এখন বুঝতে পারি গিজাংবাবুর পদ্য রচনার ক্ষমতা ছিল। অতটুকুন বয়সে তাঁর ছড়ার সুরে এসব আওড়ানো শুনে ভক্তি জাগত। কোনওদিন ডেকে বলতেন, অ খোকা। পণ্ডিত তোমায় আকার পড়িয়েছে তো? বলল দিকি কাক বানান কী?
বানান শুনে হেসে বলতেন,
কাক থাকে গাছে
জলে থাকে মাছ
বনে থাকে বাঘ
মনে থাকে রাগ…
পাঠশালায় ছুটির ঘণ্টা নিসিং পণ্ডিত নিজেই বাজাতেন। ওটা নাকি পোড়া শিবমন্দিরেরই পুজোর ঘণ্টা। চৈত্রের সংক্রান্তিতে মন্দিরে পুজো হতো-বছরের এই একটা দিনের ঘণ্টা। সেদিন ঘণ্টাটার দরকার হতো মন্দিরে। নিসিং পণ্ডিত নিজেই পূজারী। তাই ঘণ্টাটা তার কাছেই থাকত সারা বছর।
গ্রীষ্মের ছুটির পরে একদিন হঠাৎ নিসিং পণ্ডিতের ঘণ্টাটা গেল চুরি। মনমরা হয়ে পণ্ডিতমশাই মুখেই ছুটি ঘোষণা করলেন। কিন্তু সেই পাঠশালা থেকে ছেলেরা হইহই করে বেরিয়েছে, অমনি পুকুরপাড়ে জঙ্গলের ভেতর মন্দিরের ওখানে কোথায় ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল, ঢং, টং, ঢং!
নিসিং পণ্ডিত লাফিয়ে উঠে চেঁচালেন, ধরো, ধরো, পাকড়ো। তারপর মন্দিরের দিকে দৌড়তে শুরু করলেন। পাঠশালার সর্দার পোডড়া মন্দিরের দিকে দৌড়তে শুরু করলেন। পাঠশালার সর্দার পোডড়া ছিল বাবুল নামে একটা ছেলে সে বয়সেও সব ছেলের বড়। তাকে পণ্ডিতমশায়ের পেছনে-পেছনে ছুটতে দেখে আমরাও দৌড়লুম।
মন্দিরের ওখানে গিয়ে পণ্ডিতমশাই বললেন,–খোঁজ, খুঁজে দ্যাখ! এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
আমরা সবাই জঙ্গল তন্নতন্ন খুঁজে ঘণ্টা-চোর বা ঘণ্টার পাত্তা পেলুম না। শেষে হতাশ মুখে নিসিং পণ্ডিত বললেন, যাকগে। ওটা আর পাওয়া যাবে না। বরাবর ঘণ্টাটার ওপর লোভ ছিল যে। কথায় বলে, স্বভাব যায় না মলে।
ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলুম। সর্দার পোড় বাবুল ধমক দিয়ে বলল,-শিগগির বাড়ি চলে যা বলছি। আর এখানে থাকবি না…
সেদিনও ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। পরদিন কানাকানিতে টের পেলুম, গিজাংবাবুই নাকি ঘণ্টাটা চুরি করে পালিয়েছেন। তাই আর তাকে গ্রীষ্মের ছুটির পর
থেকে পাঠশালার আনাচে-কানাচেও দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু মন্দিরের কাছ দিয়ে আসতে-আসতে তামাকের গন্ধ পাই, তাও তো সত্যি। নিশ্চয় তাহলে জঙ্গলে লুকিয়ে তামাক খান গিজাংবাবু।
তারপর প্রতিদিন বিকেলে বেশ মজার কাণ্ড শুরু হল। তখনও ছুটির সময় হয়নি–পড়াশুনো খুব জমে উঠেছে, হঠাৎ কোথাও ঘণ্টাটা বেজে ওঠে ঢং-ঢং করে। অমনি অভ্যাসে পাঠশালা থেকে ছেলেরা হইহই করে বেরিয়ে পড়ে। নিসিং পণ্ডিত আর বাবুল ছপটি তুলে সবাইকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। কান ধরে সবাইকে বাকি সময়টা দাঁড়িয়ে শটকে আওড়াতে হয়।
প্রতিদিন এই কাণ্ড। বিকেল চারটে বাজলে ছুটির সময় নিসিং পণ্ডিত পকেট ঘড়ি বের করে আধঘণ্টা আগে থেকে সবাইকে সতর্ক করে দেন। খবরদার! দুকানে আঙুল গুঁজে পড়া মুখস্থ করো।
তাই শুনে আমরা সবাই দুকানে আঙুল ঢুকিয়ে রাখি।
কিন্তু ঘণ্টাটা ঠিকই বাজে। অনেকক্ষণ ধরে বেজে তারপর থেমে যায় যেন হতাশভাবেই।
দিন কতক পরে মন্দিরের পথে বিকেলে বাড়ি ফিরছি একা। হঠাৎ দেখি মন্দিরের একপাশে বসে আছেন গিজাংবাবু। হুঁকো টানছেন, পাশে ঘণ্টাটা রাখা আছে। মুখটা গম্ভীর।
চলে আসব কিংবা ফিরে গিয়ে পণ্ডিতমশাইকে খোঁজ দেব তাই ভাবছি। তখন একটু হেসে বললেন, কী খোকা? কেমন পড়াশুনো চলছে? কী বানান পড়াচ্ছে নিসিং?
