আমাদের বাড়িটা ছিল একতলা এবং খুবই পুরোনো। পেছনদিকটায় এখানে ওখানে পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে তলার দিকটা নোনাধরা। শ্যাওলা জমে সবুজ হয়ে গিয়েছিল। বাবা ছিলেন অলস প্রকৃতির মানুষ। মেরামত করব, করছি এই ধরনের ভাব দেখাতন।
তো সবাই একবাক্যে রায় দিলেন,–পাঁচু কিনু দুই মাসতুতো ভাইয়েরই কীর্তি। বড়মামা বললেন, দুই স্যাঙাত আমার গলা শুনে চুরির জিনিস ফেলে পালিয়েছে। রোসো, দেখাচ্ছি মজা! থানা-পুলিশ করে কাজ হবে না। এর মোক্ষম দাওয়াই শিগগির নিয়ে আসছি।
বড়মামা পরদিন ভোরে কোথায় চলে গেলেন কে জানে! বাবা এতদিনে বাড়ি মেরামতে মন দিলেন। দাদু খুব মনমরা হয়ে গিয়েছিলেন। মাঝে-মাঝে ক্ষুব্ধভাবে বলতেন, পাঁচু হতচ্ছাড়া প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করল? ওর কপালে এবার অশেষ দুঃখ আছে। কিনুর পাল্লায় পড়েই ওর বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে।
বড়মামা ফিরলেন পুজো শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে। বরাবর যেমন বিকেলের বাসে আসেন তেমনিই এলেন। মুখে রহস্যময় মিটিমিটি হাসি। বললেন,–আজ সন্ধ্যায় আর গল্পের আসর নয়। কিছু গোপন কাজকর্মে বেরুব। শুধু পুটুকে সঙ্গে নেব। পুঁটু। ভয় পাবিনে তো?
কথাটা শুনেই গা ছমছম করল। বললাম,-কোথায় যাবেন বড়মামা?
–চুপ। জিগ্যেস করবিনে। যাবি কি না, বল!
একটু দোনামনা করার পর বললাম,–যাব।
কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপুজোর পর কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়েছে। চাঁদ উঠতে দেরি আছে। বড়মামা চুপিচুপি আমাকে সঙ্গে নিয়ে বেরুলেন। গা ছমছম করা অন্ধকার। বড়মামার কাছ ঘেঁষে পা ফেলছি। তখন আমার হয়েছে পাঁচু-চোরেরই অবস্থা। একটু শব্দে চমকে উঠছি।
কিছুক্ষণ চলার পর ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি। বড়মামা?
বড়মামা তেমনই ফিসফিস করে বললেন,–চুপ।
তারপর টের পেলাম, আমরা ঝিলের ধারে এসে পড়েছি। ঝিলের জলে আকাশভরা তারার প্রতিবিম্ব ঝিকমিক করছে। কিন্তু এখানেই তো শ্মশান। শ্মশানে বড়মামা কেন এলেন বোঝা যাচ্ছে না।
হঠাৎ বড়মামা বসে পড়লেন। তারপর আমার হাতে তার টর্চ গুঁজে দিয়ে কানে কানে বললেন, তুই এখানে অপেক্ষা কর পুঁটু। আমি আসছি। আমার কাশি শুনতে পেলে টর্চ জ্বেলে আলো দেখাবি। নইলে ভুল করে শেয়াকুল কাটার জঙ্গলে ঢুকে পড়লেই গেছি। রক্তারক্তি হয়ে যাবে।
বড়মামা গুঁড়ি মেরে অন্ধকারে অদৃশ্য হলেন। শ্মশানে এক জায়গায় একা আমি টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একটা পঁাচা ক্রাও-ক্রাও করে চেঁচিয়ে উঠতেই আমার বুক ধড়াস করে উঠল। সেই সঙ্গে কাছাকাছি কোথাও একদল শেয়াল ডাকতে শুরু করল। ভয়ে আমি বড়মামা বলে ডাকবার উপক্রম করেছি, সেইসময় পেছন থেকে কে বলে উঠল,–কে ওখানে?
