গোবিন্দচোর হাত্তেরি বলে চিরুনি ছুঁড়ে দিল। সেটা ঘ্যাস করে ছোটমামার পায়ের সামনে বালিতে বিধে গেল কাস্তের মতো। চিরুনিটা তুলে ছোটমামা সম্ভবত শাসাতে যাচ্ছিলেন, তখন গোবিন্দের মডুটাও তলিয়ে গেল।
আমি বেজায় ভয় পেয়ে গেলাম,–ও ছোটমামা! আর এখানে নয়। বড্ড ভয় করছে যে!
ছোটমামা বললেন, ভয় তো আমারও করছে। দাঁড়া, আগে চুলগুলো ঠিক করে নিই! তারপর যাচ্ছি।…
ছক্কামিয়ার টমটম
এমুলুকে রাতবিরেতে বাস ফেল করলে ছক্কামিয়ার টমটম ছাড়া আর উপায় ছিল নো। ঝড়-বৃষ্টি হোক, মহাপ্রলয় হোক, রাতের বেলা ভীমপুর গদাইতলা দশমাইল পিচের সড়কে যদি কষ্ট করে একটু দাঁড়িয়ে থাকা যায়, ছক্কামিয়ার টমটমের দেখা মিলবেই মিলবে। অন্ধকারে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে প্রথমে ঠাহর হবে এক চিলতে টিমটিমে আলো। তারপর আলোটা এগিয়ে আসবে আর মেমের ডাকাডাকি যতই থাক, কানে বাজবে অদ্ভুত এক আওয়াজ টং লং…টং লং…টং লং। বিদ্যুতের আলোয় হঠাৎ চোখে পড়বে কালো এক একৃাগাড়ি–তেরপলের চৌকা একটা টোপর চাপানো। সামনে কালো এক মূর্তি আর নড়বড় করে দৌড়নো এক টাট্টু!
মুখে কিছু বলার দরকার নেই। ছক্কামিয়ার টমটম সওয়ারি দেখামাত্র থেমে যাবে। তখন একলাফে পেছনের তেরপল সরিয়ে চৌকা টোপরে ঢুকলেই নিশ্চিন্ত। আবার টলতে-টলতে চলতে থাকবে ছক্কামিয়ার টমটম–টং…লং…টং লং।
টমটম কথাটা এসেছে ইংরেজি ট্যান্ডেম থেকে যে গাড়ির সামনে কয়েক সার ঘোড়া যেত। কিন্তু ভীমপুরের ছক্কামিয়ার একাগাড়ির ঘোড়া মোটে এক। তবু আদর করে লোকে নাম দিয়েছিল টমটম।
ছক্কামিয়ার চেহারাটি কিন্তু ভারি বদরাগী। ঢ্যাঙা, টিঙটিঙে রোগা, একটু কুঁজো গড়ন। লম্বাটে মুখের বাঁকানো নাকের তলায় পেল্লায় গোঁফ। চামড়ার রং রোদপোড়া তামাটে।
তেমনি তার টাট্টুও। যেমন মনিব, তেমনি ঘোড়া, হাড় জিরজিরে লম্বাটে গড়ন। ঠ্যাং চতুষ্টয় যেন চারখানি কাঠি। মাথাটা দেখে সময়-সময় ঠাহর করা কঠিন, এই প্রাণীটি সিঙ্গি, না প্রকৃত একটি ঘোড়া। হ্রেষাধ্বনি করলেই পিলে চমকে ওঠে। ভীমপুর বাজারের তাবৎ-তাবং নেড়িকুকুর দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায় লেজ গুটিয়ে।
লোকে আজকাল রাস্তা চলতে বাস-রিকশোই পছন্দ করে। ছক্কা মিয়ার টমটম চড়লে হাড়মাংস দলা পাকাতে থাকে বলেও না, কালের রেওয়াজ আসলে।
কিন্তু ওই যে বলেছি, রাতবিরেতে বাস ফেল করলে তখন উপায়? ছক্কামিয়া এটা বোঝে এবং দিনে তার টমটমের বাহনটিকে নিয়ে বনজঙ্গল বা ঝিলে চরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। রাতের বেলা ছোট্ট বাজারের চৌরাস্তায় শিরীষ গাছের তলায় ঘাপটি পেতে বসে থাকে। পাশেই টমটম রেডি।
সেবার পুজোর সময় কলকাতা থেকে ছোটমামার সঙ্গে আসছি। মাঝপথে একখানে ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল তো রইল। আর নড়ার নাম নেই। ব্যাপার কী? না– আগের স্টেশনে মালগাড়ি বেলাইন। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। তারপর যখন ট্রেনের চাকা গড়াল, ছোটমামা বেজারমুখে বললেন,-বরাতে আমার হতচ্ছাড়া ছামিয়ার টমটম আছে। বাপস!
