কেউ-কেউ থানায় খবর দিয়ে পুলিশও মোতায়েন করতেন। কিন্তু পাঁচু-কিনু তা ঠিকই টের পেত। তারপর থেকে আমাদের গ্রামে নয়, সারা এলাকায় দুই চোরের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ইতিমধ্যে বড়মামা মাসখানেক কোথায় ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে সব শুনে খুশি হয়ে বললেন, যাক। তাহলে ওরা খুব জব্দ হয়েছে। আর এ তল্লাটে পা বাড়াবে না। এবার আড়িপাতা-ভূতকে শিশিতে ভরে ফেরত দিয়ে আসতে হবে। পুঁটু, সন্ধ্যাবেলা দুজনে বেরুব। তার আগে একটুখানি মধু চাই যে। একফোঁটাই যথেষ্ট।
দাদু রাত্তিরে মধু খেতেন। তাই বাড়িতে মধু রাখতেই হত। শিশিটাতে একফোঁটা মধু ভরে বড়মামা সন্ধ্যার পর আমাকে নিয়ে বেরুলেন।
আগের মতো ঝিলের ধারে শ্মশানের কাছে আমাকে টর্চ হাতে বসিয়ে রেখে বড়মামা অন্ধকারে অদৃশ্য হলেন। তারপর সে-রাতের মতোই ক্রাও করে পেঁচা ডাল। শেয়ালেরা ডাকতে শুরু করল। আমি বসে আছি তো আছিই। বড়মামার পাত্তা নেই। মাঝে-মাঝে পিছু ফিরে দেখছি, সে-রাতের মতো পাঁচু বা কিনু এসে পড়বে নাকি। কিছু বলা তো যায় না।
বড়মামার ফিরতে বড্ড দেরি হচ্ছে। এদিকে এখন বেশ ঠান্ডা পড়েছে। শীত করছে। ঝিলের জল ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
মরিয়া হয়ে বড়মামাকে ডাকব ভেবেছি, সে সময় সে-রাতের মতো পিছন থেকে কে বলে উঠল,–কে ওখানে?
ভয়ে-ভয়ে বললাম, আমি পুঁটু!
–এখানে কী করা হচ্ছে শুনি?
–বড়মামার জন্য অপেক্ষা করছি।
–কোথায় গেছেন তোমার বড়মামা?
–আড়িপাতা-ভূতটাকে শিশিতে ভরতে গেছেন।
তখনই সে সর্বনাশ বলে পালিয়ে গেল। তবে না–তার পায়ের ধুপধাপ শব্দ শুনতে পেলাম না। একটা অদ্ভুত বাতাসের শব্দের মতো শনশন কিংবা ওইরকম কিছু কানে এল। সেই সঙ্গে কেমন একটা বিদঘুঁটে গন্ধও ভেসে এল।
আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। ডাকলাম, বড়মামা! বড়মামা!
দূর থেকে তাঁর কথা শোনা গেল, কী হয়েছে পুঁটু? চ্যাঁচাচ্ছিস কেন?
–শিগগির আসুন। আমার ভয় করছে। বলে টর্চের আলো জ্বালোম। তারপর বড়মামাকে দেখতে পেলাম। রেগে খাপ্পা হয়ে গেছেন। কাছে এসে বললেন, ব্যাটাচ্ছেলেকে শিশিতে যে ভরব তা আর হল না। ডাকাডাকি না হয় করলি, কিন্তু আলো জ্বাললে ভূতেরা কি আর সে তল্লাটে থাকে?
–বড়মামা! সে রাতের মতো কে এসে আমাকে জিগ্যেস করছিল– বড়মামা আমার কথার ওপর বললেন, তুই কী বললি তাকে?
–বললাম বড়মামা আড়িপাতা-ভূতটাকে শিশিতে ভরতে গেছেন। তাই শুনে সে সর্বনাশ বলে পালিয়ে গেল।
বড়মামা হতাশ হয়ে বললেন,–পুঁটু! মনে হচ্ছে, ব্যাটাচ্ছেলে সেই আড়িপাতা ভূতটাই বটে। নাহ। পাঁচু বা কিনু নয়। এতক্ষণ তাদের সঙ্গেই তো কথা হচ্ছিল। আমাকে দেখেই দুজনে এসে কাকুতিমিনতি করতে লাগল। আড়িপাতা ভূতটার জন্য ওরা না খেয়ে মারা পড়তে বসেছে। তো আমার কথা শুনে ওরা আমাকে সাহায্য করবে বলল। আর সেই সময় তুই ডাকাডাকি শুরু করলি?
বললাম,-বড়মামা! পাঁচু-কি ফিরে এসেছে?
