুষজনও কম। একটা কাঠগোলা। কিছু গোপ, মানে যাদের গরু-মোষ-ছাগল আছে আর কী! চাষবাস কদাচিৎ। খুব সজ্জন মানুস সব। তাহলে চোর শব্দটা কেন? হুঁ, মাঝে-মাঝে বাঘের উৎপাত হয়। এখন বাঘটাকে যদি গরুচোর বলা যায়, তাহলে আর কথা নেই। চোরডিহা নামটা মানিয়ে যায়। বলে উনি সেই ঘন জমাট অন্ধকারে হা-হা অট্টহাসি হেসে উঠলেন। এমন বিকট হাসি অন্ধকারে বড় অস্বস্তিকর। গা ছমছম করে।
বললুম, আলো জ্বালার ব্যবস্থা নেই ট্রেনে?
–মাত্র কয়েক মিনিট। এ সুড়ঙ্গটা তত কিছু লম্বা নয়। কেন? আপনার ভয় করছে নাকি?
–না। তবে অন্ধকারটর বিরক্তিকর। ট্রেনে কি ইলেকট্রিসিটি নেই?
–তাহলে কেকরাডিহায় যে বাড়িটাতে উঠবেন, সেটাও বিরক্তিকর মনে হবে।
–কেন বলুন তো?
মুনভিলায় আমিও একবার ছিলুম। ওখানে ইলেকট্রিসিটি নেই। তাছাড়া বাড়িটা-বলে ফের উনি চুপ।
সাসপেন্সের খোঁচা মারা এঁর দেখছি বড্ড বদভ্যাস। বিরক্তিতে আর কিছু জানতে চাইলুম না। কিন্তু একটু অবাক হলুম। অরীন্দ্র বিদ্যুৎ না থাকার কথাটা বলেনি। হয়তো বলতে ভুলে গেছে। অরীন্দ্র আমার বন্ধু। রীতিমতো রাজা-মহারাজা লোকের বংশধর। বিশুদ্ধ প্রকৃতিকে এনজয় করতে হলে নাকি কেকরাডিহার মতো জায়গা নেই। ওদের মুনভিলা নামে বাড়িটা একটা টিলার গায়ে এবং চারদিকে প্রকৃতি! অরীন্দ্র বলেছিল এসব কথা।
ট্রেন সুড়ঙ্গ পেরুলে দিনের আলো এসে ঢুকল আবার। ভদ্রলোক তার লাগেজ গোছাতে ব্যস্ত হলেন। আসানসোলে এই ট্রেনে ওঠার পর ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। উনি শিকারি। নাম প্রশান্ত সিংহ। খুব আমুদে স্বভাবের মানুষ। বলেছিলেন, স্বয়ং সিংহ হয়েও সিংহ-টিংহ মারার সুযোগ পাইনি মশাই! গুজরাতের গির জঙ্গলে একদঙ্গল সিংহ আছে। কিন্তু একে হাঁদা-ভোঁদা, তায় গভমেন্টের পোষ্য। তবে বাঘ মেরেছি। ত্রিপুরার জঙ্গলে একটা গুন্ডা হাতি মেরেছিলুম। কাজেই নিজেকে সিংহ ভেবে গর্বিত হই।
চোরডিহার জঙ্গলে বাঘ আছে। সম্প্রতি একটা বাঘ খুব উৎপাত করছে। তাকে মারতেই উনি যাচ্ছেন। একটা শটগান আর একটা রাইফেল দুই কাঁধে আটকে প্রকান্ড ব্যাগ হাতে উনি দরজার দিকে এগোলেন। ট্রেন চোরডিহা স্টেশনের ডাউন সিগন্যাল পেরুচ্ছিল। ঘুরে মুচকি হেসে বিদায়সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন,–কেকরাডিহায় দেখা হতেও পারে। অবশ্য যদি বাঘটাকে মারতে পারি, তবেই। যাই হোক, একটু সাবধানে থাকবেন।
কথাটা শুনে চমকে উঠলুম। এবার সাসপেন্স নয়, শাসানি। কিন্তু প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম না। শিকারি ভদ্রলোক ট্রেন থামার সঙ্গেসঙ্গেই নেমে প্ল্যাটফর্মে হস্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। ওঁর শেষ বাক্যটি অস্বস্তিকর। তাছাড়া নামেই মালুম বলতে কী বোঝায়? মন থেকে অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিলুম–তাছাড়া বাড়িটা… মানে কী? ভূতটুত আছে বুঝি! ধুস? মনে-মনে হেসে ফেললুম। এই মহাকাশযুগে ভূত!
ট্রেনের গন্তব্য গয়া। ফার্স্ট ক্লাসে আরও দুজন যাত্রী। চেহারা হাব-ভাব দেখে ব্যবসায়ী মনে হয়েছিল। হোঁতকা গোলা মানুষ। দুজনেই ঢুলছিলেন। আর একটা সুড়ঙ্গ এল। আবার সেই দম আটকানো অন্ধকার এবং গা ছমছম। কিন্তু এ সুড়ঙ্গটা শেষ হচ্ছে না। বারবার ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইল্প চাপা গুমগুম শব্দ, একটানা গাঢ় অন্ধকার, এসব সুড়ঙ্গে তো আলো থাকার কথা। ভাবলুম, চোরডিহার চোরেরা এসেই বাবগুলি খুলে নিয়ে গেছে, তা শিকারি ভদ্রলোক যাই বলুন। অথবা এলাকা এখনও বিদ্যুৎ পায়নি।
পাওয়ার কথাও না। পাহাড় আর জঙ্গল, জঙ্গল আর পাহাড় দুধারে। কাছাকাছি বসতিও চোখে পড়েনি। যদি বা পড়েছে, সেও নেহাত দেহাতি গ্রাম। আদিম ধরনের ঘরবাড়ি। মানুষজনও গরিব।
কতক্ষণ পরে সুড়ঙ্গ শেষ হল। আবার একটা স্টেশন এল। নিছক হল্ট। জনমানুষহীন নিচু প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু আমাকে অবাক করে পাখির মতো আলতো পায়ে এক যুবতী উঠে এল কামরায়। ছিমছাম স্মার্ট, ফর্সা, এবং এমন ফর্সা, যার সঙ্গে পাতাচাপা ঘাসই তুলনীয়, তাই পাণ্ডুর বলা চলে। জন্ডিসের রুগি নাকি? কক্ষনও না। ছটফটে, চঞ্চল, সতেজ। কালিদাস বর্ণিত সেই চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি পীনোন্নতপয়োধরা ইত্যাদি মনে পড়ে যায়। পরনে ফিকে নীল শিফন জর্জেট শাড়ি ম্যাচিং চাইনিজ ছাঁট ব্লাউজ।
