দুই নম্বর কারণ, ভবভূতি ভূত বিশ্বাস করেন না। গজপতির কাছে প্রমাণ করতে চাইছিলেন, ভূত বলতে কি নেই। সুতরাং গজপতি মিথ্যুক।
তিন নম্বর কারণ, ভবভূতির কুকুর নিয়ে নিরিবিলি গবেষণা!
বাড়িটার মালিক ব্রিলোচন থাকে হাজারিবাগে। ভবভূতির তর সইছিল না। গজপতিকে বলে টেলিগ্রাম করিয়ে তাকে কলকাতায় আনালেন এবং রাতারাতি বাড়িটা কিনে ফেললেন! সস্তায় কিনলেন বলা যায়। ত্রিলোচন যা পেল, তাই লাভ। ঘুঘুডাঙা রেল ইয়ার্ডের ওদিকে কোন ভদ্রলোক গিয়ে বাস করতে চাইবেন? রেল ইয়ার্ডে হরদম ট্রেন, মালগাড়ি আর ইঞ্জিনের বিকট বাজখাই ভঁাচামেচি, তার ওপর ভূত ওরফে ব্রহ্মদৈত্যর গুজব। তবে হ্যাঁ, কারখানার জন্যে কেউ কিনতেও পারতেন। কিন্তু ত্রিলোচনের কাকিমা মাধুরীদেবী নাকি বলে গিয়েছিলেন, কলকারখানা হলে উনি অর্থাৎ ব্রহ্মদৈত্য-মশাই রিফিউজি হয়ে যাবেন। খবরদার বাবা তিলু, এই কম্মটি কোরো না! ওতে পাপ তো হবেই, তার ওপর উনি রেগে গিয়ে তোমাদের পিছনে লাগবেন।
তিলু বা ত্রিলোচন গজপতির মতো ভূতপ্রেতে বিশ্বাসী। এছাড়া সে ছেলেপুলে নিয়ে ঘরসংসার করে। ব্রহ্মদৈত্য-মশাইয়ের চেহারার যা বর্ণনা শুনেছে সে, তাতে তার হাজারিবাগে ছোট্ট বাড়িটার ওপর তিনি গিয়ে একখানা পা রাখলেই পৌরাণিক গল্পের সেই তিনপেয়ে বামনাবতারের বলিরাজার মাথায় পা চাপানোর ব্যাপারটাই ঘটে যাবে। অর্থাৎ চিড়েচ্যাপটা যাকে বলে।
যাই হোক, বাড়ি তো কিনে ফেললেন ভবভূতি। খুব পছন্দসই বাড়ি। কতকটা সেকালের কুঠিবাড়ির গড়ন। একতলা এবং উঁচু ছাদ। সাত-আট পাশাপাশি ঘর আছে। তার সঙ্গেই স্নানঘর, রান্নাঘর ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। বাড়ির চারদিকে লম্বা-চওড়া প্রচুর জায়গা। গাছপালা আছে। ঝোঁপঝাড় গজিয়ে জঙ্গল হয়ে আছে। চারদিকের পাঁচিল যথেষ্ট উঁচু। একদিকে মস্ত গেট, অন্যদিকে খিড়কির দরজা। গেটের সামনে খোয়াঢাকা অনেককালের অব্যবহৃত রাস্তা আছে একফালি। সেটা গিয়ে মিশেছে রেল ইয়ার্ডের কাছে চওড়া রাস্তার সঙ্গে। সেইদিকে একটু এগোলে ঘুঘুডাঙা রেলস্টেশন।
বিশাল উঠোনর কোনায় পাঁচিল ঘেঁষে সেই প্রকাণ্ড বেলগাছটা দেখতে পেলেন ভবভূতি। আনন্দে নেচে উঠলেন।
না, ব্রহ্মদৈত্যের জন্যে নয়। গাছটা ইয়া মোটা, বেলে ভর্তি। ভবভূতি বেলের সরবত পেলে আর কিছু খেতে চান না। একগাল হেসে গজপতিকে বললেন,–গজু, প্রতিদিন বেলের সরবতের নেমন্তন্ন রইল। এলেই পাবে।
গজপতি মুখে হ্যাঁ বললেন বটে, কিন্তু মনে-মনে বললেন–
–মাথা খারাপ? বেলের সরবতের জন্যে রোজ ট্রেনে চেপে ব্রহ্মদৈত্যর আখড়ায় আসব? আমি তো ভবুর মতো পাগল নই। ওই বেলে হাত দিলে ব্ৰহ্মদৈত্য মশাই খড়মপেটা করবে না?
