মাধুরী?–বলে গজপতি চোখ কটমট করে তাকান। মাধুরী বলছ?
গজপতিকে অমন করে তাকাতে দেখে ভবভূতি বাকা হেসে বলেন, আলবাত মাধুরী।
গজপতি বলেন,–মাধুরীকে তুমি চেনো?
ভবভূতি অবাক, কী কথায় কী বলেন তার মানে?
–মাধুরী ছিলেন আমার পিসতুতো দিদি। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ঘুঘুডাঙায়! জামাইবাবু ছিলেন রেলের গার্ড। অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তারপর
কিস্যু বুঝলাম না। ভবভূতি বাধা দিয়ে বলেন।
বিরক্ত গজপতি বলেন, কথা শেষ করতে দেবে তো? খালি তক্ক আর তক্ক। ঘুঘুডাঙা রেল ইয়ার্ডের ওদিকে এক একর জায়গায় একটা বাড়ি ছিল জামাইবাবুর। পৈতৃক বাড়ি। ওর মৃত্যুর পর সেই বিশাল বাড়িতে একা মাধুরীদিদি থাকতেন।
ভবভূতি খিকখিক করে বলেন আর থাকতেন তোমার জামাইবাবু, অর্থাৎ ভূত।
গজপতি রীতিমতো গর্জন করে বলেন, না ব্রহ্মদৈত্য।
ব্রহ্মদৈত্য! ভবভূতি তাজ্জব হয়ে যান।
–হ্যাঁ। উঠোনের কোনায় একটা বেলগাছ। সেই গাছ থেকে সে মাঝে-মাঝে রাতদুপুরে প্রায়ই উঠোনে পায়চারি করতে নামত। মাধুরীদি জেগে থাকলে বলতেন,–কী গো! গরম লাগছে বুঝি? ব্রহ্মদৈত্য বলত, না গো! আজ সন্ধেবেলা একটা ভোজ ছিল। খাওয়াটা বেজায় রকমের হয়ে গেছে। তাই হজম করার তালে আছি। তো তখন মাদুরীদিদি জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে হজমের গুলি দিতে ডাকছেন, নাও গো! টুক করে গিলে ফেলে এক গেলাস জল খেও। সব হজম হয়ে যাবে। ব্ৰহ্মদৈত্য মস্ত লম্বা কালো হাতখানা জানলা অবধি বাড়িয়ে দিত। হাতে কাড়ি কাড়ি লোম।
ভবভূতি আরও হেসে বলেন, তুমি দেখেছ?
না দেখেছি তো কি বানিয়ে বলছি? গজপতি গম্ভীরমুখে বলেন।-আমার বয়েস বারো-তেরো হবে। ক্লাস এইটে পড়ি। মাধুরীদির ছেলেপুলে ছিল না বলে আমাকে মাঝে-মাঝে নিয়ে যেতেন। খাটে শুয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে ওইসব কাণ্ডকারখানা দেখতুম। বলতুম,–ও কে দিদি, যাকে ইজমি গুলি দিলে? মাধুরীদি বলতেন, চুপ, চুপ। বলতে নেই।
ভবভূতি বলেন,–সে বাড়িটা এখনও নিশ্চয়ই আছে?
–হুঁ আছে। মাধুরীদি অবশ্য বেঁচে নেই।
–বাড়িতে কে থাকে এখন?
এবার গজপতি বাঁকা হেসে বলেন,–যাবে নাকি? বাড়িটা খালি পড়ে আছে। হানাবাড়ি হয়ে গেছে। কতবার বিজ্ঞাপন দেওয়া হল কাগজে। সস্তায় বেচে দিতে চেয়েছিল মাধুরীদির বড় জায়ের ছেলে ত্রিলোচন। সে-ই এখন বাড়ির মালিক। কিন্তু বাড়ির বদনাম শুনে সবাই পিছিয়ে যায়। তাই বাড়িটা তেমনি খালি পড়ে আছে।
ভবভূতি বলেন, বাড়িটা আমি কিনব।
–বলো কী?
