কিন্তু আশ্চর্য, টমটম সমান তালে নড়বড়িয়ে টলতে-টলতে চলছে। মাঝে মাঝে ঝড়-বৃষ্টির শব্দের ভেতর শোনা যাচ্ছে অদ্ভুত এক শব্দ–টংলং-টংলংটলং। কখনও ছক্কামিয়ার টাট্টুঘোড়া বিকট চি-হি করে চেঁচিয়ে উঠছে। তারিফ করে আমার পেছন থেকে এক সওয়ারি বলে উঠলেন,–পক্ষীরাজের বাচ্চা!
এতক্ষণে তেরপলের টোপর থেকে ফুটো দিয়ে জল চোয়াতে থাকল। সওয়ারিরা নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সরবে কোথায়? বেহদ্দ ভিজে সপসপে হয়ে যাচ্ছিল জামাকাপড়। একসময় ছোটমামা হঠাৎ বাজখাই চেঁচিয়ে বললেন, আঃ! হচ্ছে কী, হচ্ছে কী মশাই? আমার ওপর পড়ছেন কেন?
–আপনার ওপর আমি পড়লুম, না আপনি আমার ওপর পড়লেন?
–কী বাজে কথা বলছেন? আমায় ঠান্ডা করে দিয়ে আবার তক্ক? আপনি মানুষ, না বরফ?
–আমি বরফ? আপনিই তো বরফ। ইস। কী ঠান্ডা! হাড় অবধি জমে গেল দেখছেন না!
আমার পিছনের সওয়ারি চাপা খিকিখক করে হেসে আমার কানের ওপর বলল, ঝগড়া বেধে গেছে। বরাবর হয়, বুঝলেন তো মশাই? ছক্কামিয়ার টমটমের এই নিয়ম। খিক-খিক-খিক-খিক।
এমন বিদঘুঁটে হাসি কখনও শুনিনি। কিন্তু এর শ্বাস-প্রশ্বাসেও যে বরফের মতো হিম। বললুম, ইস। একটু সরে বসুন না। বড্ড ঠান্ডা করে যে!
লোকটা ভারি অদ্ভুত! সে ওই বিদঘুঁটে খিক খিকখিক হাসতে-হাসতে আরও যেন ঠেসে ধরল আমাকে। চেঁচিয়ে উঠলাম, ছোটমামা! ছোটমামা!
কিন্তু ছোটমামার কোনও সাড়া পেলাম না। টোপরের ভেতরটা ঘন অন্ধকার। ফের ডাকলুম–ছোটমামা! কোথায় তুমি?
লোকটা সেই খিকখিক হাসির মধ্যে বলল, আর ছোটমামা বড়মামা! মামারা এখন রাস্তায় পড়ে কুস্তি করছে।
হতভম্ব হয়ে হাত বাড়িয়ে ছোটমামাকে খুঁজলুম। সুটকেসটা হাতে ঠেকল। কিন্তু সত্যিই ছোটমামা নেই। তারপর পেছনের দিকে চোখ পড়ল। ওদিককার পরদাটা যেন ফর্দার্যাই। বৃষ্টির ছাট এসে ঢুকছে। আমি প্রচণ্ড চেঁচিয়ে বললাম, ছামিয়া। ছক্কামিয়া! গাড়ি থামাও! গাড়ি থামাও।
পেছনের সওয়ারি ফের সেই বিদঘুঁটে হাসি হেসে উঠল। এবার আমি সামনের পরদা ঠেলে সরিয়ে ছক্কা মিয়ার ভেজা জামা খামচে ধরলুম। গাড়ি থামাও গাড়ি থামাও বলছি!
এতক্ষণে যেন ছক্কামিয়া আমার কথা শুনতে পেল। ঘুরে বলল, কী হয়েছে বাবুমশাই?
