মাটিতে ছিপটি ঠুকে নিসিং পণ্ডিত বললেন,–চোপরাও! দাদা একমাস আগে সানিপাতিক জ্বরে ভুগে মারা গেছে! তাকে গঙ্গার ধারে দাহ করে এসেছি। আর বাঁদর বলে কি না, তাকে মন্দিরে বসে হুঁকো খেতে দেখেছে। অ বাবুল, এই মিথ্যুকটা বড় হয়ে কী হবে বল দিকি?
বাবুল ভেতর থেকে বলল,–তিন ঘা ছিপটি।
যাই হোক, আর মন্দিরের পথে শর্টকাট করে পাঠশালা যাতায়াত সেই শেষ। তবে মাঝে-মাঝে পড়া মুখস্থ করতে করতে হঠাৎ তামাকের ভুরভুরে মিঠে গন্ধটা ভেসে আসত মন্দিরের দিক থেকে। আর যেন অবেলায় ঘন্টাটাও চাপা ঢং করে বাজত। আশ্চর্য ব্যাপার, আমি ছাড়া আর কেউ এসব টের পেত না।
কিন্তু ঘণ্টাটা শেষপর্যন্ত নিসিং পণ্ডিত ফেরত পেয়েছিলেন। শুনেছি গয়ায় পিণ্ডি দিয়ে আসার পর একদিন মন্দিরে গিয়ে ঘণ্টাটা কুড়িয়ে পান। শিবলিঙ্গের পেছনে লুকোনো ছিল। এবং কোটাও।
কারণ পিণ্ডি পেয়ে মানুষের আত্মা উদ্ধার হয়ে যায় বটে, কাঁসর-ঘণ্টা আর হুঁকোর যে আত্মা নেই। তাই তাদের পৃথিবীতে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।
জটায়ুর পালক
সেদিন খুব মন দিয়ে একটা বই পড়ছি, পায়ে কুট করে যেন পিঁপড়ে কামড়াল। পা আলগোছে নাড়া দিয়ে ফের বইয়ের পাতায় ডুবে রইলাম। ভারি জমাটি গোয়েন্দা কাহিনি। গোয়েন্দা অফিসারকে বেঁধে ডাকাতরা বস্তায় ভরছে। এক্ষুনি সমুদ্রে ফেলে দেবে। কী হয় কী হয় অবস্থা। উত্তেজনায় আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠেছে।
ফের কুটুস করে যেন পিঁপড়ের কামড়। এবার যেন গেঁয়ো পিঁপড়ে। বিরক্ত হয়ে থাপ্পড় মারতে গিয়ে দেখি, শ্রীমান ডন টেবিলের তলায় বসে এই কম্মটি করছে।
খপ করে হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে তাকে বের করলুম। তারপর গর্জে বললুম,–তবে রে বাঁদর ছেলে! গুরুজনের সঙ্গে ইয়ার্কি!
ডন কাচুমাচু মুখে বলল,–অত যে ডাকলুম, তুমি তো শুনতেই পেলে না!
–তাই বলে তুই চিমটি কাটবি হতভাগা?
তোমার সঙ্গে যে আমার ভীষণ দরকার মামা! –ডন মুখে-চোখে কাকুতি মিনতি ফুটিয়ে বলল,–সত্যি বলছি, দারুণ দরকার!
ডনের দরকারে আমার সাড়া না দিয়ে উপায় নেই। কারণ, তাহলে আর বইটি পড়াই হয়ে উঠবে না। পিঁপড়ের কামড় দিয়ে সবে তার জ্বালাতনের নমুনা শুরু। এরপর জানলা দিয়ে আস্ত ইটের টুকরো এসে পড়ারও চান্স আছে। যা বিচ্ছু ছেলে!
তাই বললুম, ঝটপট বলে ফেল তাহলে। দেরি কোরো না। দেখ না আমি এখন ব্যস্ত।
ডন তার পিঠের দিকের জামার ভেতর থেকে কী একটা টেনে বের করল। অবাক হয়ে দেখি, আন্দাজ ফুটখানেক লম্বা একটা সাদা-কালোয় চকরাবকরা পালক। জানলা দিয়ে উপচে আসা শেষবেলার রোদ্দুরে পালকটাতে ফিনফিনে সবুজ রঙও ঝিলমিলিয়ে উঠল একবার। ডন বলল, বলো তো মামা, এটা কোন পাখির পালক?
