বেগতিক দেখে বললুম, উম! তোর সুতো ইঁদুরে ছিঁড়েছে। বাড়িতে কত ইঁদুর দেখতে পাসনে? থাম কালই একডজন বেড়াল এনে রাখব।
টম শান্ত হয়ে পড়তে বসল। এবার আমিই ডনকে খুঁজতে থাকলুম। টমের ভয়েই ডন নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে আছে। বাড়ির চারধারে সবজি ও ফুলফলের বাগান। জ্যোৎস্না ফুটেছে। বাগানে গিয়ে চাপা গলায় ডাকলুম,–ডন! ও ডন! বেরিয়ে আয়। অল ক্লিয়ার! তোর ভয় নেই। চলে আয়!
কিন্তু কোনও সাড়া পেলুম না। তাহলে কি পাশের বাড়ি ওর বন্ধুদের কাছে আছে? গিয়ে দেখি, সেখানেও নেই! গেল কোথায় ও? কাছাকাছি আরও কয়েকটা বাড়ি খোঁজাখুঁজি করলুম। কোথাও নেই। এবার একটু ভয় পেয়ে গেলুম। বাড়ি ফেরার মুখে নিশ্চয় টমের চেঁচামেচি শুনে কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু কোথায়?
হঠাৎ মনে পড়ল নাদুবাবুর ছেলে ন্যাড়ার সঙ্গে ডনকে ঘুরে বেড়াতে দেখি। নিশ্চয় ন্যাড়ার কাছে আছে ও। নাদুবাবুর বাড়ি নদীর ধারে খেলার মাঠের কাছে। সেখানে গিয়ে দেখি, ন্যাড়া তুষো মুখ করে পড়তে বসেছে। নাদুবাবু গম্ভীর গলায় ওকে মুখস্থ করাচ্ছেন, ক মূর্ধন্য ষয়ে টয়ে কষ্ট! জোরে-জোরে বল ক মূর্ধন্য ষয়ে… আমাকে দেখে মুখ নামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,–কে হ্যাঁ?
–আমি জ্যাঠামশাই! ন্যাড়ার সঙ্গে একটু দরকার ছিল।
ন্যাড়ার সঙ্গে? খুব অবাক হয়ে নাদু সিঙ্গি অনেকটা হাঁ করে ফেললেন,–নেডুর সঙ্গে তোমার কী?
ঝটপট বললুম,–মানে ডনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই…
খাপ্পা হয়ে সিঙ্গিমশাই বললেন, বোলো না! ওই পাজি হতচ্ছাড়া ছেলেটার কথা আমায় বলতে এসো না?
–আজ্ঞে না জ্যাঠামশাই! আপনাকে বলতে আসিনি। ন্যাড়াকে জিগ্যেস করতে এসেছি।
–নেডু কিছু জানে না। দেখছ না এখনও পড়তে বসেছে? ওকে ডিসটার্ব কোরো না।
ন্যাড়া বইয়ের পাতায় চোখ রেখে পড়া মুখস্থ করার সুরে বলে দিল,-ডন জটায়ুর পালক পেয়েছে। ডন মাঠে উড়ে চলে গেল।
মাঠে! মানে খেলার মাঠে? –উদ্বিগ্ন হয়ে জিগ্যেস করলুম। কিন্তু ও নেড়! উড়ে চলে গেল কী বলছ?
নাদুবাবু গর্জে উঠলেন, হয়েছে, হয়েছে। আর কোনও কথা নয়। কাজ নেই কম্ম নেই, রোজ খালি ডন ডন ডন। ডন ডন ডন ডন! হুঁ! উড়ে যাবে না তো কি হেঁটে যাবে? ভাগ্নের পিঠে ডানা গজিয়েছে যে। এবার চাদে গিয়ে বসে থাকবে।
হনহন করে খেলার মাঠে চলে গেলুম। তারপর যত জোরে পারি গলা ছেড়ে ডাকলুম, ডন! ডন! আচমকা একটা গাধা বিকট চেঁচিয়ে সাড়া দিল। পিলে চমকানো ডাক। আকাশে টোল-খাওয়া চকচকে উঁদ যেন মজা পেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। ঘাসে ভরা মাঠে জ্যোৎস্না ঝলমল করছিল। মাঠের শেষে নদীর ধারে পোড়া মন্দির ঘিরে একটা জঙ্গল। সেদিক থেকে ভেসে এল পেঁচার ক্রাও ক্রাও চেঁচানি। অমঙ্গলের ডাক! বুক কাঁপতে লাগল। ডনের কোনও বিপদ হয়নি তো?
