–ডাক্তার আর আসবে না তো?
–না, না। তুমি নেমে এসো। উনি ডাক্তারও বটেন, ডক্টর-ও বটেন! কাজেই ভয় নেই।
ব্ৰহ্মদত্যি নেমে এল আবার। তারপর বলল-যাকগে। যেজন্যে তোমায় দেখা দিয়েছি, বলি! এতক্ষণ খালি বাজে বকবক কথা হল। ভবভূতিভায়া, তোমায় বন্ধু বলেই মেনে নিয়েছি! তো কথাটা হচ্ছে আমায় খানভাষাটা শেখাবে?
–নিশ্চয় শেখাব। ইতিমধ্যে শুনে-শুনে তো তুমি কিছু শিখেই ফেলেছ।
–হুঁউ। ভেউ উউ গ র র র র।
–উঁহু। ভেউ-উ-উ-উ র র র র। জিভ তালুতে ঠেকিয়ে উচ্চারণ করো।
–ভেউ-উ-উ-উ র র র র র র…
পরদিন গজপতি এসেছেন বন্ধুসকাশে। দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়াটা ভালোই হয়েছে। ভবভূতি ভাতঘুম দিচ্ছেন অভ্যাসমত। ডাঃ হাউরও পাশের ঘরে নাক ডাকছে। কালীপদর তো সবসময়ে ঢুলুনি। সুযোগ পেলেই ঘুমিয়ে নেয়। সে শ্বান ভাষায় নাক ডাকছে– র র র র গো!
গজপতির দিবানিদ্রার অভ্যাস নেই। বেরিয়ে গিয়ে রোদে দাঁড়িয়েছেন। সবে শীত পড়েছে। বেশ আরাম লাগে।
হঠাৎ কানে এল, বেলগাছ থেকে কে সুর ধরে আওড়াচ্ছে :
গর র র মানে এসো এসো–
ভেউ মানে কে রে?
ঘেঁউ মানে খবরদার–
যাব নাকি তেড়ে?
খ্যাঁক মানে কামড়াব
ভ্যাঁক মানে যাঃ।
আঁউ মানে পেটে ব্যথা–
কিছু খাব না…
গজপতি পা টিপে টিপে এগোলেন। নিশ্চয়ই ভবভূতির কোনও ছাত্র খান ভাষায় পড়া মুখস্থ করছে। পরীক্ষার সময় ছাত্ররা নিরিবিলিতে এমনি করেই তো মুখস্থ করে। গজপতি বেলতলায় গিয়ে মুখ তুলে দেখলেন, ঘন ডাল ও পাতার আড়ালে কালো কুচকুচে একটি বেঁটেখাটো টিকিওয়ালা মূর্তি আপনমনে বসে পড়াশুনো করছে। গজপতি বললেন,–কে হে তুমি? গাছের ডালে বসে ও কী মুখস্থ করছ?
মূর্তিটা পাতা সরিয়ে গজপতিকে দেখেই ফিক করে হাসল। তারপর হনুমানের মতো সড়-সড় করে নেমে এসে বলল,–গজু না তুমি? সেই অ্যাটুকুন দেখেছি ওরে বাবা! কত বড় হয়েছ তুমি? কত বুড়ো হয়েছ। সেই যে তোমার দিদি রাতের বেলা জানালায় দাঁড়িয়ে পান চিবুতে-চিবুতে আমার সঙ্গে গল্পগুজব করত–আর তুমি বিছানায় শুনে টুক-টুক করে তাকিয়ে দেখতে। সে কি আজকের কথা? এসো গজু, তোমায় আদর করি। ওরে আমার গজু ছোনারে! তোমার চুল কেন পাক? ওরে গজু রে গজু রে!…।
গজপতি ততক্ষণে গেটের কাছে। গেট বন্ধ! তখন পাঁচিলে উঠে পড়লেন কোনওরকমে। তারপর লাফ দিলেন। তারপর পড়ি-কিমরি করে দৌড়! একদৌড়ে ঘুঘুডাঙা স্টেশনে। আর এ জীবনে ও বাড়িতে নয় বাপস!
