তাঁর চোখের সামনে জ্যোৎস্নারাতে ওই উটকো তালগাছটা হঠাৎ খাটো হতে হতে বেঁটে হতে-হতে মাটির ভেতর যেন সেঁধিয়ে যাচ্ছে। টর্চ আছে সঙ্গে। ঝটপট জ্বেলে দেখলেন। তালগাছটার জায়গায় একটা কালো বেড়াল নীল জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে তাঁকে দেখছে।
পুলিশকে ভূতের ভয় করতে নেই। তাছাড়া ওটা ভূত কি না সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। বন্ধুবাবু সেজন্যেই খুব রেগে গিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন, তবে রে!
কালো বেড়ালটা তবু গ্রাহ্য করল না। তার চেয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার, টর্চটাও গেল বিগড়ে। সুইচ টেপাটেপি করে আলো জ্বলল না! তখন সাইকেল থেকে নেমে বঙ্কুবাবু সাইকেলটা দাঁড়ি করিয়ে রেখে পিস্তল বের করলেন, পিস্তল তাক করে ট্রিগারও টানলেন। গুলি বেরুল! বিকট ফটাস আওয়াজও হল। কিন্তু বেড়ালটার গায়ে গুলি বিধল না। তখন আরও খাপ্পা হয়ে ফের গুলি ছুঁড়তে থাকলেন। পিস্তলটাতে আরেকটা গুলি। সাতটা গুলি খরচ হয়েছে, এমন সময় যেটা ছিল বেড়াল, সেটা হয়ে গেল একটা মানুষ। তারপর সেই মানুষটা খি-খি করে খুব হেসে বলে উঠল,–খামোকা গুলি খরচ করে কী লাভ দারোগাবাবু?
বন্ধুদারোগা মানুষের কথা শুনে ভড়কে গেলেন বটে, কিন্তু মুখে সাহস করে গর্জে উঠলেন, তুই কোন ব্যাটা রে?
–আজ্ঞে, আমি সেই পাঁচু।
বঙ্কুবাবু এতক্ষণে সঠিকভাবে বুঝতে পারলেন, তিনি ভূতের পাল্লায় পড়েছেন। তালগাছের বেড়াল হয়ে যাওয়া চোখের ভুল হতেও পারে, কিন্তু মানুষ হয়ে পাঁচুতে রূপ নেওয়াটা তো আর চোখের ভুল বলা যাবে না। তার ওপর কথাও বলছে। তার চেয়ে বড় কথা, এই পাচু ছিল ধড়িবাজ এক সিঁদেল চোর। সম্প্রতি রোগে ভুগে সে মারা পড়েছিল। তার সঙ্গে কেকরাডিহির মাঠে রাতবিরেতে দেখা হওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। বন্ধু দারোগা মনে-মনে ঠিক করলেন, এসব ক্ষেত্রে আপস করাই ভালো। তাই তিনিও খিকখিক করে হেসে বললেন,–তুই তাহলে পাঁচু? তা এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস তুই?
পাঁচু-চোরের ভূত অবাক হয়ে বলল, আমাকে আপনার ভয় করছে না দারোগাবাবু?
–একটুও না। চোরকে পুলিশ কখনও ভয় করে? ভয় করলে পুলিশের চাকরি থাকে রে?
–কিন্তু ভূতকে? আমি যে মরে ভূত হয়েছি, দারোগাবাবু।
–মরলে লোকে ভূত হয়, এ আবার নতুন কথা কী? আমি মরলে আমিও ভূত হব।–বঙ্কুদারোগা খুব হেসে বললেন, তুই তো তালগাছ হয়েছিলি, তারপর বেড়াল হলি, শেষে ফের পাঁচু হয়ে গেলি। আর আমি হলে কী করব জানিস?
পাঁচুর ভূত আগ্রহ দেখিয়ে বলল, কী করবেন শুনি?
বঙ্কুবাবু ভরাট গলায় বললেন, কথায় আছে? স্বভাব যায় না মলে। বুঝলি কিছু?
