একদিন বাবা বাইরে থেকে এসে বললেন,–সিঁদেল চোরের খোঁজ পাওয়া গেছে। দারোগাবাবুর মুখে শুনে এলাম, লোকটার নাম কি। কঁপুইহাটির দাগি চোর। সদ্য জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছে।
দাদু বললেন, ঝাঁপুইহাটির কি?
–চেনেন নাকি তাকে?
চিনি বইকী।দাদু ফোকলা মুখে খুব হাসলেন। একেই বলে চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই। আমাদের গ্রামের পাঁচুর মাসির ছেলে হল কিনু। কাজেই পাঁচুর মাসতুতো ভাই। তবে আমার সন্দেহ হচ্ছে, পাঁচুকে কিনু ট্রেনিং দিয়ে তার চেলা করেনি তো?
পরদিন সকালে লালু-গয়লা দুধ দিতে এসে বলল,–গত রাত্তিরে সিঙ্গি মশাইয়ের বাড়িতে সিঁদ কাটছিল কিনু। সিঙ্গিমশাই জেগেই ছিলেন। জানালা দিয়ে টর্চের আলো ফেলে কিনুকে পালাতে দেখেছেন। তবে কিনুর সঙ্গে কে ছিল জানেন? হতচ্ছাড়া পাঁচু।
দাদু বললেন, তাহলে যা বলেছিলাম, মিলে গেল।
লালু বলল, বকুদারোগা থাকলে এক্ষুনি এর বিহিত হতো। শুনেছি উনি মন্তর তন্তর জানতেন। রাতবিরেতে বেরিয়ে মন্তর পড়লেই চোরেরা এসে শেয়ালের মতো ফঁদে পড়ত।
দাদু বললেন, আচ্ছা লালু, তুমি তো ঝিলের ওদিকে গোরু-মোষের পাল চরাতে যাও। পাঁচুর সঙ্গে দেখা হয় না?
–আজ্ঞে, রোজই যাই। কিন্তু পাঁচুকে আর দেখতে পাইনে। আগে কখনও সখনও দেখা হতো। তবে সেটা নেহাত চোখের দেখা। আপনি তো জানেন কর্তাবাবু, পাঁচু যা ভিতু। চোখে চোখ পড়তেই হাওয়া হয়ে যেত।
-পাঁচুর বাড়িটার কী অবস্থা এখন?
লালু হাসল। বাড়ি মানে তো একটা কুঁড়েঘর ছিল। কবে ওটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। জঙ্গল গজিয়েছে।
–বলো কী! তাহলে পাঁচু এখন থাকে কোথায়?
লালু গম্ভীর হয়ে চাপাগলায় বলল,–গত রাত্তিরে সিঙ্গিমশাই ওকে কিনুর সঙ্গে দেখেছেন। কাজেই পাঁচু কঁপুইহাটিতে কিনুর বাড়িতে থাকে।
হুঁ। চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই।-–বলে দাদু আবার একচোট হাসলেন।
লালু-গয়লা চলে যাওয়ার পর বাবা বললেন, কিনু পাঁচুকে তাহলে সত্যি ট্রেনিং দিয়েছে। তা না হলে সিঙ্গিমশাইয়ের বাড়ির আনাচে কানাচে পা বাড়ানোর সাহস ছিল না পাঁচুর। সিঙ্গিমশাইয়ের বন্দুক আছে না? লালু শুনতে পায়নি। কাল রাত্তিরে আমি কিন্তু বন্দুকের গুলির শব্দ শুনেছিলাম। ট্রেনিং না পেলে পাঁচু গুলির শব্দ শুনে কোথাও ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকত।
দাদু সায় দিয়ে বললেন, ঠিক বলেছ। তবে আমাদের চিন্তার কারণ নেই। পাঁচু আমার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর কক্ষনও আমাদের বাড়িতে চুরি করতে ঢুকবে না। বলেছিলাম না সেই যে তালগাছের ডগায় চড়ার ঘটনাটা! মনে পড়ছে?
বাবা চুপ করে গেলেন। আমরা ছোটরা দাদুকে হইহই করে ঘিরে ধরলাম। বলুন না দাদু আবার সেই গল্পটা!
.