ব্ৰহ্মদত্যি দুঃখিত মনে বেলগাছে উঠে আবার পড়ায় মন দিল।
গজপতি আর সত্যিই আসেন না ঘুঘুডাঙায় ভবভূতির সরমা ভবনে। ভবভূতি, ডাঃ হাউর আর কালীপদ, আর সতেরোটা কুকুর, আর বেলগাছের…ব্রহ্মদত্যিমশাই দিব্যি কাটাচ্ছে। কুকুরগুলো আজকাল মানুষের ভাষায় কথা বলতেও পারে নাকি। তোমরা কেউ ইচ্ছে করলেই ঘুঘুডাঙায় হাজির হতে পারে। তবে সাবধান, ব্রহ্মদত্যি মশায়ের জন্য সন্দেশ নিয়ে যেতে ভুলো না। নয়তো বেলগাছ থেকে শ্বানভাষায় গর্জন শুনবে,–ঘেঁউ গঁর র র র!…
চোর বনাম ভূত
আগের দিনে চোরেরা ছিল বেজায় ভিতু। যেমন আমাদের গ্রামের পাঁচু-চোর। সে নাকি চুরি করতে গিয়ে নিজের পায়ের শব্দে নিজেই ভয় পেয়ে দিশেহারা হয়ে পালাত। দাদুর কাছে শুনেছি, একবার সে আমাদের বাড়ি চুরি করতে এসেছিল। পাঁচিল ডিঙিয়ে উঠোনে নামবার সময় হঠাৎ তার পা পিছলে যায়। তারপর সে ধপাস করে পড়েছে এবং তাতেই যা একটু শব্দ হয়েছে। সেই শব্দেই দিশেহারা পাঁচু উঠোনের কোণে তালগাছের ডগায় তরতর করে উঠে গেছে।
উঠে তো গেছে। কিন্তু নামতে সাহস পাচ্ছে না। নামতে গিয়ে যদি আবার পা পিছলে পড়ে যায়!
এদিকে রাত পুইয়ে ভোর হতে চলেছে। দিনের আলোয় কেউ-না-কেউ তাকে দেখতে পাবে। তখন তার কী অবস্থা হবে ভেবে পাঁচু-চোর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে, কান্না শুনে দাদু টর্চ হাতে বেরিয়ে আসেন। তালগাছের ডগা থেকে কান্না। ভূতপ্রেত নাকি?
তখনকার দিনে পাড়াগাঁয়ের আনাচে-কানাচে ভূতেরাও ছোঁকছোঁক করে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু দাদু ছিলেন সাহসী মানুষ। তালগাছের ডগায় টর্চের আলো ফেলে তিনি অবাক হয়ে যান। জিগ্যেস করেন, তুই কে রে?
পাঁচু-চোর করুণ স্বরে বলে, আজ্ঞে আমি পাঁচু।
–তা তুই তালগাছের ডগায় কী চুরি করতে উঠেছিস? এখন তো আর একটা তালও নেই। নেমে আয় হতভাগা!
–আজ্ঞে বড্ড ভয় করছে।
দাদু বলেন,–তোকে মারব না। পুলিশেও ধরিয়ে দেব না। নেমে আয়। তারপর খুলে বল, তালগাছের ডগায় কেন চড়েছিস?
পাঁচু অনেক কষ্টে নেমে আসে এবং সবকথা খুলে বলে। তারপর দাদুর পা ছুঁয়ে বলে,–আর কক্ষনও আপনার বাড়িতে চুরি করতে ঢুকব না।…..
দাদু গল্পটা খুব জমিয়ে বলতেন। শুনে আমরা ছোটরা হেসে অস্থির হতাম। তো সত্যিই আর পাঁচু কখনও আমাদের বাড়িতে চুরি করতে আসেনি। কিন্তু তার কপাল মন্দ। সেবার থানায় এসেছেন এক পুঁদে দারোগা বন্ধুবিহারী ধাড়া। কনস্টেবলরা এতকাল রাতবিরেতে টহল দিতে বেরুত না। চৌকিদার বড়জোর লণ্ঠন আর লাঠি হাতে এক চক্কর ঘুরে ঘরে গিয়ে নাক ডাকাত। বঙ্কুবাবুর তাড়ায় টহলদারি জোরালো হল।
তার ফলে পাঁচুর অবস্থা হল শোচনীয়। দিনদুপুরে তো আর চুরি করা যায় না। তার ওপর রাত্তিরে গিয়ে কনস্টেবলরা, আবার কখনও চৌকিদার হাঁকড়াক করে জেনে নেয় পাঁচু ঘরে আছে কি না। না থাকলেই তার বিপদ। অন্য কেউ কোথাও সে রাতে চুরি করলে দোষটা পড়বে পাচুরই ঘাড়ে। পাঁচু এক দাগি চোর।
