আমার মুখ দিয়ে ছোটমামার প্রতিধ্বনি বেরিয়ে গেল, বাপস!…
.
ছক্কামিয়ার টমটমে তারপর ভুলেও চাপার কথা ভাবতুম না। কিন্তু বছর দশেক পরে, যখন কিনা আমি পুরোপুরি সাবালক, একরাতে ভীমপুর স্টেশনে নেমে শুনলুম লাস্ট বাস চলে গেছে।
স্টেশনবাজার তখন নিঃঝুম। সময়টা শীতের। আকাশে একটুকরো চাঁদও আছে। কিন্তু কুয়াশার ভেতর তার দশা বেজায় করুণ। একটা চায়ের দোকান খোলা ছিল। শীতের রাত বারোটায় চা-ওলা সবে ঝাঁপ ফেলার জোগাড় করছিল, আমাকে দেখে বুঝি তার দয়া হল। এক কাপ চা খাইয়ে দিল। শেষে বলল, বাবুমশাই তাহলে যাবেন কীসে গদাইতলা?
–কীসে আর যাব? বরং দেখি যদি ওয়েটিংরুমে রাতটা কাটানো যায়।
চা-ওলা মুচকি হেসে বলল,-ছক্কামিয়ার টমটমেও যেতে পারেন।
ছক্কামিয়ার টমটমের কথা ভুলেই গিয়েছিলুম! সেবার ঝড়-বৃষ্টি ছিল কম। ছোটমামাও বড় গল্পের মানুষ ছিলেন।
হনহন করে চৌমাথায় চলে গেলুম। গিয়ে দেখি, শিরীষতলায় আগুন জ্বেলে বসে আছে সেই আদি অকৃত্রিম ছক্কামিয়া। পাশেই তার টমটম তৈরি। ঘোড়াটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। শীত বাঁচাতে তার পিঠে একটুকরো চটের জামা। বললুম,–গদাইতলা যাবে নাকি ছক্কামিয়া?
ছক্কামিয়া ইশারায় টমটমে চড়তে বলল।
আজ আর কোনও সওয়ারি এল না দেখে আশ্বস্ত হওয়া গেল। টমটম তেমনি নড়বড় করে চলতে শুরু করল। ঘোড়াটাও বিকট চি-হি-হিঁ ডাকতে ভুলল না। অবিকল সব আগের মতোই আছে। এমন কী ছামিয়ার পেল্লায় গোঁফটারও ভোল বদলায়নি। আর সেই অদ্ভুত ঘণ্টার শব্দ, টংলং টংলং টংলং!
কনকনে ঠান্ডা হাওয়া তেরপলের ঘেরাটোপের ছ্যাদা দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে উত্যক্ত করছিল। জড়সড় হয়ে কোনা ঘেঁষে রইলুম। সামনেকার মোটা হ্যাঁদা দিয়ে বাইরে কুয়াশামাখানো জ্যোৎস্নায় ঝিমধরা মাঠঘাট চোখে পড়ছিল। গাছগুলো আগাপস্তলা কুয়াশার আলোয়ান চাপিয়েছে; আর মাথায় পড়েছে কুয়াশার টুপি। টুকরো চঁদখানা ঘেঁড়া ঘুড়ির মতো একটা ন্যাড়া তালগাছের ঘাড়ে আটকে গেছে দেখতে পাচ্ছিলুম।
মাইলটাক চলার পর রাস্তার ধার থেকে কে বাজখাই হাঁক ছাড়ল,–রোকো, রোকো! অমনি টমটম থেমে গেল। ঘোড়াটাও স্বভাবমতো সামনে দু-ঠ্যাং তুলে একখানা চিঁ-হিঁ ছাড়ল। তারপর ছামিয়ার গলা শুনলুম, দারোগাবাবু নাকি? সেলাম, সেলাম।
মুখ বাড়িয়ে দেখি, বিশাল এক ওভারকোট পরা মূর্তি। সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোনও এক দারোগাবাবু। বললেন, রোসো। সাইকেলখানা তুলে দিলেন। তারপর যখন টোপরের ভেতরে ঢুকলেন, মনে হল ভূমিকম্প হচ্ছে। ঢুকেই আমাকে টের পেয়ে চমকানো গলায় বলে উঠলেন,–কে? কে?