সেবার পুজোর সময় যথারীতি বড়মামা এলেন। এসেই ঘোষণা করলেন, সদ্য এমন একটা দেশ থেকে আসছেন, যেখানে খালি ভূত আর ভূত। রাজা মন্ত্রী সেনাপতি সব্বাই ভূত। সৈন্যেরাও ভূত। প্রজারাও ভূত। পণ্ডিতমশাইরা ভূত। ছাত্ররাও ভূত। দোকানদাররাও ভূত। খদ্দেররাও ভূত। অর্থাৎ ভূতে-ভূতে ছয়লাপ। তবে সেটা যে ভূতের দেশ, তা এমনিতে বোঝা যায় না। কিছুদিন থাকার পর ক্রমে-ক্রমে টের পাওয়া যায়।
সন্ধ্যার পর বারান্দায় বড়মামার গল্পের আসর বসল। মা সকাল-সকাল রান্না সেরে আসরে এলেন। বাবা এ আসরে যোগ দিতেন না। কারণ নবমীর রাত্তিরে ক্লাবের থিয়েটার। তাই রিহার্সালের তাড়া থাকত। আমাদের বাড়ির কাজের লোক হারাধন বড়মামার গল্পের আসর শেষ হলে তবেই লণ্ঠন হাতে বাড়ি ফিরত। এমনকী কাজের মেয়ে সৌদামিনী, যার ডাকনাম ছিল সোদু, সে-ও আসরের একপাশে বসে অবাক চোখে তাকিয়ে গল্প শুনত। আসর ভাঙলে সে হারাধনকে কাকুতি-মিনতি করত তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। কারণ বড়মামার সব গল্পই ছিল সাংঘাতিক এবং গা-ছমছম করা।
ওই সময়টা দাদু তার ঘরে বসে লণ্ঠনের আলোয় ধর্মকর্মের বই পড়তেন।
তো বড়মামা সেই আজব দেশে গিয়ে কীভাবে টের পেলেন এটা ভূতেরই দেশ, সেই ঘটনা সবে শুরু করেছেন, এমন সময় দাদু চাপাগলায় ডাক দিলেন, হারাধন! হারু!
হারাধন সাড়া দিল, আজ্ঞে!
দাদু তেমন চাপাগলায় বললেন,–দেখে আয় তো! কোথায় যেন কেমন একটা শব্দ হচ্ছে।
হারাধন বলল,–ও কিছু না। বাতাসের শব্দ কর্তামশাই!
দাদু ধমক দিলেন।–বাড়ির পেছনটা দেখে আয় না একবার।
গল্পে বাধা পড়ায় আমরা বিরক্ত। মা বললেন,-বেড়াল-টেড়াল হবে।
বড়মামা মুচকি হেসে বললেন, আমাকে ফলো করে সেই ভূতরাজ্যের কোনও গুপ্তচর এসেছে হয়তো। ওদের নিন্দে না প্রশংসা করছি, তার খোঁজ নিতে রাজামশাই চর পাঠিয়ে থাকবেন।
কিন্তু দাদুর ধমক খেয়ে অগত্যা হারাধনকে বেরুতেই হল। সে খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়েছিল। ওদিকটায় একটা ছোট্ট পুকুর আর তিনপাড়ে ফুলফল সবজির বাগান।
হঠাৎ হারাধনের চিৎকার শোনা গেল,–চোর! চোর! চোর!
তারপরই অদ্ভুত ঝনঝন ঠনঠন সব শব্দ। বড়মামা বেরিয়ে গেলেন। তার হাতে টর্চ ছিল। তাঁরও হেঁড়ে গলায় গর্জন শোনা গেল, ধর! ধর! মার! মার! পালাচ্ছে! পালাচ্ছে।
এক মিনিটেই হুলুস্থুল কাণ্ড। প্রতিবেশীরাও টর্চ হাতে বেরিয়ে পড়ল। সিঙ্গি মশাইয়ের বাড়ির দিক থেকে বন্দুকের গুলির শব্দ হল বার দুয়েক। ওই সময়টাতে সিঁদ কেটে চুরির উপদ্রব চলছিল। তাই এত শোরগোল।
অবশেষে দেখা গেল, পুকুরপাড়ে বাগানের মধ্যে একটা বস্তাভর্তি বাসনকোসন পড়ে আছে। আর আমাদের একটা ঘরের পেছনদিকে দেয়ালে সিঁদ কেটেছে চোর। নোনায় ধরা ইটগুলো নিচে পড়ে আছে।
