সেদিন সন্ধ্যায় ভবভূতি একা পায়চারি করছেন। মনে একটা নতুন ভাবনা গজিয়েছে। কুকুরগুলোকে রাষ্ট্রভাষা শেখালে কেমন হয়? অন্য ভাষার চাইতে ওটা খুব তাড়াতাড়ি শেখারই কথা। একটু রাগিয়ে দিয়ে শেখাতে শুরু করলেই ঝটপট শিখে নেবে। রাগ হলেই তো মুখ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বেরিয়ে যায়।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সেই বেলতলায় গেছেন ভবভূতি। হঠাৎ মাথার ওপরে ডালপালার আড়াল থেকে কে ভারী গলায় বলে উঠল,-ঘরররর ঘূ-উ।
চমকে উঠলেন ভবভূতি। কথাটার মানে, কী ভায়া? ঘুরে বেড়াচ্ছ নাকি।
অন্ধকারে ভবভূতি কাকেও দেখতে পেলেন না। বললেন,–সঁঃ : ঘেউ উ। কে হে তুমি? গাছে কী করছ?
জবাব এল, ঘ্যাঁ-আঁ-আঁক ঘরররর…
কী?—ভবভূতি খাপ্পা। বলছে কিনা, আমি যাই করি, তাতে তোমার কী হে! ভবভূতির বেলগাছে বসে ভবভূতিকেই চোখ রাঙাচ্ছে–তাও এই রাতবিরেতে? –তিনি রেগেমেগে চেঁচিয়ে উঠলেন মানুষের ভাষাতেই। এবং রাগ হলে বাঙালি ভদ্রলোক যা করেন, তাই করলেন অর্থাৎ গেট ডাউন। গেট ডাউন ইউ ব্লডি ফুল!
অমনি ধপ করে তার সামনে কে লাফিয়ে পড়ল। অন্ধকার গাঢ় হয়নি ততটা। আবছা দেখলেন, বেঁটেখাটো মোটাসোটা একটা লোক। খালি গা। পরনে খাটো ধুতি কেঁচা করে পরা। পায়ে যেন খড়মও আছে। গলায় পৈতেও ঝকমক করছে।
অবিকল সেই জ্যোৎস্নারাতে ব্রহ্মদৈত্যবেশী গজপতির মতো।
তাহলে আবার নির্ঘাৎ গজপতি রসিকতা করতে বেলগাছে চেপেছিলেন। এই ভেবে ভবভূতি হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন,-গজু, তুই মাইরি আস্ত ভূত!
ভূত!–বেলগাছের লোকটা ঘুসি তুলে বলল, তুমি ভূত! তোমার চোদ্দপুরুষ ভূত! আর গজু বলছ, সেই গজু-টজকে আমি চিনি না!
ভবভূতি বললেন,–দেখো গজু, বাড়াবাড়ি কোরো না। গায়ে জল ঢেলে দেব বলছি!
–কেন? জল ঢালবে কেন?
–তোমার গায়ের কালো পেন্ট ধুয়ে যাবে সেদিনকার মতো।
–সেদিনকার মতো? কী বলছ! আমি আজ এক বছর কাশী-গয়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। সদ্য কাল সন্ধেবেলা ফিরেছি। ফিরেই তোমার কীর্তিকলাপ দেখছি।
ভবভূতি অবাক হয়ে গেছেন। বললেন, তুমি গজু নও?
বেঁটে মূর্তিটা জোরে বনবন করে লাটিমের মতো টিকিসমেত ঘুরপাক খেয়ে বলল,-না না না কভি নাহি!
–আলবাত গজপতি তুমি! চলো, আলোয় চলো! পরীক্ষা করে দেখব।
–আমার আলোয় যাওয়া বারণ আছে। যাব না। পরীক্ষা করে দেখতে হয়, এখানেই দেখো।
–ঠিক আছে। আগে এক বালতি জল আনি।
–সে কী! কেন, কেন?
–তোমার গায়ে কালো পেন্ট ধুতে হবে না? তখন তোমার ফর্সা রং বেরিয়ে পড়বে।
ভবভূতি পা বাড়াচ্ছিলেন, মূর্তিটা পিছু ডাকল,–শোনো, শোনো। বলছিলুম কী, জল না ঢাললে হয় না? বড্ড ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। মাইরি, শীতে জমে যাব। তুমি বরং কাছে এসে আমাকে টিপে দেখো! আমি তোমার গজু না টজু, সহজে বুঝতে পারবে।
ভবভূতি সটান গিয়ে ওর গোঁফ খামচে ধরলেন। মূর্তিটা চ্যাঁচিমেচি করে বলল, ওরে বাবা রে! গেছি রে! গেছি রে! ছাড়ো ছাড়ো! উঃ হু হু হু!
