খুশি হয়ে ভবভূতি বললেন,–একখানা মোটা লাঠি জোগাড় করে রাখো। আর একটা বস্তায় পাটকেল রাখো। টিকি আর টাক কাড়তে গিয়ে মামলায় পড়বে হে! গবুউকিল তাক করে বসে আছে ওদিকে।
ওদিকে কুকুরগুলো উপোস করছে। করুক। ভবভূতি রাতের খাওয়া শেষ করে নরহরিকে সঙ্গে নিয়ে চুপিচুপি ওপাশের দরজায় বের হলেন। জ্যোৎস্না রাত। সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেলগাছটার একটু তফাতে একটা জঙ্গল হয়ে যাওয়া জবাগাছের আড়ালে দুজনে ওৎ পেতে বসে রইলেন। সঙ্গে একটা বন্দুকও নিয়েছেন। লাঠি আর পাটকেলের বস্তাও আছে।
বসে আছেন তো আছেন। সব নিস্তব্ধ। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে পশ্চিমের রেলইয়ার্ড থেকে রেলগাড়ির শব্দ কিংবা হুইসেল শোনা যাচ্ছে। আবার সব চুপ। হেমন্তকাল। শিশিরে ঘাস-গাছপালা ভিজে জবজব করছে। হাল্কা কুয়াশা জমেছে গাছপালায়। কিছুক্ষণ পরে বেলগাছ থেকে একটা পেঁচা ডাকলাও! ক্রাও! ক্রাও!
তারপর মনে হল বেলগাছটায় হঠাৎ ঘূর্ণি হাওয়া এসেছে। শনশন করে ডালপালা নড়ছে। তারপরই ভবভূতি দেখতে পেলেন, ঠিক মগডালে কালে প্রকাণ্ড একটা মানুষের মতো কে উঠে দাঁড়াল এবং ঈদের দিকে তাকিয়ে যেন হাই তুলে বারতিনেক বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর সাহায্যে তুড়ি দিল।
তারপর হেঁড়ে এবং চাপাগলায় সেই মূর্তিটা বলে উঠল, হরি হে দীনবন্ধু। পার করো হে ভবসিন্ধু।…তারা! ব্রহ্মময়ী মা গো! জগদম্বা বলো মন হে! জগদম্বা বলো!
নিজের চোখ কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না ভবভূতি। তাঁর পিছনে বসে নরহরি ঠকঠক করে কাঁপছে। তাকে চিমটি কেটে সাবধান করে দিলেন এবার।
একটু পরে মূর্তিটা গাছের ডগা থেকে লাফ দিয়ে নামল। মাটি কেঁপে উঠল যেন। জ্যোৎস্নায় এলে স্পষ্ট দেখা গেল, তার পরনে কেঁচা করে পরা খাটো ধুতি, খালি গা, বুকে পৈতে রয়েছে। মাথার চুল ছোট করে কাটা। একটা প্রকাণ্ড টিকি আছে।
হ্যাঁ, খড়মের শব্দ হচ্ছে। খট খট খট খট! ভবভূতি দেখলেন, সে তাঁদের দিকেই এগিয়ে আসছে। শিউরে উঠলেন। কিন্তু তিনি এক সময়কার শিকারি মানুষ। এমনিভাবে বন্দুক হাতে কতবার গহন অরণ্যে বাঘের এলাকায় রাত কাটিয়েছেন। এ কিছু নতুন ব্যাপার নয় তার কাছে। দেখা যাক।
অবশ্য এবার বাঘ নয়, ব্রহ্মদৈত্য এই যা।
ব্রহ্মদৈত্যকে কাছে থেকে ভালো করে দেখবেন বলে চুপচাপ বসে আছেন ভবভূতি। নরহরির সাড়া নেই। চোখ বুজে ফেলেছে। নাকি ভিরমি গেল, ভবভূতির ঘুরে দেখার সময় নেই।
ব্ৰহ্মদৈত্য এসে ভবভূতির মাথার ওপর জবাগাছ থেকে টুপ করে একটা জবাফুল পেড়ে নিল। নিয়ে টিকিতে বোঁটাটা গিট দিয়ে বাঁধল। কী বোটকা গন্ধ। ভবভূতির অসহ্য লাগল। নাকে আঙুল ঢুকিয়ে দিলেন। আর এতক্ষণে দেখলেন, ব্রহ্মদৈত্যের হাতে একটা হাঁড়ি রয়েছে। তারপর দেখলেন ব্রহ্মদৈত্য তাঁর কুকুরশালার দিকেই চলেছে। খড়মের শব্দ হচ্ছে খট খট খটাং! হাঁড়িতে কী থাকতে পারে? তাছাড়া ও ঘরে ঢুকবেই-বা কীভাবে? ভেবেই পেলেন না ভবভূতি।
কুকুরশালার বাইরে দরজার কাছে গিয়ে ব্রহ্মদৈত্য হেঁড়ে গলায় ফের বলে উঠল,–হরি হে দীনবন্ধু! পার করো হে ভবসিন্ধু।…তারা। তারা! ব্রহ্মময়ী মা গো!… জগদম্বা বলো মন হে, জগদম্বা বলো!
