ব্যাস, ভবভূতি ওকে নিয়ে পড়লেন। রোজ দু-ঘণ্টা করে মনোযোগী ছাত্রের মতো সে কর্তাবাবুর কাছে বসে কুকুরের ভাষা শেখে। রান্নাঘরে গিয়ে আপনমনে অভ্যাস করে। জিভ তালুতে ঠেকিয়ে কীভাবে কীভাবে ঘেউ করতে হয়, সহজেই রপ্ত করে নেয়। রান্নাঘর থেকে অনেক সময় তার সেই ঘেউ শোনা যায়। ভবভূতি তাঁর ঘর থেকে সাড়া দিয়ে বলেন,-ঘেউ ঘেউ ঘোঃ। বাঃ বহুত আচ্ছা। ঠিক হচ্ছে।
কিছুদিন পরে দেখা গেল, দুজনে আর মানুষের ভাষায় কথা বলছেন না। স্রেফ কুকুরের ভাষায় কথা চলছে।
কারণ ভাষাশিক্ষার তাই নিয়ম! যেমন কিনা ইংরাজি স্কুলে যারা পড়ে, তাদের সবসময় ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। তাছাড়া সেই যে একটা কথা আছে–যদি ইংরেজি শিখতে চাও, তাহলে ইংরেজিতে কথা বলো, ইংরেজিতে স্বপ্নও দেখো।
কুকুরের ভাষায় আজকাল দুজনে স্বপ্ন দেখতেও চেষ্টা করেন বইকী?
আর এই ভাষার নামও খুঁজে পেয়েছেন ভবভূতি। শ্বানভাষা। শ হল কিনা কুকুর। তাদের ভাষার নাম শান ভাষা।
যে গোয়ালা রোজ সরমা অর্থাৎ ভবভূতিবাবুর বাড়িতে দুধ দিতে যায়, সে অবাক হয়ে শোনে, ভবভূতি বলছেন,–ঘৌ ঘৌ ঘঃ?
কালীপদ জবাব দিচ্ছে,–ঘরররর ঘ্যাঃ।
–ভেঁক ভেঁক।
–ভেউ—উ–উ।
–গ্যাঃ গ গাও!
–গ্যাঁ–আঁ অ্যাঁ।
গোয়ালা কালীপদকে চুপিচুপি বলে,–ব্যাপারটা কী ভাই কালীপদ?
কালীপদ মুচকি হেসে বলে,–গরগরর! ঘেউ!
গোয়ালা বেচারা ঘাবড়ে যায়। বাইরে ব্যাপারটা রটায় সে। তাই সরমার গেটে কৌতূহলী লোকেরা ভিড় জমায়। বিরক্ত ভবভূতি তাড়া করে বলেন,–ঘরররর ঘেঁউ ঘেঁউ। ঘ্যাঁ।
লোকেরা ভাবে নির্ঘাৎ পাগল এই ভদ্রলোক। তারা হো-হো করে হাসে এবং ভেংচি কেটে কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ করতে থাকে। তখন ভবভূতি বন্দুক বের করেন। তারা পালিয়ে যায়।
এই খবর গিয়েছিল গজপতির কাছে। শুনে গজপতি তো ভাবনায় পড়ে গেলেন। হাজার হলেও তার ছেলেবেলার বন্ধু ভবভূতি। বুড়ো বয়সে হঠাৎ পাগল হয়ে যাওয়াটা মোটেও কাজের কথা নয়।
বুদ্ধি খাঁটিয়ে একদিন গজপতি এক সর্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে নিয়ে ঘুঘুডাঙায় হাজির হলেন। ইনি কুকুর সম্পর্কেও জ্ঞানী। হন্ডুরাসে তিনবছর কুকুরবিদ্যা শিখে এসেছেন।
সরমার গেটে গিয়ে ডাকলেন,-ভব! ভবী! ভবী! আছে নাকি ভায়া?
ভবভূতি কিন্তু গজপতির জন্যে মনে-মনে ছটফট করছেন। আহা, কত কালের বন্ধুত্ব। তার ওপর এমন শান ভাষায় তাঁর কৃতিত্ব গজপতির কাছে জহির না করলে কি চলে?
গজপতির ওপর সব রাগ ভুলে হাসিমুখে গেটে গিয়ে সম্ভাষণ করলেন, গররর গরর।
গজপতি ডাক্তারবাবুকে চিমটি কেটে দিলেন। অর্থাৎ দেখছেন এবং শুনছেন তো? ডাক্তার মুচকি হেসে ফিসফিস করে বললেন,–এই রোগের নাম কুকুরামি। দেখেছি হন্ডুরাসে অনেকেরই আছে।
গজপতিকে গেট খুলে ভবভূতি ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন–গঁঃ গঁঃ। ডাক্তারবাবু জবাব দিলেন,–ঘঁ-গ-অ-অ। ঘ্যাঁ!