তাইতো! গজপতির তো গোঁফ নেই। সে রাতে নকল গোঁফ পরেছিলেন। কিন্তু এর গোঁফটা দেখা যাচ্ছে আসল। তার চেয়ে বড় কথা, আজ সকালে গজপতি এসেছিলেন। গোঁফ পরিষ্কার কামানো ছিল। সন্ধ্যার মধ্যে এমন পেল্লায় গোঁফ গজাতে পারে না তার। তাহলে এ গজপতি নয়, অন্য কেউ।
ভবভূতি গোঁফ ছেড়ে চুল ধরতে গেলেন। ধরা গেল না। ছোট-ছোট চুল যেন পেরেকের ডগার মতো। হাতে বিধতেই ভবভূতি হাত সরিয়ে নিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,–তাহলে তুমি কে শুনি?
মূর্তিটিও তাঁর মতো গম্ভীরগলায় জবাব দিল, আমার নাম বলা বারণ। তাছাড়া বললেই তুমি ভিরমি খাবে। কাজেই চেপে যাও।
–ইয়ার্কি? পুলিশে দেব তোমাকে। কেন তুমি আমার বাড়িতে ঢুকেছ?
–তোমার বাড়ি? তোমার বাড়িতে ঢুকলুম কোথায়? আমি তো গাছে ছিলুম।
–গাছটাও যে আমার।
–তোমার গাছ মানে? আজ তিনশো বছর এই গাছ আমার দখলে! আমি এই গাছে থেকে বুড়ো হয়ে গেলুম! আর তুমি বলছ আমার গাছ?
গাছে থাকো! এই বেলগাছে? রাগের মধ্যে ভবভূতি হেসে ফেললেন।
মূর্তিটি বলল, এতে হাসির কী আছে? যার যেখানে বাসা। তুমি মানুষ, তাই বাড়িতে থাকো। আমি ইয়ে, তাই বেলগাছে থাকি।
–ইয়ে মানে? তুমি কি ব্ৰহ্মদত্যি?
খবরদার নাম ধরে বলবে না! জানো না কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বললে রেগে যায়? ব্রহ্মদত্যিকে ব্রহ্মদত্যি বললে রাগ হবে–ভীষণ রাগ বলে সে দাঁত কিড়মিড় করে রাগটা দেখিয়ে দিল। টিকিটা কাঠির মতো সোজা দাঁড়িয়ে রইল।
ভবভূতি এবার একটু সংশয়ান্বিত হয়ে বললেন, তাহলে বলছ, তুমিই এই বেলগাছের ব্রহ্মদত্যি?
–আলবাত। আদি, আসল এবং অকৃত্রিম ব্ৰহ্মদত্যি। এতটুকু ভেজাল নেই।
–বিশ্বাস করি না। আজকাল সবকিছুতেই ভেজাল। –তাহলে প্রমাণ চাও?
–হুঁউ। চাই।
–বলো, কী প্রমাণ চাও?
–তুমি যদি আসল ব্ৰহ্মদত্যি, তাহলে…তাহলে…
কথায় বাধা পড়ল। গাড়িবারান্দা থেকে ডাঃ হাউরের গলা শোনা গেল, কার সঙ্গে কথা বলছেন ভবভূতিবাবু?
অমনি মূর্তিটা একলাফে গাছের ডালে উঠে পড়ল। ফিসফিস করে বলল, এই? ওকে বোলো না মাইরি! ডাক্তার-টাক্তার দেখলেই আমার বড্ড বুক কাপে। ওরা যে ইনজেকশান দেয়।
ভবভূতি হাসি চেপে ডঃ হাউরকে বললেন,–ও কিছু না। আপনি বরং কালীপদকে কড়া করে কফি বানাতে বলুন। ঠান্ডা পড়েছে বেশ।
তাহলে আর শিশিরে ঘুরবেন না। বলে ডাঃ হাউর ভেতরে ঢুকে গেলেন। ভবভূতি বললেন, কই হে ব্রহ্মদত্যি-মশাই, নেমে এসো!
