কদিনের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার ডেকে এনে ওই ঘরটা সাউন্ড প্রুফ করে নিয়েছেন। তার ফলে যতই চাচামেচি করুক, বাইরে থেকে একটুও শোনা যাবে না।
মোট সতেরোটা কুকুরের জন্যে সতেরেটা কাঠের খাঁচাঘর আছে। সামনে লোহার গরাদ। চিড়িয়াখানায় যেমন বাঘের খাঁচা দেখা যায়, ঠিক তেমনি।
দেখাশোনা, খাওয়ানো, স্নান করানো–সবকিছুর ভার ভবভূতি নিজে নিয়েছেন। নরহরি কুকুর দেখলেই উল্টোদিকে দৌড়ায়। তাই পারতপক্ষে এ ঘরে ঢোকে না। ভবভূতি একটা প্রকাণ্ড নোটবইতে দুবেলা কুকুরগুলোর হাবভাব টুকে রাখনে। টেপ রেকর্ডারে টেপ চালিয়ে শোনেন! গম্ভীর মুখে ভাবনা-চিন্তা করেন। লেখেন। রীতিমতো গবেষণা কিনা!
বেশ চলছিল এই রকম। রাতে কুকুরশালায় টেপরেকর্ডার চালিয়ে রাখছিলেন এবং সকালে নিয়ে এসে বাজিয়ে শুনছিলেন। নোট করছিলেন কোনও বৈশিষ্ট্য আছে নাকি। জীবজন্তুর ভাষা শেখা তো সহজ কথা নয়। টেপের একটা জায়গা বারবার বাজিয়ে শুনে তবে না কিছু বোঝা যাবে!
হঠাৎ একদিন সকালে টেপ বাজিয়ে শুনতে-শুনতে ভবভূতি অবাক হলেন।
টেপে সতেরোটা কুকুরের নানান হাঁকডাক অন্যদিন যেমন শোনেন, তেমনি শুনতে পাচ্ছিলেন। তারপর কী একটা ঘটল। আচমকা ওরা চুপ করে গেছে। কোনও ডাক নেই! না ঘড়ঘড়, গরগর, গাঁগো, খ্যাক খ্যাক, ঘেউঘেউ, কিংবা ভ্যাকভ্যাক। হঠাৎ বেড়ালের মতো যেন মিউ গোছের নরম ডাক ডেকেই সবাই থেমে গেছে। গেছে তো গেছেই।
তারপর একটা কেমন শনশন শব্দে হল। তারপর ঘট ঘটাং!
তারপর খট খট, খট খট, খট খট–
শব্দটা ক্রমে ক্ষীণ থেকে জোরালো হয়ে বাজতে থাকল টেপে। তারপর থেমে গেল। কীসের শব্দ হতে পারে?
তারপর চকচক চকাম-কাম-কুকুরগুলো খাওয়ার সময় যেমন শব্দ করে, সেইরকম! বেশ তালে-তালে শব্দগুলো বাজছে। ভোজের আসরে শেষপাতে চাটনির সময় চোখ বুজলে যেমন শোনা যায়। এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! কুকুরগুলোর তো এত রাতে কিছু খাওয়ার কথা নয়! খাবে যে, তা পাবেটা কোথায়?
অথচ শোনা যাচ্ছে, গত রাতে (হিসেব মতো তখন প্রায় বারোটা) ওরা খুব খাচ্ছে। খাচ্ছেটা কী? চাটনি? অসম্ভব। কুকুর তো চাটনি খায় না। চেটেপুটে খায় অবশ্য। কিন্তু চাটবেই বা কী? নিজের নিজের লেজ? মনে হয় না তা। ভবভূতি কুকুরের লেজ চেটে না দেখলেও জানেন, মোটেও সুস্বাদু নয়।
ভবভূতি টেপ বন্ধ করে কুকুরশালায় ঢুকলেন। তাঁকে দেখে কুকুরগুলো কিন্তু অদ্ভুত আচরণ শুরু করল! ঘণ্টাটাক আগে এ ঘরে ঢুকেছেন! খাইয়েছেন। টেপ রেকর্ডারটা তুলে নিয়ে গেছেন। তখন ওরা স্বাভাবিক ছিল। অথচ এখন ওঁকে দেখে প্রত্যেকটা কুকুর গরগর করে উঠেছে। কুকুরের ভাষা এতদিনে যতটা বুঝেছেন, ওদের এই শব্দে রীতিমতো রাগ আছে। সবচেয়ে বেশি আদরের অ্যালসেশিয়ানটার খাঁচার সামনে যেতেই সে দাঁত বের করে কামড়াতে এল। গ্রেউন্ড দুটো শরীর লম্বা করে গাঁ-গাঁ করতে থাকল।
তারপরই প্রত্যেকটি খাঁচায় প্রত্যেকটি কুকুর লাফালাফি জুড়ে দিল। যেন খাঁচা ভেঙে ফেলবে। তাকে পেলে যেন ওরা টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলবে। সে কী হিংস্র হাঁকরানি!
