ভূতো তক্ষুনি কপালে দুহাত জোড় করে ঠেকিয়ে বলল, রাতবিরেতে ও নাম মনে আনবেন না দাদাবাবু! আবার ঝামেলায় পড়বেন।
খুব হয়েছে যাও! ছোটমামা গম্ভীরমুখে বসে পা দোলাতে থাকলেন।
আমার ঘুম পাচ্ছিল। শুয়ে পড়ব ভাবছি, হঠাৎ ছোটমামা আস্তে ডাকলেন, পুঁটে! দেখি, ছোটমামা মিটিমিটি হাসছেন।
ফিসফিস করে বললেন,–চল, বেড়িয়ে পড়া যাক। গেছোবাবা ধরা কাঁদ পাতব, বুঝলি? সেজন্যই চালাকি করে আমার খাবারটা এ-ঘরে আনিয়ে রাখলুম। ওঠ, দেরি করা ঠিক নয়।
এমন একটা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের লোভ সামলানো কঠিন। চুপিচুপি দুজনে বাগানের দিকের খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লুম। ছোটমামার হাতে তার খাবার থালা। ঝিলের কাছাকাছি গিয়ে বললে,–ফঁদটা বুঝতে পারছিস তো? না পারিস তো কথা নেই। চুপচাপ দেখবি, কী করি!
জ্যোৎস্নাটা এখন আরও ঝলমলে। ঝিলের ধার শিবতলার পর নবাবি আমলের ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ আর ঘন জঙ্গল। গা-ছমছম করছিল। এখানে খানিকটা খোলা ঘাসজমিতে পৌঁছে ছোটমামা দাঁড়ালেন। একটু কাশলেন। তারপর ডাকলেন, গেছোবাবা, আছো নাকি? ও গেছোবাবা!
কিন্তু কোনও সাড়া এল না। ছোটমামা একটু গলা চড়িয়ে বললেন, গেছোবাবা! তখন গড় করিনি তোমায়। তাই সত্যিই পুলিশে ধরেছিল। এবার দর্শন দাও, গড় করি। ও গেছোবাবা তোমার জন্য খাবারদাবার এনেছি! কাম ডাউন গেছোবাবা, কাম ডাউন!
এতক্ষণে গাছপালার ভেতর গাঢ় ছায়ায় ধুপ করে শব্দ হল। তারপর সত্যিই গেছোবাবা চায়পেয়ে প্রাণীর মতো বেরোল। খোলা জায়গায় দু-পেয়ে হয়ে প্রথমে অদ্ভুত হিহি হাসি হাসল। তারপর বলল, খাবার এনেছিস? দে, দে খাই। পরে গড় করিস। ওঃ কতকাল পরে মানুষের খাবার খাচ্ছি রে!
বলেই ছোটমামার হাত থেকে থালাটা কেড়ে নিয়ে খুব শব্দ করে খেতে লাগল। ছোটমামা বললেন,–এবার গড় করি?
–তা করলেও করতে পারিস, না করলেও না পারিস।
ছোটমামা গড় করে বললেন–আচ্ছা গেছোবাবা, তুমিই কি পাঁচু?
–তা বললেও বলতে পারিস, না বললেও পারিস।
–তুমি গাছে বসত করলে কেন পাঁচু-সরি গেছোবাবা?
বন্ধুদারোগার ভয়ে।–গেছোবাবা ফোঁস করে নাকঝাড়ল খেতে-খেতে, পেটের বড় জ্বালা রে, বুঝলি তো?
–বুঝলাম। কিন্তু চুরিচামারি না করে কারও বাড়ি কাজকর্ম করলেই তো–
গেছোবাবা হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল, কাজ দিলে তো করব? একবার পেটের দায়ে একটা বদনাম রটে গেলেই কেলেঙ্কারি না? তার ওপর জেল খাটলে তো কথাই নেই।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। গেছোবাবা থালা চেটেপুটে শেষ করে চার পা হল। ঝিলের ধারে চলে গেল। ছোটমামা আর আমিও তার পিছু পিছু দৌড়ে গেলুম। জল খেয়ে থালা রগড়ে ধুয়ে ঢেকুর তুলে গেছোবাবা বলল,-বেঁচেবতে থাক বাবারা! এই নে তোর থালা, বাড়ি চলে যা। নইলে নতুন দারোগাবাবুর পাল্লায় পড়ে ঝামেলা হবে।
ছোটমামা বললেন,–যাচ্ছি। কিন্তু তুমি তো মানুষ পাঁচু, সরি গেছোবাবা! তুমি এমন হনুমানের মতো দৌড়তে আর গাছে-গাছে বেড়াতে পারে কী করে?