ভবভূতিকে গৃহস্থ করতে এসেছিলেন সেই প্রথমদিন। তারপর আর তিনি আসেননি। তবে দৈনিক একটা করে চিঠি লেখেন। লিখেই আশা করেন, এ চিঠির জবাব ভবভূতির বদলে তার রাঁধুনিকাম-চাকর নরহরিই লিখবে। বড় দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি কর্তাবাবু গতরাতে বেলতলায় পটল তুলেছেন। অর্থাৎ ব্রহ্মদৈত্য তাঁর ঘাড়টি মটকে দিয়েছে।
কিন্তু কোথায় কী? দিব্যি ভবভূতিরই জবাব আসে। নিজের হাতে লেখা। প্রিয় গজু, তুমি কি সম্প্রতি ন্যাড়া হইয়াছ? নতুবা আসিতেছ না কেন? প্রচুর বেল পাকিয়াছে। তোমার ব্রহ্মদৈত্য ভদ্রলোকটি বেজায় ভদ্র। তাঁহার সঙ্গে ভাব জমিয়াছে। তিনি ন্যাড়া বলিয়াই কদাচ বেলতলায় অবতরণ করেন না। মগডালে বসিয়া পাকা লে পাড়িয়া দেন। আমি লম্বা বাঁশের ডগায় বাঁধিয়া অ্যালুমিনিয়ামের জগভর্তি সরবত পাঠাই। তিনি সরবত পান করিয়া জগটি নামাইয়া দেন। হা–গতকাল লিখিতে ভুলিয়াছি, তিনি তোমার কথা জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন। বলিলেন, আহা! বালকটিকে দেখিলে বড় আনন্দ পাইতাম। …
এই চিঠি পেয়ে গজপতি রেগে লাল,–চালাকি? ঠাট্টা করা হয়েছে বালক বলে? আমার বয়স পঁয়ষট্টি হয়ে গেল। আমাকে বালক বলা হচ্ছে? আমার গাল টিপলে দুধ বেরোয়, না আমি এখনও দুধুভাতু খাই যে আমাকে বালক বলেছে?
একটু পরে রাগ পড়ে গেল। না, হয়তো ঠিকই লিখেছে। ব্রহ্মদৈত্য-মশাই আমাকে সেই ছেলেবয়সে দেখেছেন। তাই বালক বলাটা স্বাভাবিক। হয়তো সত্যি সত্যি ভবভূতি ওনার দর্শন পেয়েছে। এবং পেয়ে এতদিনে ভূতপ্রেতে বিশ্বাসও হয়েছে।
তাহলে ভয়ের কথা, ব্রহ্মদৈত্য এখনও মনে রেখেছেন গজপতিকে? ওরে বাবা, এ যে সাংঘাতিক কথা। আজই কালীঘাটে পুজো দিয়ে আসতে হবে। হে মা কালী, যেন বেলগাছিয়াবাসী কালো কুচকুচে, সর্বাঙ্গে লোমওয়ালা এবং খড়ম-পরা ভদ্রলোকটি আমাকে ভুলে যান। ওনার স্মৃতিভ্রংশ করিয়ে দাও মা!
না ভুললেই বিপদ। হয়তো ভবভূতিই তাকে প্ররোচিত করবেন গজপতির বাড়ি আসতে এবং তিনি নিছক স্নেহ-প্রদর্শনেই খড়ম পায়ে খটখট করে রাতদুপুরে হাজির হয়ে হেঁড়ে গলায় ডেকে বলবেন,–জু! কেমন আঁছিস বাবা?
গজপতি আঁতকে উঠে তক্ষুনি কালীঘাট ছোটেন—
ওদিকে ভবভূতি চমৎকার কাটাচ্ছেন ঘুঘুডাঙার বাড়িতে।
বাড়ির নাম দিয়েছেন–সরমা। ঋগ্বেদের সেই কুকুর জননী সরমা। তলায় ব্র্যাকেটে ইংরেজিতে লেখা আছে :
দি ডগ রিসার্চ সেন্টার।
পূর্ব দক্ষিণের একটা ঘরে থাকেন ভবভূতি। তার পাশের ঘরে নরহরি ঠাকুর। তার ওপাশে রান্নাঘর। উত্তর পশ্চিমের মস্ত ঘরে রেখেছে পাঁচটা অ্যালসেশিয়ান, দুটো গ্ৰেহাউন্ড, তিনটে টেরিয়ার, আর সাতটা দিশি কুত্ত। এই সাতটা দিশি কুত্তার মধ্যে দুটো বাঘা, দুটো খেকি আর বাকি তিনটে নেড়ি। রীতিমতো আন্তর্জাতিক বাহিনী।