ভবভূতি বিলিতিগুলোকে ইংরিজিতে এবং দেশিগুলোকে বাংলায় তর্জন-গর্জন সহকারে ধমক লাগালেন। একটা লাঠি নিয়ে এসে খুব ঠোকাঠুকি করলেন খাঁচার সামনে। কিন্তু কেউ ভয় পেল না বরং আরও খেপে গেল। ভবভূতির কানে তালা ধরে যাচ্ছিল ওদের চ্যাঁচামেচিতে।
হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন কিছুক্ষণের জন্যে। এমন তো করে না ওরা। ব্যাপার কী?
অসহ্য লাগলে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। খুব রাগ হয়েছে। বেইমান নেমকহারাম! এত যত্ন করে রাখা হয়েছে। রোজ কাড়িকাড়ি দুধ, মাংস এইসব খাওয়ানো হচ্ছে। আর তার বদলে এই ব্যবহার!
রোস, আজ সারাদিন খাওয়া বন্ধ।
নিজের ঘরে ফিরে আবার টেপ বাজিয়ে রাতের রেকর্ড হওয়া শব্দগুলো শুনতে থাকলেন ভবভূতি। এই খট খট খট খট শব্দটা কীসের হতে পারে?
হঠাৎ চমকে উঠলেন। তাহলে কি ওটা খড়মের শব্দ? অর্থাৎ বেলগাছের ব্রহ্মদৈত্য?
তাহলে কি সত্যি ব্রহ্মদৈত্য বলে কিছু আছে? এবং সেই ব্রহ্মদৈত্যই কি কুকুরগুলোকে রাতে কিছু খাইয়ে বশ করে ফেলেছে এবং তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে?
অথচ সকালে যখন দুধ-পাঁউরুটি খাওয়াতে গেলেন, তখন ওরা শান্তভাবে ছিল। এর মানে কী?
ভবভূতির মনে হল, নেহাত খাবার লোভে তখন জন্তুগুলো তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। নেমকহারাম লোভী স্বার্থপর।
ভবভূতি যত ভাবলেন ব্যাপারটা, বিচলিত বোধ করলেন। ঠিক আছে, আজ রাতে তিনি জেগে থেকে পাহারা দেবেন। নরহরিকে সঙ্গে নেবেন। এ রহস্যের ফর্দাফাই না করলেই চলে না।
নরহরিকে ডেকে সব খুলে বললে তার মুখ যেন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাকে ওই বেলগাছের ব্যাপারটা এতদিন বলেননি। এটাকে যে হানাবাড়ি বলত লোকে, তাও জানে না সে। কেমন করে জানবে? সে বাঁকুড়ার লোক। ভবভূতির জামাই তাকে শ্বশুরের জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জামাই ওখানে রোডস দফতরের ইঞ্জিনিয়ার। শশুরমশায়ের নানান উদ্ভট বাতিকের কথা জানেন তিনি। কেমন লোক পছন্দ হবে তাও জানেন। ভবভূতির কোনও কথায় না করবে না এবং কোনও ব্যাপারে অবাক হবে না–এমন লোক চাই। সেদিক থেকে নরহরি উৎকৃষ্ট। সবেতেই মুণ্ডু কাত করে বলে, ইয়েস স্যার!
কর্তাবাবুর কথার বিরুদ্ধে অন্য কথা বলার জো নেই। সে মুখে সায় দিল। বরং জাঁক দেখিয়ে বলল,–বেহ্মদত্যির টিকি আর টাক দুই-ই কেড়ে নেব স্যার।