–অভ্যেস রে, অভ্যেস। সার্কাস দেখিসনি? তাছাড়া কথায় বলে, ঠেলায় না পড়লে বেড়াল গাছে চড়ে না। আমি তো মানুষ।
–বুঝলুম। কিন্তু গাছের পাতা খাও কেন?
সেও অভ্যেস। টাউনে ঢুকতে না পেলে কী করব? গাছে-গাছে ঘুরি, গাছের পাতা খাই। বলে গেছোবাবা হাই তুলে উঠে দাঁড়াল। বাবারা তাদের মনে বড় দয়া বাবারা। তোদের ভালো হবে। আমি যাই, বড় ঘুম পাচ্ছে। আহা! কতকাল মানুষের খাবার খাইনি রে! খাওয়ামাত্র ঢুলুনি চেপেছে।
বলে ফের একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে গেছোবাবা চার পা হল। জ্যোস্না পেরিয়ে গাঢ় ছায়ায় সে অদৃশ্য হয়ে গেছে ছোটমামা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, কী বুঝলি?
বললুম, কিছু না।
তুই একটা হাঁদারাম! আয় বাড়ি ফিরি।–বলে ছোটমামা হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে কেন যেন ধরা গলায় ফের বললেন,-বড় হ। তখন সব বুঝবি। তবে বুঝলি পটু, বন্ধুবাবু তখন হয়তো ঠিকই বলছিলেন। চঁদ টাদ বোগাস! কী আছে চাদে? নিরেট পাথর। প্রাণ নেই। বাতাস নেই। শ্মশান।
ঘাড় ঘুড়িয়ে চাঁদটার দিকে একবার তাকালুম। অবিকল গেছোবাবার ভঙ্গিতে বলতে ইচ্ছে করছিল, তা হলেও হতে পারে, না হলেও না হতে পারে…
ঘুঘুডাঙার ব্রহ্মদৈত্য
ভূতের স্বপ্ন তো সবাই দেখে! তাই বলে কি ভূত বিশ্বাস করতে হবে? এই হচ্ছে ভবভূতিবাবুর স্পষ্ট কথা। তিনি যৌবনে দুর্দান্ত শিকারি ছিলেন। বনে জঙ্গলে পোড়ো-বাংলোয় ঘুরেছেন। কোথায় ভূত?
তার বন্ধু গজপতি গোঁ ধরলেন,–আজকাল এই ভিড়-হল্লা-আলো আর যন্তরের ঠেলায় বেচারি ভূতেরা থাকবে কোথায়? তাই মানুষের স্বপ্নে গিয়ে আড্ডা নিয়েছে। গজপতি আরও বলেন, উপায়টা কী? মানুষের হাতে আজকাল কতরকম জব্বর অস্ত্রশস্ত্র। অ্যাটমবোমা, হাইড্রোজেন বোমা, নিউট্রন বোমা। তার ওপর কতরকম সাংঘাতিক ওষুধপত্র বেরিয়েছে। তাই ভূতেরা মানুষের স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গিয়ে নিরাপদে কাটাচ্ছে। স্বপ্নে মানুষ তো একেবারে অসহায় বুঝলে না?
ভবভূতি তা মানতে রাজি নন।
বলেন,–হ্যাঁ, একথা সত্যি, সুন্দরবন বাঘ প্রকল্পের মতো রামচন্দ্রপুর ভূত প্রকল্পের এক অদ্ভুত অভয়ারণ্যের স্বপ্নে ভ্রমণ করে এসেছি। কিন্তু স্বপ্ন ইজ স্বপ্ন। অর্থাৎ স্বপ্ন জিনিসটা জলজ্যান্ত মিথ্যে। যাকে পদ্যে বলে, আপন মনের মাধুরী।