–আজ্ঞে না।
–তুই একটা হাঁদারাম! আমি সারাজীবন দারোগাগিরি করছি। চোর-ডাকাত ধরা স্বভাবে দাঁড়িয়েছে। আমি যখন মরব, তখন সে স্বভাব যাবে কোথায়? তোর মতো চোরদের ধরব। বেদম পিটুনি দেব। ঠ্যাংদুটো বেঁধে ওপরে ঝুলিয়ে
কথা শেষ হওয়ার আগেই পাঁচুর ভূত চেঁচিয়ে উঠল, আরে তাই তো! তাই তো!–তারপর একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বন্ধুদারোগা কিছু বুঝতে পারলেন না। বারকতক ওকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে ধ্যাত্তেরি বলে সাইকেলে চাপলেন। রেগেমেগে এবার জোরে প্যাডেলে চাপ দিলেন। প্রচণ্ড বেগে থানায় ফিরে চললেন।…
পাঁচুর ভূত কেন এমন করে হঠাৎ উধাও হয়েছিল, বুঝতে কয়েকটা দিন দেরি হল বঙ্কুবাবুর। সিঁদেল চোর পাঁচুর মরার পর থেকে এলাকায় চুরিচামারি, বিশেষ করে সিঁদকাটা একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই রাতের পর আবার থানার লোকেরা একের পর এক এসে চুরির নালিশ করতে শুরু করল। চুরিগুলোও ভারি অদ্ভুত রকমের। সিঙ্গিমশায়ের জামাই এসেছে বলে থলে ভর্তি বাজার করে ফিরছেন। হঠাৎ থলেতে হ্যাঁচকা টান এবং ঘুরে দেখেন থলেটি শূন্যে ভেসে উধাও হয়ে গেল। বিন্দু–ঝি পুকুরঘাটে বসে থালা-বাসন মাজছে আর পেছনে রাখছে। বোয়া শেষ করে ঘুরে দেখে বাসনকোসন নেই। এমনকী বন্ধুবাবুর কোয়ার্টারেই এক রাত্তিরে সিঁদ। বঙ্কুবাবুর বাবা অনিদ্রার রুগি। সিঁদ কেটে চোর যেই পা দুখানা ঘরে ঢুকিয়েছে, সুইচ টিপে আলো জ্বেলে খপ করে পা দুটো ধরে ফেলেছিলেন। লিকলিকে কালো দুটো পা। কিন্তু ধরামাত্র হাত ঠান্ডায় জমে গেল। বাপস বলে ছেড়ে দিলেন। পাদুটোও সিঁদের গর্ত দিয়ে সুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেল।
এবার বঙ্কুবাবু বুঝলেন কী হচ্ছে। খুব আফসোস হতে লাগল তার। কেন যে বলেছিলেন পাঁচুর ভূতকে, স্বভাব যায় না মলে, ভুলটা সেখানেই হয়েছিল। পাঁচু ছিল চোর। কিন্তু মলেও চোরের চুরির স্বভাব যায় না, পাচুর ভূতকে প্রকারান্তরে মনে পড়িয়ে দিয়েছিলেন বন্ধুদারোগা।
বড় ভাবনায় পড়ে গেলেন। চোর যতক্ষণ মানুষ থাকে, তাকে শায়েস্তা করতে পুলিশ ভূতই দরকার। বঙ্কুবাবু তো পাঁচু-চোরের ভূতকে পাকড়াও করার জন্য মরে যেতে পারবেন না! বালাই ষাট। এ বয়সে তিনি মরবেন কেন? স্বয়ং মহৎ কোনও কাজের জন্য প্রাণ দিয়ে মরা যায়, নেহাত একটা হিঁচকে চোরের জন্য প্রাণত্যাগ করার মানে হয়?
রোজ এদিকে নালিশেনালিশে জেরবার। জেলার ওপরওয়ালারাও চুটিয়ে ফলাও করে এই তল্লাটের চুরির খবর ছাপতে শুরু করেছে। সদর থেকে পুলিশ সুপার কড়া চিঠি লিখেছেন। স্থানীয় এম. এল. এ.-মশাইও বারবার এসে শাসিয়ে যাচ্ছেন। গণতন্ত্রের যুগ। গণ দরখাস্ত দিলে বন্ধুবাবুর চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। বড় ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন বঙ্কুবাবু। আসল সমস্যাটা হল, এসব চুরিচামারি যে ভূতের কীর্তি সেটা তো বিশ্বাস করবে না ওপরওয়ালারা। সংবিধানে ভূত বলে কোনও কথা নেই। কোনও আইনকানুনেও নেই। স্থানীয় লোকের মতে, পাঁচুর কোনও শাগরেদেরই কাজ। কিন্তু সে যে কে তাও কারুর মাথায় আসছে না।
