বলে সে কুকুরশালার দরজার দিকে দৌড়ল। ভবভূতিও তার সঙ্গে দৌড়েছেন।
গিয়ে দেখেন, ব্রহ্মদৈত্য নরহরির কাঁধ আঁকড়ে ধরেছেন, আর নরহরি হাঁড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। টানাটানিতে তাকে নাড়ানো যাচ্ছে না। ভবভূতি দেখেশুনে গম্ভীর হয়ে বললেন, রসগোল্লা নাকি?
–হ্যাঁ। পাক্কা তিন কিলো মাল। ব্যাটা সব সাবাড় করে ফেললে দেখছ না? এ যে আস্ত রাক্ষস!
বেশ করেছে। ভবভূতি রেগে বললেন।
ব্রহ্মদৈত্য বলল, ইয়ার্কি? ওর জন্যে এনেছিলুম নাকি?
ভবভূতি গর্জে উঠলেন,–তোমার নামে মামলা করব! তুমি আমার কুকুরগুলোকে রসগোল্লা খাইয়ে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলেছ। সকাল হতে দাও। দেখাচ্ছি মজা। সটান ঘুঘুডাঙা আদালতে গিয়ে তোমার নামে মামলা করব।
ব্ৰহ্মদৈত্য হাসল,–হুঁ! আমাকে মামলার ভয় দেখাচ্ছ। আমি চল্লিশ বছর ওকালতি করেছি জানো না বুঝি?
হ্যাঁ, তাও বটে। ভবভূতি ভড়কে গেলেন। বললেন,–তাই বলো, তো এই বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি করতে তোমার লজ্জা হল না? ছিঃ!
কীসের লজ্জা? ব্ৰহ্মদৈত্য অর্থাৎ সাক্ষাৎ স্বয়ং গজপতি বাঁকা হেসে বললেন। তুমি যে ব্রহ্মদৈত্য মানে না। এবার মানলে তো?
ভবভূতি পাল্টা বাঁকা হেসে বললেন, , মানলুম। তবে যাও, এখন চান করে গায়ের কালো কালিগুলো ধুয়ে এসো। নইলে তোমায় বিছানায় শুতে দেব ভেবেছ? ছা-ছা!
নরহরি ঠাকুর হাঁড়ি শেষ করে এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আসুন গো। টিউবেল থেকে জল টিপে দিই। চান করবেন। আমারও তেষ্টা পেয়েছে।…
এই ঘটনায় দুটো ফল হল। এক : নরহরি গোপনে গজপতির চক্রান্তে যোগ দিয়েছিল এবং কুকুরশালার চাবিও চুরি করে ওকে দিয়েছিল বলে তার এখানকার চাকরি গেল। সে অবশ্য গজপতির বাড়ি ফের চাকরি পেল। তাই কথা ছিল গজপতির সঙ্গে।
দুই : ভবভূতিকে কুকুরগুলোর জন্যে দৈনিক তিন কিলো করে রসগোল্লার ব্যবস্থা করতে হল। রসগোল্লার মজা ওরা পেয়ে গেছে। একদিন না পেলে ভবভূতির বিরুদ্ধে সেদিনের মতো প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখায়।
ভবভূতি নতুন লোক বহাল করেছেন। তার নাম কালীপদ। ডাক নাম কালো। বছর বিশ-বাইশ বয়সের এক ছোকরা। ভারি অমায়িক এবং বিশ্বাসী। তাকে কুকুরগুলো বেশ পছন্দ করে ফেলেছে। এটা ভবভূতির বাড়তি লাভ বলা যায়।
আর গজপতির সঙ্গে সম্পর্ক? এবার চিড় খেয়েছে সত্যিসত্যি। গজপতির সঙ্গে রীতিমতো ঝগড়া হয়ে গেছে ভবভূতির। ব্ৰহ্মদৈত্য আছে তা প্রমাণের জন্যে যে এমন কাণ্ড করতে পারে, সে কি মানুষ? সে নিজেই ভূত। অতএব ভূতে-মানুষে কি বন্ধুত্ব হয়? কিংবা হয়ে গেলেও তা বেশিদিন টেকে?
