একদিন দুপুরবেলা মনমরা হয়ে থানার পেছন দিকে নিরিবিলি একটা আমতলায় বঙ্কুবাবু দাঁড়িয়ে আছেন, সেইসময় শনশনিয়ে বাতাস উঠল। একটা ঘূর্ণি হাওয়া ধুলোবালি শুকনো পাতা উড়িয়ে গাছটাকে নাড়া দিল। চোখে ধুলো ঢোকার ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলেন বঙ্কুদারোগা। চোখ খুলে হকচকিয়ে গেলেন। সামনে একটু তফাতে আছেন তাঁর বন্ধু করালীমোহন। তিনিও এক দারোগাবাবু। অন্য একটা থানায় ছিলেন বলে জানতেন। বহুদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই দুজনে। বঙ্কুবাবু খুব খুশি হয়ে বললেন,–আরে? করালী যে! তুমি হঠাৎ কোত্থেকে?
করালীমোহন মিটিমিটি হেসে বললেন,–শুনলাম খুব ঝামেলায় পড়েছ চুরিচামারি নিয়ে। তাই ভাবলুম গিয়ে জেনে আসি ব্যাপারটা কী।
বঙ্কুবাবু বললেন,–বলছি। কিন্তু তুমি এখন কোন থানায় আছো? খোঁজখবর পাইনে। সদরে কনফারেন্সে গিয়েও তোমাকে দেখতে পাইনে। নিশ্চয়ই অন্য জেলায় বদলি হয়ে গেছ?
করালীমোহন বললেন, বদলি হয়েছি, সেটা ঠিক। তবে তোমার প্রবলেমটা আগে শুনি।
বঙ্কুবাবু সংক্ষেপে পাঁচুর ভূতের সঙ্গে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে সবটাই বললেন। শোনার পর করালীমোহন হেসে অস্থির,-এই কথা? ঠিক আছে? আমি দেখেছি ব্যাটাকে।
–কী করে দেখবে? ব্যাটা তো মানুষ নয়, ভূত।
করালীমোহন হাতের বেটন নাড়া দিয়ে বললেন,–ভূতকে শায়েস্তা করতে ভূত চাই। বুঝলে তো?
–কিন্তু সেটাই তো সমস্যা। পাচ্ছিটা কোথায়?
–আছে, আছে।
করালীমোহন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা ঘূর্ণি বাতাস এল মাঠের দিক থেকে। ধুলো ঢোকার ভয়ে চোখ বুঝলেন বন্ধুবাবু। বাতাসটা চলে গেলে চোখ খুললেন। তারপর অবাক হয়ে গেলেন। করালীমোহন নেই।…
.
দিন দুই পরে বন্ধু দারোগা লক্ষ করলেন, থানায় আর একটাও চুরির নালিশ আসছে না। তারপর একদিন স্বয়ং এম. এল. এ.-মশাইও মিছিল করে এসে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন। সদর থেকে পুলিশকর্তার প্রশংসার চিঠি এসে গেল। ব্যাপারটা কী?
করালীমোহন কি তাহলে ভূতের রোজা দিয়ে পাঁচুকে শায়েস্তা করে ফেলেছেন? করালীমোহন পাকা লোক বটে। তার চেয়ে আরও উঁদে দারোগা। তার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। নিশ্চয়ই রোজা লাগিয়ে ব্যাটাচ্ছেলেকে ঢিট করে ফেলেছেন। দুচ্ছাই, কেন যে ভূতের রোজার কথাটা তার মাথায় আসেনি।
তবে করালীমোহনের দৌলতে প্রমোশনের চিঠি পেয়ে গেলেন বঙ্কুবাবু। মফস্বলে শহরে একেবারে এস.ডি.পি.ও.-র পোস্টে প্রমোশন। অবিলম্বে জয়েন করতে হবে। রাত্তিরে জিনিসপত্তর বাঁধাছাদা হয়ে গেছে। ভোরবেলা রওনা দেবেন! আনন্দে ও উত্তেজনায় ঘুম আসছে না চোখে। আনন্দ প্রকাশ করতে নিরিবিলি গুনগুন করে গান গাওয়া অভ্যেস বন্ধুবাবুর। তাই থানার প্রাঙ্গণ পেরিয়ে খেলার মাঠটাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। তেমনি জ্যোত্মারাত। বাতাস বইছে। সবে গুনগুনিয়ে রবীন্দ্রসংগীত ধরেছেন, আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে…এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেলেন কালো মতো কী একটা সামনে আসছে। গানভঙ্গ হওয়ায় খাপ্পা বঙ্কুবাবু বললেন,–কে রে?