তারপর যেন তিনবার তুড়ি দিল সে। অমনি অবাক কাণ্ড! দরজা খুলে গেল। তখন ব্রহ্মদৈত্য হাঁড়িটা উঁচু করে ধরে যেই ঢুকতে যাচ্ছে, ভবভূতি আর সহ্য করতে পারলেন না। গর্জে উঠলেন, খবরদার!
সঙ্গে সঙ্গে আকাশমুখো বন্দুক তুলে ছুড়লেন। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, নরহরি! ঠিল ছোড়ো! লাঠি চার্জ করো! এক হাতে ঢিল, অন্য হাত লাঠি।
ঘুরে দেখেন, কোথায় নরহরি? কেউ নেই পিছনে। পাটকেলের বস্তা আর লাঠিটা পড়ে আছে। রাগে ভবভূতি বস্তাটা কাঁধে ঝুলিয়ে এবং লাঠি ও বন্দুক বগলদাবা করে উঠে দাঁড়ালেন।
এই অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে ফঁকায় দাঁড়ালেন। ওদিকে ব্রহ্মদৈত্য তখন দরজা থেকে কেটে পড়েছে। খড়ম পায়ে দৌড়ে আবার বেলগাছটার দিকে তাকে যেতে দেখলেন ভবভূতি।
একলাফে বেলগাছে উঠে পড়েছে ব্রহ্মদৈত্য।
ভবভূতি বস্তা নামিয়ে গাছের দিকে পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলেন। সেই সঙ্গে গর্জাতে থাকলেন,–গেট ডাউন! গেট ডাউন রাস্কেল! নেমে এসো বলছি!
বস্তার পাটকেল শেষ হয়ে আসছে, এমন সময় গাছ থেকে ব্রহ্মদৈত্য করুণ স্বরে বলে উঠল, ভব! ভবী! ভবী! ভবু! আর ঢিল ছুড়ো না ভাই! মাইরি, মরে যাব!
ভবভূতি চমকে উঠলেন।
গলাটা এতক্ষণে চেনা মনে হচ্ছে। দৌড়ে গাছতলায় গিয়ে বললেন,–কে? কে তুমি?
আবার করুণস্বরে জবাব এল-আমি, আমি। উ হু হু হু! গেছিরে বাবা।
কে আমি? নেমে এসো বলছি! নইলে এবার লাঠিপেটা করব! বলে ভবভূতি সেই ইয়া মোটা লাঠিটা বাগিয়ে ধরল!
ব্রহ্মদৈত্য কান্নার সুরে বলল, নামতে পারছি না। তোমার ঢিল লেগে হাঁটুর বাতটা হঠাৎ চাগিয়ে উঠেছে! উঁহু হু হু!
এতক্ষণে ভবভূতির সংশয় ঘুচল। লাঠি ও বন্দুক মাটিতে রেখে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে হো-হো, করে হেসে বললেন,-রোসো৷ হাত বাড়াও। ধরে নামাচ্ছি।
ব্রহ্মদৈত্য গুঁড়ির ওপরে বসে আছে। হাত বাড়িয়ে দিল। ভবভূতি তার হাত ধরে সাবধানে নামতে সাহায্য করলেন।
নেমেই ব্রহ্মদৈত্য হাঁটুর ব্যথা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল, এই সেরেছে। হাঁড়িটা পড়ে আছে যে! সর্বনাশ! নির্ঘাৎ ব্যাটা এতক্ষণে অর্ধেক সাবাড় করেছে।