এই রাতবিরেতে জঙ্গলটার দিকে পা বাড়াতে গা ছমছম করছিল। ভূত না থাকলেও ভূতের ভয়টা থাকে। কিন্তু ডন বেচারার জন্য তখন ভূতের সঙ্গে লড়াই করতেও তৈরি আছি। জঙ্গলের কাছাকাছি গিয়ে গলা ছেড়ে ফের ডাকলুম,–ডন! ডন!
এবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কান্না-জড়ানো গলায় কেউ চি-চি করে সাড়া দিল যেন। আরও খানিকটা এগিয়ে ডাকলুম,–ডন! তুই কোথায়?
মাথার ওপর থেকে করুণ সুরে ডন বলল,–এই যে এখানে মামা!
–সর্বনাশ! তুই গাছের ডালে কেন রে?
নামতে পারছিনে মামা! –ডন ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।
রেগেমেগে ভেংচি কেটে বললুম, নামতে পারছিনে মামা! হতভাগা ছেলে! গাছে উঠতে গেলি কেন? উঠলি যদি নামতেই পারলিনে কেন?
ডন কান্না থামিয়ে বলল, আমি কি গাছে চড়তে পারি? জটায়ু পাখির পালক আমায় উড়িয়ে এনেছে না?
হাসতে হাসতে বললুম,–উড়ে-উড়ে নামলিনে কেন তাহলে?
গাছের ডালে লেগে পালকটা ভেঙে গেল যে! –ডন আবার চিকুর ছেড়ে কেঁদে উঠল।
–কই লাফ দে। তোকে ধরে ফেলব।
–পারব না।
–চেষ্টা কর বাঁদর! রেডি! ওয়ান…টু…থ্রি…
ডন মরিয়া হয়ে লাফ দিল এবং তাকে ধরে ফেললুম। তারপর ছায়াঢাকা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ মাথায় এল, তাই ত! ডন গাছটাতে চড়তে পারল কেমন করে? চড়তে পারলে নামতে পারাটা কি কঠিন হতো? বরং চড়াটাই কঠিন, নামাটা সোজা।
আমার গা শিউরে উঠল। তাহলে কি সত্যি পালকটার কোনও আশ্চর্য ক্ষমতা আছে? মাঠে জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে বললুম,–দেখি পালকটা!
সত্যি পালকটা ভেঙে গেছে। পস্তানি হল, পালকটা না ভাঙলে একবার আমি নিজে পরখ করে দেখতুম। কিন্তু কী আর করা যাবে।
হাঁটতে-হাঁটতে বললুম, এ্যারে বোকা! গাছ থেকে যে নামতে পারছিলিনে, চেঁচিয়ে কাউকে ডাকলিনে কেন? বুদ্ধি করে আমি না এলে সারা রাত্তির তোকে গাছের ভালে থাকতে হতো।
ডন এবার ফিক করে হাসল,–জানো মামা, রামু-বোপা ওর গাধার পিঠে কাপড় চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেখে যেই ডেকেছি, ও রামুকাকা! আমায় নামিয়ে দেবে? অমনি রামু রাম-রাম বলতে বলতে গাধাটাকে ডাকিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল। আমি সন্ধ্যাবেলা গাছ থেকে ডেকেছি তো ভেবেছে ভূত! হি-হি-হি!
ডন খুব হাসতে লাগল। কথাটা কিন্তু ঠিক। ভাগ্যিস ডন আমার ভাগ্নে এবং তাকেই খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। নইলে অন্য কেউ ওই পোডড়া মন্দিরের জঙ্গল থেকে ডাকলে আমিও বেজায় ভয় পেতুম না কি?
ডনকে সুতোর ব্যাপারে টমের কথাটা বললুম। তখন ডন বলল, সুতোগুলো খুল দাও মামা। শিগগির!