পালকটাও ওর হাত থেকে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললুম,–ঠিক বুঝতে পারছি না। সারস জাতীয় কোনও পাখির পালক হয়তো। এ তুই কোথায় পেলি রে?
ডন মুখ টিপে হাসল। বলতে পারলে না তো! মামা, তুমি রামায়ণের গল্প পড়োনি?
–রামায়ণের সঙ্গে এটার কী সম্পর্ক?
ডন ফিসফিস করে বলল, রাবণরাজা সীতাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই যে একটা পাখি এসে রাবণরাজার মাথায় করে দিল আর মুকুট পড়ে গেল–তখন রাবণরাজা মারল তলোয়ারের কোপ। এক কোপে পাখিটার ডানা কেটে গেল। কী যেন নাম পাখিটার, বলো না মামা? পেটে আসছে, মুখে আসছে না…
হাসতে হাসতে বললুম,–হুঁ–জটায়ু পক্ষী।
টায়ুর পালক
–পক্ষী না মামা, পাখি!
–বেশ তাই হল।
স্বীকার করে নিলুম। নইলে কথা বাড়বে। ডনটা যা তবাজ–তো, তুই কি বলতে চাস, এটা সেই জটায়ুর পালক-মানে, রাবণের তলোয়ারের কোপে যেটা কাটা পড়েছিল?
ডন রহস্যের ভঙ্গি করে বলল,–ঠিক বলেছ। সেজন্যই তো তোমার কাছে এলাম।
–ঠিক আছে। এখন যাও, আমি ব্যস্ত!
ডন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ধুস! এখনও আমার দরকারটা বলাই হয়নি। তুমি জিগ্যেস করো পালকক্টা কোথায় পেলুম!
তারপর সে আমার জিগ্যেস করার আগেই বলতে শুরু করল, পালটা পেয়েছিল হারু-গয়লা–ওই যার খাটাল আছে শিবমন্দিরের পেছনে। কোথায় পেল জানো? তার একটা গরু বেজায় দুষ্টু। চরতে-চরতে নদীর ওপারে চলে গিয়েছিল। গরুটাকে খুঁজতে গিয়ে হারু পালকটা পেয়েছে।
–বুঝলুম। এবার এসো।
ডন গ্রাহ্য করল না। বলল,–এই পালটা যদি সুতো দিয়ে পিঠে বাঁধো মামা, তাহলে তুমি দিব্যি পাখির মতো উড়তে পারবে। দাও না মামা খানিকটা সুতো!
জানি, সুতো যেভাবে তোক জোগাড় করে দিতেই হবে। নইলে রেহাই পাব । কাজেই উঠতে হল। পাশের ঘরে ডনের দাদা শ্ৰীমান টমের ঘুড়ির লাটাই থেকে খানিকটা সুতো ছিঁড়ে আনতেই হল। টম এখন ক্রিকেট খেলতে গেছে। বাড়ি থাকলে কাজটা কঠিনই হতো।
ডন ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, পালটা পিঠে বেঁধে দাও মামা। শক্ত করে বাঁধবে যেন। নইলে যদি খুলে যায়, পড়ে ছাতু হয়ে যাব।
কষে বেঁধে দিলুম ওর ডান কাঁধের কাছে পালকটা। তারপর ডন বলল,– এবার দেখ মামা, আমি উড়ে চললুম, রেডি! ওয়ান…টু…থ্রি…
সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। তখন আমি ফের গোয়েন্দা কাহিনি পাতায় চোখ রাখলুম।…
ব্যাপারটা যে শেষ পর্যন্ত এতদূর গড়াবে ভাবতে পারিনি। সন্ধ্যার মুখে টম ফিরে এসে যেভাবেই হোক টের পেল যে, তার লাটাইয়ের সুতো ছেঁড়া হয়েছে। খুব লম্ফঝম্প করে সে ডনকে খুঁজে বেড়াল। আলমারির পেছন, টেবিলের তলা, এমনকী খাটের তলা খুঁজে ডনকে পিট্টি দেওয়ার তাল করল। কিন্তু কোথায় ডন দিদি চেঁচামেচি করেও ছেলেকে শান্ত করতে পারলেন না। শেষে ওদের বাবার নামে শাসালেন। জামাইবাবু মফস্বল শহরের উকিল। কোর্ট থেকে ফিরে কোন ক্লাবে যেন দাবা খেলতে যান। ফেরেন রাত নটার পরে।
