বংকুদারোগা বললেন, বুঝলেন না? ওই নদীতে একজায়গায় চোরাবালি আছে জানেন না?
এবার আমি বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও ছোটমামা, সেই যে অনেকটা জায়গা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা আছে–লেখা আছে? সাবধান। আর…
ছোটোমামা নড়ে বসলেন,–আর একটা মড়ার খুলি আঁকা নোটিশ ঝোলানো আছে। দেখেছি বটে।
বংকুদারোগা বললেন,–গোবিন্দ আমার তাড়া খেয়ে কিছুদিন শ্মশানবটের কোটরে লুকিয়ে থাকত। টের পেয়ে হানা দিলাম। কী ধুরন্ধর চোর মশাই! মড়া সেজে একটা খাঁটিয়ার তালাই জড়িয়ে শুয়েছিল। এদিকে আসল মড়াটাকে খাঁটিয়ার তলায় লুকিয়ে রেখেছে। যারা মড়া পোড়াতে এসেছে, তারা বটতলায় এসে মুড়ি খাচ্ছে, লক্ষও করেনি। রাতটাও ছিল যে অমাবস্যা।
বংকুদারোগা একটিপ নস্য নিয়ে ফের বললেন,–মড়া পোড়াতে গিয়ে ধরা পড়ল ব্যাপারটা। গোবিন্দ তখন দৌডুচ্ছে। অন্ধকারে দৌডুতে-দৌডুতে পড়েছে একেবারে চোরাবালির ওপর। তখন ওখানে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। শুধু একটা নোটিশ লটকানো ছিল।
ছোটমামা বললেন, সর্বনাশ! চোরাবালিতে পড়ে তো তলিয়ে যাওয়ার কথা।
–হুঁ-উ, তলিয়ে গেল বইকী গোবিন্দচোর।
আমি বললাম, তারপর কে টেনে তুলল ওকে?
বংকুবাবু হাসলেন, তুলবে কী করে? আমি যখন পৌঁছলাম, তখন বালিতে তার মুণ্ডুটা দেখা যাচ্ছে। টর্চ জ্বেলে রেখেছিলাম। এক মিনিটের মধ্যে মুন্ডুটাও তলিয়ে গেল। তারপর যেমন বালি, তেমনি। বোঝবার উপায় নেই।
ছোটমামা অবাক হয়ে বললেন, তাহলে তো গোবিন্দ বেঁচে নেই।
নেই। আবার আছেও। বকুদারোগা গম্ভীর হয়ে বললেন। কথায় বলে না? অভ্যেস যায় না মলে। আমার মুশকিল কী হয়েছে জানেন নান্টুবাবু? তাড়া করলেই ব্যাটাচ্ছেলে কাটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ঝাঁপ দেয়। চোরাবালির ভেতর আজ্ঞা এখন। ওর খুব নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। এখন ওকে ধরাই কঠিন। তবে যদি ওকে মাঝপথে পাকড়াও করতে পারা যায়। তাহলেই সুবিধে হয়। দেখা যাক, আপনি ভাববেন না।…
থানা থেকে ফেরার পথে ছোটমামা বললেন, তুই বংকুদারোগার কথা বিশ্বাস করলি পুটু? আসলে আজকাল পুলিশই এরকম। মনবোঝানো দুটো কথা বলে বিদায় করতে পারলে বেঁচে যায়। তোদের এই বংকুদারোগা দেখছি, আরও এককাঠি সরেস। গুলতাপ্পির রাজা। মানুষ মরে ভূত হতেই পারে। তাই বলে চোর মরেও কি চোর থেকে যায় কখনও? ভূত ঘাড় মটকাতে পারে বটে, চুরি করতে যাবে কোন দুঃখে?