চমকে উঠে বললাম, আমি পুঁটু।
–তা এখানে কী করা হচ্ছে শুনি?
–বড়মামার জন্য অপেক্ষা করছি।
–তোমার বড়মামা কোথায় গেছেন?
–জানি না। ওই দিকে কোথায় যেন গেলেন।
যে কথা বলছিল, তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার কথাটা শুনেই সে বলে উঠল, সর্বনাশ! তারপর মনে হল, অন্ধকারে কে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
ব্যাপারটা রহস্যময়। কী করব ভাবছি, সেই সময় বড়মামার কাশির শব্দ কানে এল। অমনি টর্চের আলো জ্বালোম। দেখলাম, বড়মামা হন্তদন্ত হেঁটে আসছেন।
কাছে এসে বললেন, ব্যস! কাজ শেষ। এবার বাড়ি ফেরা যাক।
ফেরার পথে সেই লোকটার কথা বললাম। বড়মামা হাসতে হাসতে বললেন, দুই স্যাঙাতের যে-কোনও একজন হবে। হয় পাঁচু, নয় তো কিনু।
–সর্বনাশ কেন বলল বড়মামা?
–বলবে না? ওদের গোপন ডেরায় একজনকে রেখে এলাম যে!
–কাকে রেখে এলেন?
বড়মামা কানে কানে বললেন,–আড়িপাতা ভূতকে। সেই ভূতের দেশে গিয়ে রাজার কাছে একজন ঝানু আড়িপাতা ভূত চেয়ে এনেছিলাম। বুঝলি? শিশিতে ভরে দিয়েছিলেন রাজামশাই। শিশিটা রেখে দিলাম। পরে দেখাব তোকে। পাঁচু-কিনু জব্দ হলে আড়িপাতা ভূতকে লোভ দেখিয়ে ফের শিশিতে ঢুকিয়ে ছিপি এঁটে ফেরত দিয়ে আসতে হবে।
অবাক হয়ে বললাম, আড়িপাতা ভূত পাঁচু-কিকে কীভাবে জব্দ করবে?
–দেখবিখন। চোরের পেছনে পুলিশ লেলিয়ে দেওয়ার চেয়ে ভূত লেলিয়ে দিলে কী হয়…
শিশিটা পরে দেখিয়েছিলেন বড়মামা। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ছোট্ট শিশির মতো দেখতে। কিন্তু আড়িপাতা ভূতের কাণ্ডকারখানা ক্রমশ বুঝতে পারলাম।
পাঁচু-কিনুর গোপন ডেরার খবর বড়মামা নাকি লালু-গয়লার কাছে পেয়েছিলেন। তবে পাঁচু আর কিন্তু এই দুই চোর তাদের গোপন ডেরা বদলালে কী হবে? যেখানেই চুপিচুপি পরামর্শ করত, আজ রাতে তার বাড়িতে সিঁদ কেটে চুরি করতে যাবে, আড়িপাতা ভূত তা শুনে ফেলত। তারপর ঠিক সময়ে সেই বাড়ির কর্তাকে জানিয়ে দিত। বাড়ির কর্তা আলো জ্বেলে লোকজন নিয়ে তৈরি থাকতেন। দুই চোর সেই বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারত না।
আড়িপাতা ভূত তার কাজটা কীভাবে করত, তা জানা গিয়েছিল পরে। যেমন, ওরা এক রাত্তিরে মল্লিকবাড়িতে সিঁদ কাটার পরামর্শ করেছে। সেদিন সন্ধ্যায় মল্পিকমশাই ক্লাবে তাস খেলতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার কাছ ঘেঁষে যাওয়া এক ছায়ামূর্তি ফিসফিস করে বলে গেল, সাবধান মল্লিকমশাই! আজ রাতে আপনার বাড়িতে সিঁদ কাটতে চোর আসবে।
শোনামাত্র মল্লিকমশাই বাড়ি ফিরে পাড়ার লোকজন ডেকে হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে তৈরি হলেন। পাঁচু-কিনু বেজার হয়ে ফিরে গেল।