কালো মূর্তিটা দাঁড়িয়ে গেল। বলল, আমি স্যার!
–আমি কে? কী নাম? বাড়ি কোথায়?
–স্যার, আমি সেই পাঁচু।
বঙ্কুবাবু খি-খি করে হেসে বললেন,–পাঁচু! আয়, আয়! কেমন জব্দ হয়েছিস বল।
পাঁচুর ভূতও পাল্টা হেসে বলল, জব্দ হয়েছিলুম বটে দিন কতক।
–তার মানে?
–বুঝলেন না? করালীদারোগার নাতিগয়ায় পিণ্ডি দিয়ে ফিরে এসেছে। এখন করালীবাবু উদ্ধার হয়ে স্বর্গে চলে গেছেন। আর আমায় ঠেকায় কে? যাচ্ছিলুম হরিবাবুর বাড়ি সিঁদ কাটতে, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভাবলুম খবরটা দিয়েই যাই।
বঙ্কুবাবু চমকে উঠে বললেন, করালীমোহনের পিণ্ডি! কী বলছিস রে? করালী মারা গিয়েছিল বলেনি তো সেদিন?
কবে মরে ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। পাঁচ-চোর বেজায় হাসতে লাগল। আপনার অবস্থা দেখে আমার পেছনে লেগেছিলেন কিছুদিন। উঃ, খুব ঠেঙিয়েছে। এখনও গা ব্যথা করছে স্যার!
ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বন্ধুবাবু বললেন, আমার প্রমোশন হয়ে তো বড় ভুল হল দেখছি। তুই তো আবার লোকেদের জ্বালাতে শুরু করবি। নতুন দারোগাবাবুটির বয়স কম। ওরে পাঁচু, দোহাই তোকে, এ বেচারাকে ঝামেলায় ফেলিসনে বাবা!
পাঁচু বলল,–তা কি হয় স্যার? আপনিই তো মনে করিয়ে দিয়েছেন, স্বভাব যায় না মলে।
বলেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল। বন্ধুদারোগা তার উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বললেন,–ঠিক আছে। আমায় মরতে দে। তারপর মজা দেখাচ্ছি। উইল করে যাব, যেন কেউ আমার জন্য গয়ায় পিণ্ডি না দেয়।
রাগে-দুঃখে বন্ধুবাবুর আগের মুড নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন জায়গায় গিয়েই উকিল ডেকে উইল লিখিয়ে তবে শান্তি।
একটু উপসংহার আছে। মফস্বল শহরের বুদ্ধিমান উকিলরা বন্ধুবাবুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, নিজের পিণ্ডিদত্তের ব্যবস্থা বন্ধ করার বদলে পাঁচু চোরের পিণ্ডির ব্যবস্থা করলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। কিন্তু দুঃখের কথা, বন্ধুবাবুর সে চেষ্টা সফল হয়নি। পাঁচুর ঝড়েবংশে কেউ ছিল না। তাছাড়া একজন চোরের নামে পিণ্ডি দেওয়ার লোকও খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে শোনে সেই বলে, পাঁচুর নামে পিণ্ডি দিতে গয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠে বসি, এদিকে আমার সর্বনাশ হয়ে যাক। আমি ওতে নেই বাবা! পিণ্ডি দেওয়ার আগেই পাঁচু ফতুর করে দেবে। ভূতের কান খুব সজাগ। নজরও কড়া।