বললুম, দীর্ঘ উকার।
হুঁকো নামিয়ে রেখে গিজাংবাবু বললেন, হুঁ, কই বলে দিকি ভূত বানান কী?
–ভয়ে দীর্ঘ উকার, তো, ভূত।
–কী বললে? ভয়ে দীর্ঘ উকার। ইভয়েই বটে। ভয়ের সঙ্গে ভূতের সম্পর্ক আছে যে। তা অ খোকা, ভূত কখনও দেখেছ?
বিকেল পড়ে এসেছে। গাছপালার ভেতর পুরোনো মন্দির। গা ছমছম করে। একটু ভয় হল। বললুম, আজ্ঞে না।
ভয়ে দীর্ঘ ঊকার আছে বটে, ভূতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গিজাংবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন, ভূত মানুষের মতোই দেখতে। কোও খায়। কথায় বলে না–অভ্যাস যায় না মলে। আমার অভ্যাস যায়নি। হুঁকো এখনও খাই। আর এই ঘণ্টাটার ওপর বড্ড লোভ ছিল। কেন জানোর নিসিংটার কাণ্ড দেখে। একদল বাচ্চা ছেলেকে সারাদিন খোঁয়াড়ে আটকে রেখেছে। এ কি তাদের ভালো লাগে? তাই ইচ্ছে করত, ঘন্টাটা পেলে আমি ঢং-ঢং করে ছুটি বাজিয়ে দিতুম।
আমি কিছু বুঝতে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলুম।
গিজাংবাবু হাই তুলে বললেন, বাড়ি যাও খোকা। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। তারপর আমাকে আরও অবাক করে পেছনে বটগাছটায় গিয়ে উঠলেন। ঘণ্টার দড়িটা কোমরে গোঁজা, হাতে হুঁকো। তারপর উঁচু ডালে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজলেন। তারপর নাক ডাকতে বসলেন।
পণ্ডিতমশাইয়ের দাদার এরকম করে গাছে চড়ে ঘুমোনোটা আমার ভালো মনে হল না। ভাবতে-ভাবতে বাড়ি ফিরলুম।
পরদিন পাঠশালায় গিয়ে পণ্ডিতকে বলে ফেললুম ওঁর দাদার কথা। ভাবলুম ঘন্টাটা উদ্ধারের সূত্র পেয়ে উনি আমাকে পড়া বলতে না পারার শাস্তি কমিয়ে দেবেন।
কিন্তু শোনামাত্র খাপ্পা হয়ে নিসিং পণ্ডিত গর্জালেন, কান ধর! কান ধরে দাঁড়া হতচ্ছাড়া! অ বাবুল। এই বয়সেই কী জলজ্যান্ত মিথ্যে বলতে শিখেছে শুনছিস।
বাবুল ভেতর থেকে গম্ভীর স্বরে বলল, দু-ঘা ছিপটি।
আমি আঁতকে উঠে কেঁদে ফেললুম। বললুম, না পণ্ডিতমশাই! কাল বিকেলে আপনার দাদা…
