এক রাত্তিরে মরিয়া হয়ে পাঁচু বেরুল। যে বাড়িতে সে চুরি করার ফন্দি এঁটেছে, সেই বাড়ির পেছনে ছিল কয়েকটা গাছ। তলায় শুকনো পাতার ছড়াছড়ি। পা ফেলতেই সেইসব শুকনো পাতা মচমচখড়খড় শব্দ করেছে এবং পাঁচুও যথারীতি ভয় পেয়ে দিশেহারা হয়ে দৌড়েছে।
সেদিন বঙ্কুবাবু নিজে টহলদারিতে বেরিয়েছেন। পাঁচু গিয়ে পড়বি তো পড় একেবারে বন্ধুবাবুর বুকে। আচমকা রাতবিরেতে দারোগাবাবুর বুকে কে এসে সেঁটে গেছে, এটা বিরক্তিকর ব্যাপার। অন্য কেউ হলে টাল সামলাতে পারত না। কিন্তু তিনি দশাসই বিশাল এক মানুষ। তবে এভাবে কী একটা জিনিস তার গায়ে সেঁটে যাবে, এটা চূড়ান্ত রকমের বেয়াদপিও বটে। বাঁ-হাতে এক ঝটকায় জিনিসটাকে ছাড়িয়ে টর্চ জ্বেলে দেখেন, এটা একটা মানুষ।
সেই সঙ্গে কনস্টেবলরা চেঁচিয়ে উঠেছে, পাঁচু! পাঁচু!
পাঁচু-চোর ধরা পড়ে গেল। তখনকার দিনে আইনকানুন ছিল কড়া। পাঁচুর নামে অনেকগুলো চুরির নালিশ ছিল পুলিশের খাতায়। আদালতে তার ছমাসের জেল হল।…
এসব গল্প দাদুর মুখেই শোনা। তখন আমি পাঠশালার পরুয়া। পাঁচু-চোরকে দেখতে ইচ্ছে করত খুব। কিন্তু তাকে পাচ্ছিটা কোথায়?
.
পরে আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ছি, তখন একদিন দৈবাৎ তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। যদিও সেই দেখা হওয়াটা মোটেও সুখের হয়নি।
পুজোর ছুটিতে স্কুল বন্ধ। প্রতি বছর পুজোর সময় বড়মামা আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেদিনই বিকেলে তিনি এসেছেন। বড়মামা ছিলেন ভবঘুরে ধরনের মানুষ। দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক ছিল তার। পুজোর সময় এসে ভাগনে-ভাগনিদের সেই ভ্রমণ-বৃত্তান্ত শোনাতেন। তা যেমন অদ্ভুত, তেমনই রোমাঞ্চকর। এসেই তিনি ঘোষণা করতেন কোন-কোন দেশে গিয়েছিলেন। তারপর সন্ধেবেলায় তাঁর গল্পের আসর বসত। এবার এসে বড়মামা বলেছিলেন, খুব রহস্যজনক একটা দেশ থেকে তিনি আসছেন। তবে না–আগেভাগে কিছু ফঁস করবেন না। সন্ধেবেলায় সবিস্তারে সেই দেশের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবেন। তখন যদি কেউ ভয় পেয়ে ভিরমি খায়, তার দোষ নেই কিন্তু।
ছোটরা ভয় পেতে তো ভালোই বাসে। আমরা কখন সূর্য ডুববে, সেই প্রতীক্ষায় চঞ্চল। এমন সময় বড়মামা হঠাৎ আমাকে বললেন,–পুঁটু! তোদের এখানকার ছানাবড়া খুব বিখ্যাত। এই নে টাকা। পাঁচ টাকার ছানাবড়া নিয়ে আয় শিগগির।
মা বললেন,-হারুর দোকানে যা। আজকাল হারুর মতো ছানাবড়া তৈরি করতে কেউ পারে না।
আমাদের গ্রামের শেষে পিচরাস্তার ধারে ছোট একটা বাজার ছিল। পাশে ছিল হাটতলা। সপ্তাহে দুদিন হাট বসত। বিকেলের দিকে ওখানটা বেশ ভিড়ভাট্টা হতো। হারু-ময়রার দোকান ছিল সেই বাজারে।