বললুম,–আমি।
আমি? আমি মানুষের নাম হয় নাকি? বলে দারোগাবাবু টর্চ জ্বেলে সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে আমাকে দেখে নিলেন। নামধাম বলতেই হল। পুলিশের লোক বলে কথা। সব শুনে উনি বললেন, আমি আপনাদের গদাইতলা থানার চার্জে। কিন্তু আপনাকে কখনও দেখিনি।
বেগতিক দেখে বললুম, কলকাতায় আছি বহুকাল। তাই দেখেননি। তা আপনার নামটা জানতে পারি স্যার?
–বংকুবিহারী রায়।
আসামী ধরতে বেরিয়েছিলেন বুঝি? –ওঁকে খুশি করার জন্যই বললুম।
বংকু দারোগা জলগম্ভীর স্বরে বললেন,–হুম! ব্যাটা এক দাগি বেগুনচোর ভীষণ ভোগাচ্ছে। আজ একটা বেগুনক্ষেতে দুজন সেপাই নিয়ে ওত পেতেছিলুম। তাড়া খেয়ে সটান একটা তালগাছের ডগায় উঠে গেল। তাকে আর নামাতে পারলুম না। তখন সেপাই দুজনকে তালগাছের গোড়ায় বসিয়ে রেখে এলুম। আসতে-আসতে হঠাৎ সাইকেলের বেয়াদপি।
দাগি বেগুনচোর এই শীতকালে সারারাত তালগাছের ডগায় বসে আছে। কিন্তু তার জন্য নয়, হতভাগা সেপাই দুজনের কথা ভেবে আমার উদ্বেগ হচ্ছিল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আহা!
আহা মানে? আমাকে ফের টর্চ জ্বেলে সন্দিগ্ধ নজরে দেখে বন্ধু দারোগা বললেন,–হুম! আপনি মশাই এই মড়া-বওয়া গাড়িতে এতরাতে চাপলেন যে! আপনি জানেন, আজকাল সওয়ারি জোটে না বলে ছক্কামিয়া মড়া বয়ে নিয়ে যায় গঙ্গার ঘাটে!
বলেন কী! তাহলে তো ভয়ের কথা। অবাক হয়ে বললুম, সত্যি ভয়ের কথা। আগে জানলে কথা কেড়ে বন্ধু দারোগা বললেন, হয়তো জেনেশুনেই চেপেছেন। কিছু বলা যায় না।
–কেন এ কথা বলছেন?
–বলছি আপনার চেহারা দেখে। এমন শুটকো রোগা চিপসে বাসি মড়ার মতো লোক সচরাচর দেখা যায় না কিনা।
এবার আমার খুব রাগ হল, কী বলতে চান আপনি?
–রাত-বিরেতে আজকাল ছক্কা মিয়ার টমটমে কে জ্যান্ত, কে মড়া বোঝা যায় না। মশাই!
হাত বাড়িয়ে বললুম,–এই আমার হাত! পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, আমি মড়া না জ্যান্ত!
বন্ধু দারোগা আমার হাত সরিয়ে দিলেন জোরে, বাপস! এ তো বেজায় ঠান্ডা?
–ঠান্ডা হবে না? শীতের রাতে এই মাঠের মধ্যে হাত কি গরম থাকবে?
–না মশাই। এমন রাতে বিস্তর সিঁদেল চোরের হাত পাকড়েছি। তারা কেউ এমন ঠান্ডা ছিল না।
–কী? আমায় সিঁদেল চোর বললেন!
বংকু দারোগা গলাটা ভেতরে নিয়ে বললেন,–সিঁদেল চোরের ভূত হতেও পারেন। কিছু বলা যায় না। তখন আহা বলা শুনেই সন্দেহ জেগেছে।
আর সহ্য হল না। খাপ্পা হয়ে চ্যাঁচিলুম,–পুলিশ হোন, আর যাই হোন আপনাকে অমি সাবধান করে দিচ্ছি মশাই।
দাবোগাবাবু ফের মুখের ওপর টর্চ জ্বেলে বললেন,–ওঁ হুঁ হুঁ। বড্ড এগিয়ে এসেছেন। সরে বসুন! সরে বসুন বলছি!