–হ্যাঁ। কিছুদিন থেকে আমি নিরিবিলি জায়গায় একটা বাড়ি খুঁজছি। ইচ্ছে আছে, সেখানে একা থাকব এবং কিছু এক্সপেরিমেন্ট করব।
–কীসের এক্সপেরিমেন্ট, শুনি।
ভবভূতি ফের নিজস্ব বাঁকা হাসিটা হেসে বলেন, নিশ্চয় ভূত নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট নয়, কুকুর নিয়ে।
গজপতি প্রায় আকাশ থেকে পড়ার মতো বলেন, কুকুর নিয়ে মানে?
–তোমাকে বলিনি। কিছুদিন থেকে আমি কুকুর নিয়ে একটু-আধটু গবেষণা করছি। আমার গবেষণার বিষয় হচ্ছে, কুকুরের ভাষা। ওদের যে নিজস্ব ভাষা আছে, তাতে কোনও ভুল নেই, সেই ভাষা আমার শেখা চাই-ই।
গজপতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার পর বলেন, তা হঠাৎ এই আজগুবি ব্যাপারটা তোমার মাথায় চাপল কেন শুনি?
ভবভূতি গম্ভীরমুখে বলেন, তুমি তো সারাজীবন খালি আইনের প্রকাণ্ড কেতাব পড়েই কাটালে! আদালত আর জজসায়েব ছাড়া কি বোঝোও না।
কৌতূহলী গজপতি বলেন, আহা, বুঝিয়ে বলল না একটু!
–বললেও বুঝবে কী? তুমি তো ঋগ্বেদ পড়োনি। সরমা ছিলেন কুকুরদের মা। সরমার ছেলেমেয়েদের নাম তাই সারমেয়। দেবতাধিপতি ইন্দ্র সরমাকে দূত করে পাঠিয়েছিলেন–
গজপতি বাধা দিয়ে বলেন, আহা হলটা কী তাতে?
ভবভূতি চটেমটে বলেন,–হল তোমার মাথা আর মুন্ডু! সে যুগে কুকুররাই দূতের কাজ করত বুঝতে পারছ না? তাদের যদি ভাষা না থাকবে তাহলে তাদের দৃত করা হল কেন? তাছাড়া ঋগ্বেদের আরেক জায়গায় আছে, একদল কুকুর কোরাস গাইছে। ভাষা না থাকলে
ফের গজপতি বাধা দিয়ে খিকখিক করে হেসে বলেন, এখন আমাদের পাড়ায় রাতদুপুরে কুকুরেরা কোরাস গায়। বাপস! সে কী কোরাস!
ভবভূতির এবার গর্জনের পালা, তুমি মূর্খ। শাস্ত্রজ্ঞানহীন নিতান্ত ইয়ে। নইলে মহাভারতে মহাপ্রস্থান পর্বে স্বর্গপথে যুধিষ্ঠিরের পেছন-পেছন কুকুর যাওয়ার কারণটাও তুমি বুঝতে! বলো তো, কেন কুকুর পেছন-পেছন যাচ্ছিল?
কুকুর এখনও পেছন-পেছন যায়। সেদিন আমি কিলোটাক পাঠার মাংস কিনে আনছি, একটা কুকুর পিছু ধরেছিল–গজপতি হাসতে-হাসতে বলেন, নিশ্চয় যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে পাঁঠার মাংস ছিল। স্বর্গে তো জীবহত্যা নিষেধ। তাই মর্ত থেকে স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
ভবভূতির পক্ষে এটা অসহ্য। রেগেমেগে বেরিয়ে গেলেন তক্ষুনি। গজপতির পরে হুঁশ হল। তখন বেরিয়ে গিয়ে আদুরে স্বরে ডাকে,–ভবী! ভব! ও ভবা!
কোথায় ভবভূতি! তাঁর মান্ধাতার আমলের খনখনে বিলিতি গাড়ির লেজের ডগাটুকু মোড়ে একবারের জন্যে দেখতে পেলেন গজপতি।
খুব রেগেছে। তা রাগুক–গজপতি মনে-মনে বললেন। একটু পরে জল হয়ে যাবে। দুই বন্ধুর এমন রাগারাগি দৈনিক পাঁচ-সাতবার হয়। আবার মিল হতেও দেরি হয় না!
তবে অন্যবারে রাগ পড়তে ভবভূতির যতটা সময় লাগে, এবার লেগেছিল তারও কম।
এর এক নম্বর কারণ, গজপতির পিসতুতো দিদির সেই হানাবাড়ি কেনার ইচ্ছে।