হারুই বড্ড দেরি করিয়ে দিল। অবশ্য ওর দোষ ছিল না। পুজোর সময় তার দোকানে খদ্দেরের খুব ভিড় হয়। তখনকার দিনে পাঁচ টাকা অনেক টাকা। টাকায় চারটে করে মোটাসোটা ছানাবড়া। মাটির হাঁড়িতে কুড়িটা ছানাবড়া আমার পক্ষে বেশ ভারী। হাঁড়ির মুখে শালপাতা চাপানো এবং মিশি পাটের দড়ি দিয়ে আঁটো করে বাঁধা। দুহাতে দড়ি আঁকড়ে ধরে কুঁজো হয়ে হাঁটলাম। টাল খেয়ে পড়লে হাঁড়ি ফেটে যাবে।
এদিকে আঙুলও যেন কেটে যাচ্ছে মিহি দড়িতে।
অগত্যা শর্টকাট করার জন্য সিঙ্গিমশাইদের আমবাগানে ঢুকলাম। বাগান পেরুলেই ষষ্ঠীতলা। একটা প্রকাণ্ড বটগাছ। তারপর কাঁচারাস্তায় একটুখানি হাঁটলে আমাদের বাড়ি।
ষষ্ঠীতলায় গেছি, হঠাৎ চোখে পড়ল একটা রোগা-ভোগা লোক। বটগাছের একটা ঝুরির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ছেঁড়া খাকি হাফ-প্যান্ট, খালি গা, মাথার চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। কেমন জুলজুলে চাউনি লোকটার। মুখে কিন্তু মিষ্টি হাসি। তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। সে কাছে এসে মিষ্টি-মিষ্টি হেসে বলল, ওতে কী আছে খোকাবাবু? রসগোল্লা নাকি?
বললাম, না। ছানাবড়া।
–বাঃ ছানাবড়া রসগোল্লার চেয়ে ভালো। কার দোকান থেকে কিনলে?
–হারু-ময়রার।
–বাড়িতে কেউ এসেছে বুঝি?
–হ্যাঁ। বড়মামা এসেছেন।
–বলো কী! খুব ভালো! তা তুমি যে দেখছি হাঁড়িটা বইতে পারছ না। কষ্ট হচ্ছে। দেখো দিকি। এতটুকু ছেলে। আহা রে!
লোকটার কথাবার্তা ও হাবভাব অমায়িক। শুধু চাউনিটা কেমন যেন—
তো সে আমার হাত থেকে হাঁড়িটা সাবধানে ধরে বলল,–চলো! আমি পৌঁছে দিয়ে আসি। এতটুকু ছেলে এত ভারী জিনিস বইতে পারে?
লোকটাকে বাধা দিতে পারলাম না। কিংবা সে পৌঁছে দিলে কষ্টটা থেকে বেঁচে যাই। যে কারণেই হোক, হাঁড়িটা আমার হাতছাড়া হল এবং সে নিমেষে বটগাছের অন্য পাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হতভম্ব হয়ে একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকার পর ঊ্যা করে কেঁদে বাড়ির দিকে দৌড়লাম।
পরে বাড়ির সবাই আমার মুখে লোকটার চেহারার বর্ণনা শুনে সাব্যস্ত করেছিলেন তাহলে এটা পাঁচুরই কাজ।…
.
বছর দুই পরের কথা। আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। বুদ্ধিসুদ্ধি হয়েছে বইকী! তা না হলে কেমন করে বুঝব, আমি কী বোকাই না ছিলাম। অমন নিরিবিলি জায়গায় সন্ধ্যার মুখে অচেনা লোককে ছানাবড়ার হাঁড়ি বইতে দেয় কেউ?
তবে পাঁচু চোর ছিল বটে, কিন্তু নেহাত ছিঁচকে চোর। সে কোনও বাড়িতে সিঁদ কেটে চুরি করেছে বলে শুনিনি। দাদু আরও বুড়ো হয়েছেন তখন। লাঠি হাতে কষ্টেসৃষ্টে হাঁটাচলা করেন। সেই বছর হঠাৎ আমাদের গ্রামে শুধু নয়, এলাকা জুড়ে সিঁদ কেটে চুরি শুরু হল। দাদুর মতে, এ কক্ষনও পাঁচুর কাজ নয়। পাঁচু যা ভিতু সিঁদকাঠি দিয়ে ঘরের দেয়াল ফুটো করতে গেলে যেটুকু শব্দ হবে, তাতেই সে ভয়ে দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যাবে। পাঁচু রাতবিরেতে এতটুকু শব্দ হলেই ভয় পায়।