ওই টমটমে কখনও চাপিনি। তাই কথাটা শুনে আমার আনন্দ হয়েছিল। বললুম, খুব মজা হবে, তাই না ছোটমামা?
ছোটমামা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন,–মজা হবে! বুঝবে ঠ্যালাটাখন।
ঠ্যালাটা কীসের বুঝলাম না আগেভাগে। দেখলাম, ছোটমামা ট্রেনের জানলা দিয়ে মুন্ডু বাড়িয়ে বারবার যেন আকাশ দেখছেন। একটু পরে বললেন, খুব ঝড়বৃষ্টি হবে! কার মুখ দেখে যে বেরিয়েছিলাম। বড়দা অত করে বললেন, তবু থামলুম না। ছ্যা-ছ্যাঁ, আমার কী আক্কেল!
ভীমপুর স্টেশনে যখন নামলুম, তখনও কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির পাত্তা নেই। রাত একটা বেজে গেছে। বাজার নিশুতি। চৌমাথায় শিরীষতলায় গিয়ে দেখি, ছক্কামিয়ার টমটম দাঁড়িয়ে আছে। বলা কওয়া নেই, দরদস্তুর নেই, ছোটমামা টমটমের পেছনদিকে তেরপল তুলে ঢুকে ডাকলেন, হাঁ করে দেখছিস কী? উঠে আয়। এখুনি একগাদা লোক এসে ভালো জায়গা দখল করে ফেলবে যে।
ভেতরে খড়ের পুরু গাদার ওপর তেরপল পাতা। কেমন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ। অন্ধকারও বটে। যেন এক গুহায় ঢুকেছি। সামনে সরে গিয়ে ছোটমামা পরদাটা ফাঁক করে রাখলেন। একটু পরে আরও জনাদুই নোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। সে এক ঠাসাঠাসি অবস্থা।
আর তারপরই আচমকা চিকুর ছেড়ে মেঘ ডাকল এবং শনশন করে এসে গেল একটা জোরালো হাওয়া। ছোটমামা বললেন,–ওই যা বলেছিলুম। হল তো?
ছক্কামিয়া সামনের আসন থেকে ঘোষণা করল,–আরাম করে বসুন বাবু মশাইরা! এবার রওনা দিই। তার ঘোড়াটাও মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চি হি হি ডাক ছেড়ে যখন পা বাড়াল, তখন টের পেলাম কেন ছোটমামা বাপস বলে মুখখানা তুম্বো করেছিলেন।
সত্যি বাপস! হাড়গোড় মড়মড়িয়ে ভেঙে যাওয়ার দাখিল। বাইরে হাওয়ার হইচই মেঘের হাঁকডাক যত বাড়ছে, ছক্কামিয়ার ঘোড়াটাও তত যেন তেজি হয়ে উঠছে। একটু পরেই চড়বড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা টোপরের তেরপলে পড়তে শুরু করল। ছোটমামা ফঁকটুকু বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন অবাক। ছক্কামিয়া বাইরে বসে চাবুক হাঁকাচ্ছে। ওর বৃষ্টির ছাট লাগবে না?
রাস্তাটা ঘুরে রেল লাইন পেরুলে দুধারে বিশাল আদিগন্ত মাঠ। ফাঁকা জায়গায় ঝড়-বৃষ্টিটা মিয়ার টমটমকে বেশ বাগে পেল। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি উল্টে গিয়ে রাস্তার ধারের গভীর খালে নাকানিচোবানি খাবে! আমাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে সেও ভাববার কথা।