–আসবে না? হাজার হলেও নিজের এরিয়া। তাছাড়া বাইরের এরিয়ার চোরেরা এদের বরদাস্ত করবে কেন? চুরির ভাগে কম পড়বে না?
বড়মামা হাঁটতে-হাঁটতে ফের বললেন,–কিন্তু আড়িপাতা ব্যাটাচ্ছেলেকে যে ফেরত দিতেই হবে। ওদের রাজামশাইকে কথা দিয়ে এসেছি। বড় গণ্ডগোলে পড়া গেল দেখছি।
বাড়ি ফিরে ক্লান্ত বড়মামা মাকে চায়ের হুকুম দিলেন। মা বললেন, দাদা জানো কী হয়েছে? একটু আগে সিঙ্গিমশাই এসে বলে গেলেন, গতকাল পাঁচু আর কিনু মেদিগঞ্জে ওঁর জামাইয়ের বাড়িতে সিঁদ কাটতে গিয়েছিল। তাড়া খেয়ে দুজনে বিলের জলে ঝাঁপ দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে হাজার-হাজার জোঁক ওদের গায়ে সেঁটে যায়। রক্ত চুষে জোঁকগুলো বেচারাদের মেরে ফেলে। সিঙ্গিমশাই আজ সকালে ওদের মড়াদুটো দেখে এসেছেন।
বড়মামা হাঁ করে শুনছিলেন। বললেন,–সে কী! আমি তাহলে শ্মশানে কাদের সঙ্গে
বলেই থেমে গেলেন বড়মামা। আমিও হতভম্ব হয়ে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
দাদু তার ঘর থেকে একটু কেশে বললেন,–কিনুটা ফিচেল আর বদমাশ ছিল, ওর জন্য দুঃখ হয় না। তবে হতভাগা পাঁচুটার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। কিনুর পাল্লায় পড়েই ওর এই সর্বনাশ হল।…
বড়মামা অনেক চেষ্টাও করেও আড়িপাতা-ভূতটাকে ধরতে পারেননি এবং তার ফলটাও শেষপর্যন্ত ভালো হয়নি। আমার সেই ছোটবেলার কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। আড়িপাতা-ভূতটা ওর কথা তাকে, তার কথা ওকে লাগিয়ে-ভাঙিয়ে গ্রামে বড্ড ঝগড়াঝাটি বাধাত। মামলা-মোকদ্দমাও বেড়ে গিয়েছিল। ওইরকম লাগানি ভাঙানি চলতে থাকলে গ্রামে দলাদলি না হয়ে পারে?
হ্যাঁ–এখনও হতচ্ছাড়া বজ্জাতটা আমাদের গ্রাম ছেড়ে পালায়নি। তাই এখনও সেই দলাদলি-হাঙ্গামা লেগেই আছে। ভয়ে আমি আর গ্রামে যেতে পারিনে। বলা যায় না, আড়িপাতা-ভূত ব্যাটাচ্ছেলে কী শুনতে কী শুনে আমার বিরুদ্ধে কার কান ভারী করবে, আর মাঝখান থেকে আমি পড়ব বিপদে। বড়মামা কাজটা ঠিক করেননি।…
চোর-পুলিশ
এ যেন সুকুমার রায়ের ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল, সেইরকম। ছিল তাল গাছ, হয়ে গেল বেড়াল। দুদে দারোগা বঙ্কুবাবু তো তাজ্জব। শুধু তাজ্জব নন, রীতিমতো হতবাক। থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন কেষ্টনগরের পুতুলটি হয়ে।
আসছিলেন কেকরাডিহি থেকে একটা তদন্ত সেরে। দুদিন আগে সেখানে দুদলে খুব মারপিট-রক্তারক্তি হয়ে গেছে। তদন্ত সারতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গের দুজন বন্দুকধারী সেপাইকে সেখানকার শান্তিরক্ষার ভার দিয়ে বন্ধুবাবু সাইকেলে চেপে একা থানায় ফিরছিলেন। কেকরাডিহির বিশাল মাঠের মাঝামাঝি পোঁছে চাঁদ উঠেছিল। কাঁচা রাস্তায় বড় ধুলো। তাই আস্তে সাইকেল চালিয়ে আসছিলেন আর অভ্যাসবশত গুনগুন করে গানও গাইছিলেন। তারপর সামনে দেখলেন একটা বাজপড়া মুন্ডুহীন ঢ্যাঙা তালগাছ। সেই সময় হঠাৎ মনে পড়ছিল, আসার পথে তো এমন কোনও তালগাছ দেখেননি! সেজন্যই একটু অবাক হয়ে সাইকেলে ব্রেক কষেছিলেন। তারপর এই অদ্ভুত ঘটনা।