গজপতি অবাক। আরও অবাক হলেন ঘরে গিয়ে। ডাক্তার ভদ্রলোকও ভবভূতির মতো পাগল হয়ে গেলেন নাকি?
ভবভূতি আর ডাক্তার কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ গরগর করে যাচ্ছেন সমানে। সেই সময় কালীপদ চা নিয়ে এসে বলল,-ভৌ ভৌ ভঃ।
গজপতির এতক্ষণে রাগ হল। আর রাগের চোটে ভেংচি কেটে বলে উঠলেন,-ভৌ ভৌ ভ্যাও।
অমনি কালীপদ তার পায়ের ধুলো নিল। আর ভবভূতি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একগাল হেসে বলে উঠলেন,–ঘঁরররর গরররর গঁঃ।
এবার অসহ্য লাগল গজপতির। বললেন কী ব্যাপার বলো তো ভায়া ভব? তোমরা সবাই কুকুরের মতো ঘেউ-ঘেউ করছ কেন?
ভবভূতি মুচকি হেসে তার খেরোর খাতাটি সামনে খুলে ধরলেন।
চোখ বুলিয়ে গজপতি সব টের পেলেন এতক্ষণে। একের পর এক পাতা উল্টে গোটাটা দেখে নিলেন। তারপর হাসিমুখে ভবভূতির দিকে তাকিয়ে বললেন, ঘউউ! ঘঁ!
গজপতির সঙ্গে ভবভূতির আবার ভাব হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে গজপতি প্রায়ই সরমাতে বন্ধুর কাছে এক-এক বেলা কাটিয়ে যান এবং শান ভাষায় কথাবার্তা বলেন। আর সেই কুকুর বিশেষজ্ঞ ভদ্রলোকের নাম ডাঃ লম্বোদয় হোড়। সংক্ষেপে ডাঃ এল হাউর। তাঁকে মোটা মাইনেতে বহাল করেছেন ভবভূতি। কুকুরগুলোর মাথাধরা, কান কটকট, পেটফাঁপা চিকিৎসা করতেন ভবভূতি। এখন ডাঃ হাউর তা করেন। উনি হন্ডুরাসী পদ্ধতিতেই চিকিৎসাটা করেন। তারই পরামর্শে কুকুর বাহিনীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তারা খাঁচায় এতদিন বাস করে অভ্যস্ত হয়েছে। তাই বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে চায় না। খাঁচায় গিয়ে ঢোকে। বাইরে যতক্ষণ থাকে, চুপচাপ উদাস চোখে শুধু আকাশ দেখে আর হাই তোলে। এতে একটা দারুণ রকমের কাজ হয়েছে। লোকেরা এই বাড়িটা পাগলাগারদ ভেবে পাগল দেখবার জন্যে ইদানীং গেটের পাশে উঁকিঝুঁকি মারত। এখন বাড়ির ত্রিসীমানায় এলেই সতেরটা কুকুর নিজ-নিজ কণ্ঠস্বরে গর্জন করে ওঠে। আর গ্ৰেহাউন্ড কী সাংঘাতিক কুকুর, সবাই জানে।
আর কেউ বাড়ির আনাচে-কানাচে আসতে সাহস পায় না। বিকেলে দেখা যায় ভবভূতি আর ডাঃ হাউর সতেরোটা দেশি-বিদেশি কুকুর নিয়ে বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণে বেরিয়েছেন এবং কুকুরগুলোকে হা-ডু-ডু খেলা শেখাচ্ছেন। বিদেশি কুকুরগুলো দিব্যি হা-ডু-ডু হাঁকতে পারে। কিন্তু দিশি-বাঘা-নেড়ি-ঘেঁকিরা ওই ইংরিজি বলতেই পারে না। তারা দিশি ভাষাতেই বলে–চু কিট কিট কিট।…
সূর্য ডুবে যায় গাছপালার আড়ালে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা আসে। তখন ডাঃ হাউর কুকুরদের নিয়ে কুকুরশালায় ঢোকেন। আর ভবভূতি চুপচাপ পায়চারি করেন কতক্ষণ। চারদিকে নিঝুম। মনে কত কী আশা জেগে ওঠে। এবার নোবেল প্রাইজ ঠেকায় কে?