ভবভূতি মন দিয়ে কুকুরের ভাষা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। গজপতিকে মন থেকে একেবারে মুছেই ফেলেন।
কিন্তু মাঝে-মাঝে হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা-বেলগাছে যদি গজপতির বদলে সে রাতে সত্যি সত্যি ব্রহ্মদৈত্যকেই দেখতে পেতেন, তাহলে কী ঘটত? একটু শিরশির করে শরীর। বিশেষ করে কোনও-কোনও রাতে লনে পায়চারি করতে করতে বেলগাছটার দিকে তাকালে যেন মনে হয় কেউ ওর মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে আছে। বাগে পেলেই ঘাড় মটকাবে। তখন ভবভূতি বন্দুকটা নিয়ে এসে খামোকা আকাশে একটা গুলি ছোড়েন। সেই আওয়াজে ভয় পেয়ে বেলগাছের পেঁচাটা চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে উড়ে পালায়।
ততদিনে কুকুরের ভাষা নিয়ে গবেষণায় অনেকটা এগিয়েছেন ভবভূতি। ইয়া মোটা লাল কাপড়ে বাঁধানো খেরোর খাতায় কুকুরের ডাকগুলো টুকেছেন এবং তার পাশে বাংলা অনুবাদও করে ফেলেছেন।
এমনকী ওদের সঙ্গে ইদানীং ওদের ভাষাতেই কথা বলার চেষ্টা করছেন।
অ্যালসেশিয়ানের খাঁচার সামনে গিয়ে বলেন,–গররর গঁঃ। অর্থাৎ কেমন আছো হে?
সে জবাব দেয়,–গর গরররর গা। ভালোই আছি। তবে খাঁচায় আটকে থাকাটা ভালো মনে হচ্ছে না।
ভবভূতি একটু হেসে বলেন,-ঘঃ ঘঃ। ঠিক আছে। শিগগির ছেড়ে দেব।
টেরিয়ার দুটো তাকে দেখে বলে–ঘেঃ ঘেঃ। ছেড়ে দাও না ব্রাদার!
ভবভূতি বললেন,–ঘঁঃ। সবুর, সবুর। দেব বইকী।
গ্ৰেহাউন্ড ভারি রাগী। বলে—খ্যাঁ খ্যাঁ খ্যাঁঃ খুঁঃ। ছেড়ে দাও, নয়তো ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।
ভবভূতি বলেন,–ছু চুঃ। সোনা ছেলে, লক্ষ্মীছেলে। রাগ করে না।
দিশি কুকুর বাঘা, খেকি এবং নেড়ি তাঁকে দেখে চ্যাঁচিমেচি করে বলে, ভৌ ভৌ ভেউ ভু-উ-উ-উ। কেন আটকে রেখেছ। আমাদের কষ্ট হচ্ছে না বুঝি?
ভবভূতি জবাব দেন,–ঘেউ ঘেউ ঘেক ঘেক ঘুঃ? বেশি চেঁচিও না তো বাপু! সময় হলেই ছাড়ব।
নতুন রাঁধুনিকাম-চাকর কালীপদ ব্যাপার-স্যাপার দেখে হতভম্ব। আজকাল কর্তাবাবু আপনমনে ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন আর কুকুরের মতো ডাকেন। মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে না তো?
সেদিন কালীপদ গেছে চা নিয়ে। ভবভূতি বই পড়তে-পড়তে বললেন,–গেঃ গেঃ! ঘেউ-উ-উ-উ!
কালীপদ হতভম্ব হয়ে বলেন, কী বলছেন স্যার?
ভবভূতি একটু হেসে বললেন,-তাইত! তুমি এ ভাষা জানো না বটে। শোন কালীপদ, আমি কুকুরের ভাষায় দিব্যি কথা বলতে পারি। একটা বই লিখব ভাবছি। ওটা পড়লে সবাই এ ভাষা শিখে নেবে। তা শোনো, তুমি বরং আমার কাছে রোজ এ ভাষাটা শিখতে থাকে। বেশি কথা খরচ করতে হবে না। একটুও ক্লান্ত হবে না কথা বলতে। কত সহজে একটা শব্দে অনেক বেশি কথা বলা যায় জানো?
কালীপদ ছেলেটি ভারি সরল। বলল, তাহলে আজই শেখাতে শুরু করুন স্যার।