বললাম, কেন ছোটমামা? ভূতের মাথায় পেরেকের মতো চুল থাকলে…
ছোটমামা খাপ্পা হয়ে বললেন,-থাম তো। আজ ওবেলায় আমি নিজেই চিরুনিচোরকে হাতেনাতে ধরে ফেলব। সেজন্যই তো নদীর ধারে ওৎ পাততে যাচ্ছিলাম। খামোকা তোর কথায় থানায় গেলাম।
বেলা পড়ে এলে ছোটমামা আমাকে নিয়ে বেরুলেন আবার। ছোটমামা প্যান্টের পকেটে একটা দড়ি নিয়েছেন। আর আমাকে দিয়েছেন একটা কাগজ কাটা ছুরি। নদীর ধারে শ্মশানবটের কাছে গিয়ে চাপা গলায় বললেন, আমি ওকে ধরে ফেলব, আর তুই ছুরি বের করে চেঁচিয়ে বলবি, একটু নড়লেই পেট ফাঁসিয়ে দেব সাবধান!
এই বলে আমাকে রিহার্সাল দিইয়ে ছাড়লেন,-বলত শুনি, কেমন করে চোখ কটমটিয়ে বলবি?
অগত্যা ছোটমামার জেদে আমাকে ছুরি বাগিয়ে চিকুর ছেড়ে বলতে হল, একটু নড়েছ কি পেট ফাঁসিয়ে দেব সাবধান!
উঁহু সাবধানটা হবে আরও জোরে। এমনি করে।–বলে ছোটমামা বিকট গর্জালেন, সা—ব—ধা–ন।
বারকতক বলার পর উনি খুশি হলেন। ই ঠিক হয়েছে। বুঝলি পুটু? ভালোয় ভালোয় যদি কাজটা করে ফেলতে পারি, তোকে এক প্যাকেট লজেন্স দেব।
শ্মশানবটের এদিকটা নিঃঝুম। শ্মশানে আজ কেউ মড়া পোড়াতে আসেনি। নদীতে ধুধু চড়া পড়েছে। দেখতে-দেখতে সূর্য ডুবে গেল। আলো কমে এল। সেই সময় ছোটমামা হঠাৎ আমাকে খামচে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন,–চলে আয়! ওই দ্যাখ, ব্যাটাচ্ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
চমকে উঠে দেখি, নদীর বালিতে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলাম। পাড়ের নিচে একফালি জল তিরতির করে বয়ে হচ্ছে। তার ওধারে বালির চড়া ওপার অবধি ছড়িয়ে রয়েছে। কাছাকাছি পৌঁছে দেখলাম, আরে! লোকটা ছোটমামার সেই চিরুনিটা দিয়ে সত্যি সত্যি চুল আঁচড়াচ্ছে যে!
ছোটমামা দড়ি বের করে চলে যায় বলেই নিচে ঝাঁপ দিলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণ করলাম। জলটুকু পেরিয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,–একপা নড়ছে কি মরেছ, সা—ব–ধা–ন!
ছোটমামা ফুঁসে উঠে বললেন,–ভ্যাট! দিলে সব ভেস্তে। এখন নয়, এখন নয়।
গোবিন্দ কিংবা যেই হোক, সে ঘুরে আমাদের দেখল তারপর দৌডুতে শুরু করল। ছোটমামা,–তবে রে ব্যাটা চোর, যাবি কোথায়–বলে দৌড়লেন তার পেছনে। আমিও।
তখনও দিনের আলো আছে, তবে খানিকটা আবছা হয়ে গেছে। কালো মূর্তিটাকে ছোটমামা প্রায় ধরে ফেলেন এমন অবস্থা। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। সামনে সেই কাঁটাতারের বেড়া। একটা সাইনবোর্ড লটকানো আছে। তাতে একটা মড়ার খুলি।
হতভম্ব হয়ে দেখলাম, লোকটা বেড়া ডিঙিয়ে ভেতরে চলে গেল। তারপর ধীরসুস্থে বালিতে তলিয়ে যেতে থাকল। কালো মুখের সাদা দাঁতে সে নিঃশব্দে হাসছে দেখে ছোটমামা ভেংচি কেটে বললেন লজ্জা করে না হাসতে ব্যাটাচ্ছেলে চোর কোথাকার? ভালো চাও তো চিরুনিটা দাও বলছি! ছোটমামা আমার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে চ্যাঁচিমেচি করে বললেন,–ছুরি ছুড়ব বলে দিচ্ছি! চিরুনি দাও আমার। দেবে না? তবে রে! ওয়ান–টু–থ্রি।