ছোটমামা পড়ে গেছেন কোথায়।
ছক্কামিয়া বলল, বালাই ষাটা পড়বেন কোথায়? ঠিকই আছেন, খুঁজে দেখুন ।
–নেই। তুমি গাড়ি থামাবে কি না বলো।
সামনে একটা মন্দির আছে। সেখানে থামাব। দুক্কামিয়া চাবুক মেরে ঘোড়াটাকে খুঁচিয়ে দিয়ে বলল,–যেখানে-সেখানে থামলে ঝড়-বৃষ্টিতে কষ্ট পাবেন বাবুমশাই। বুঝলেন না? ওইখানে থামিয়ে আপনার ছোটমামাকে খুঁজবেন বরঞ্চ।
মন্দিরের আটচালার সামনে গাড়ি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি ছক্কামিয়ার পাশ দিয়ে লাফ দিলাম। তারপর আটচালায় ঢুকে পড়লাম। বুদ্ধি করে ছোটমামার সুটকেস আর আমার কিটব্যাগটাও দু হাতে নিয়েছিলাম।
কিন্তু আটচালায় ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলুম, ছক্কামিয়ার টমটম বৃষ্টির মধ্যে আচমকা গড়াতে শুরু করেছে। ঘোড়াটা চি-হি ডাক ডেকে তেমনি নড়বড়ে পায়ে দৌড়তে লেগেছে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। মুখে কথাটি পর্যন্ত আর ফুটল না। ভারি অদ্ভুত লোক তো ছক্কামিয়া।
এখন ঝড়টা প্রায় কমে এসেছে। বৃষ্টি সমানে পড়ছে। নির্জন আটচালায় দাঁড়িয়ে আছি। প্যান্ট-শার্ট ভিজে চপচপ করছে। প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা আর কী!
কিছুক্ষণ পরে বিদ্যুতের আলোয় দেখি, কে যেন আসছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম,–কে-কে?
ছোটমামার সাড়া এল, অন্তু নাকি রে?
আমি কাদ-কাদ গলায় বললুম,–হ্যা! তোমার কী হয়েছিল ছোটমামা? ছোটমামা আটচালায় ঢুকে বললেন, কী হবে আবার। যা হওয়ার, তাই হয়েছিল। তবে ব্যাটাকে এবার যা জব্দ করেছি, আর কক্ষনও ছক্কামিয়ার টমটমে ভুলেও চড়তে আসবে না।
–ছোটমামা আমার কাছে সুটকে দেখে খুশি হয়ে বললেন,–জানতুম, তুই ঠিকই নেমে পড়ে আমার অপেক্ষা করবি কোথাও।
–কিন্তু লোকটা কোথায় রইল?
হাসলেন ছোটমামা,–ওকে তুই লোক বলছিস এখনও? ওটা কি লোক নাকি?
–তবে কে?
–বুঝলিনে? ওর ঘাড়ে একটা চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে দে, তাহলে বুঝবি। থাকগে, এখন রাতবিরেতে ও নিয়ে আলোচনা করতে নেই। ব্যাপারটা কী জানিস অন্তু? রাতবিরেতে অমন দু-একজন সওয়ারি ছক্কামিয়ার টমটমে উড়ে পড়বে। তারপর কী করবে জানিস? অন্ধকারে ঘাড় মটকানোর তাল করবে। যেই টের পেয়েছি আমার পেছনের লোকটার মতলব কী, অমনি ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ব্যাটা পড়বার সময় অ্যায়সা হ্যাঁচকা টান মেরেছে যে আমিও ওর সঙ্গে তেরপলের ফাঁক দিয়ে নিচে পড়েছি।
–তারপর? তারপর ছোটমামা?
তারপর আর কী? ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় কুফু-জুডো যা সব অ্যাদ্দিন কষ্ট করে শিখেছি, চালিয়ে গেলুম। এক প্যাঁচে ওকে এমন করে ছুড়লুম যে একেবারে বিশ ফুট গভীর খাদে গিয়ে পড়ল। এতক্ষণ কোনও বাজ পড়া ন্যাড়া গাছের ডগায় বসে হিপিয়ে-হিপিয়ে কাঁদছে। ছোটমামা হাসতে-হাসতে গায়ের জামা খুলে নিঙড়ে নিলেন। তারপর বললেন,–ঘণ্টা তিন কাটাতে পারলেই ফার্স্ট বাস পেয়ে যাব। জামাটা নিঙড়ে নে। ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে মাথা মুছে ফেল। বাপস!
আমি শুধু ভাবছিলুম, তাহলে আমার পেছনকার সেই সওয়ারিও কি লোক নয়, সেই লোকটিও কি আমার ঘাড় মটকানোর তালে ছিল? অন্য লোকটার মতো?
