দিদি বিরক্ত হয়ে বলল, আগে আসল কথাটা বলো!
রঘুই প্রথম দর্শন পায়। ঠাকুমা ভক্তিতে গদগদ হয়ে বললেন, ধুপ করে গাছ থেকে পড়লেন। রঘুকে বললেন, কী চাস বল? রঘুটা ছিল বড় বোকা। বলল। কী, টাউনের সব কাপড় যেন কাঁচতে পাই।
ঘর জুড়ে হাসি ফুটল। পিসিমা বললেন,–তাই বলল রঘু? কী বুদ্ধি!
ঠাকুমা বললেন,–তবে বাবার মাহাত্ম্য রে! রঘু যে কাপড়ই কাঁচত, তাই একেবারে ঝকমকে হয়ে উঠত। শেষে সোড়া না সাবান না, শুধু জলে চুবোলেই ময়লা কাপড় সাফ। এদিকে গেছোবাবার খবর রটে গেছে। টাউনসুদ্ধ লোক ঝিলের জঙ্গলে যায়। শিবতলায় যায়। কেউ দর্শন পায়। কেউ পায় না। বাবা থাকেন গাছে। গাছেই স্তবটব করেন। বলে ঠাকুরদার দিকে ঘুরলেন, বলো না, কীভাবে দর্শন পেয়ে ছিল?
ঠাকুরদা গম্ভীরমুখে বললে,–আমার ছিল শিকারের নেশা। সেবার ঝিলের জঙ্গলে একটা বাঘ বড় বেশি উপদ্রব করছিল। বন্দুক নিয়ে বাঘটা মারতে গেছি, হঠাৎ একটা গাছ থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডাকল। চমকে উঠে দেখি, গাছের ডালে এক সাধুবাবা। বললেন, খবরদার বাঘ মারবিনে। বাঘটা আমার এক চেলা। তারপর কথাটা বলেই এক গাছ থেকে আর-এক গাছে, ঠিক যেন–
দিদি বলে উঠল, টারজানের মতো! টারজানের মতো!
ঠাকুরদা তাঁর গল্পে বাধা পড়ায় খাপ্পা হয়ে ধমক দিতে যাচ্ছেন, এমনসময় বাবা তার ছোটশ্যালককে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বাবার মুখে হাসি। ছোটমামার তুষোমুখ।
বাবা বললেন,–বঙ্কুবাবুর কাণ্ড! আর ইনিও এমন বুন্ধু যে নিজের পরিচয়ও দেননি! –ছোটমামার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালেন বাবা, বলবি তো আমার সঙ্গে কী সম্পর্ক?
–বঙ্কুদারোগা আমার চেনা লোক।
পিসেমশাই বললেন, কিন্তু ওকে হঠাৎ অ্যারেস্ট করল কেন?
বাবা হাসতে হাসতে বললেন,–পাঁচু-চোরের ব্যাপার আর কী?
ঘরসুদ্ধ সব্বাই অবাক হয়ে একগলায় প্রশ্ন করলেন, তার মানে? তার মানে?
কী আশ্চর্য! বাবা একটু রেগে গেলেন, কমাস আগে পাঁচু আমাদের রান্নাঘরে চুরি করতে ঢুকেছিল। হাতেনাতে ধরা পড়েছিল। ভুলে গেলে? –ঘরসুন্ধু হাসলেন। সব্বাই। সেই পাঁচু! ভাত-চোর পাঁচু!
সেই পাঁচু। বাবা বললেন, বঙ্কুবাবুর হাতে খবর আছে, ফেরারি আসামী পাঁচু নাকি ঝিলের ওদিকে গাছে লুকিয়ে আছে। গাছে ডেরা বেঁধেছে। দৈবাৎ কেউ দেখে ফেললে বলে, আমি সেই গেছোবাবা।
মা ফোঁস করে উঠলেন,–তা নান্টুর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?
বাবা ছোটমামার দিকে তাকিয়ে এবার মুচকি হাসলেন, বঙ্কুবাবু ভেবেছিলেন, নান্টু পাঁচুর কাছে হয়তো চোরাইমাল কিনে ঝিলের ধারে ঘাপটি পেতে ছিল।
ছোটমামা রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। খুব হাসাহাসি চলতে থাকল। একফাঁকে আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম। তারপর বাগানের দিকে ঘরটাতে গিয়ে দেখি, ছোটমামা তুষোমুখে বসে আছেন। এই ঘরটাতে ছোটমামা আর আমি থাকি। বললুম,–ছোটমামা। পুলিশ আপনাকে মারেনি তো?
ছোটমামা ভেংচি কাটার ভঙ্গিতে বললেন,–অত সোজা? আমার গায়ে হাত তুললে কী হতো জানিস?
–কী হতো ছোটমামা?
ছোটমামা ভরাট গলায় বললেন, আমি কবি। কবির গায়ে পুলিশ হাত তুললে কী হতো, তুই-ই ভাব। বাহাত্তর লক্ষ ঊনত্রিশ হাজার কবি হইহই মিছিল করে এসে… এত সোজা?
কথাটা মনে ধরল। বললুম-আচ্ছা, ছোটমামা, গেছোবাবা কি সত্যিই পাঁচু চোর?
হ্যাঁ, ছোটমামা বাঁকা হাসলেন। তুই তো হাদারাম। তাই একটা চোরের পায়ে গড় করলি। আমি ঠিকই টের পেয়েছিলুম বলে গড় করিনি।
কথাটা বিশ্বাস হয়নি। তা ছাড়া গেছোবাবা বলেছিল, তাকে গড় না করলে পুলিশ ধরে। ছোটমামাকে তার একটু পরেই পুলিশে ধরল। কিন্তু ছোটমামার এখন যা মুড, সে কথা বলা যাবে না। এও বলা যাবে না যে, গেছোবাবা যদি সত্যিই পাঁচু-চোর হয়, তাহলে গাছের পাতা কচমচিয়ে খায় কী করে? তার চেয়ে বড় কথা, গেছোবাবা নিজেই বলছিল, পাঁচু তাকে গড় করেনি বলে তাকে জেলে ঘানি টানতে আর পাথর ভাঙতে হয়েছিল। তাছাড়া একজন হিঁচকে চোর পলাশির যুদ্ধ আর লর্ড ক্লাইভের কথা জানবে কী করে? চোরেরা কি ইতিহাস-বই পড়তে পারে? বড় চোর হলেও কথা ছিল, পাঁচু তো নেহাত ছিঁচকে চোর। উঁহু, তাও না–স্রেফ ভাত-চোর।…
ছোটমামার এ রাতে মন খারাপ। দিদি কতবার খেতে ডাকতে এল। বললেন, খিদে নেই। শেষে মা এলেন। সাধাসাধি করার পর ছোটমামা বললেন,–পরে খাব খন! মা রাগ করে বললেন,–রাত দশটা বাজে। আর কতক্ষণ হেঁসেল পাহারা দেব?
তখন ছোটমামা বললেন, ঠিক আছে। টেবিলে রেখে যাও। সময়মতো খাব।
বাড়ির কাজের লোক ভুতো ছোটমামার রাতের খাবার নিয়ে এল। টেবিলে ঢাকা দিয়ে সে চলে যাচ্ছে, ছোটমামা ডাকলেন, ভুতো শোনো।
ভুতে বিনীতভাবে বলল,–মন খারাপ করতে নেই দাদাবাবু। নতুন দারোগাবাবু লোকটা ওইরকমই। যাকে-তাকে চোর বলে ধরে হাজতে ঢোকাচ্ছেন। পাঁচু কি কম দুঃখে–বলেই সে থেমে গেল। ছোটমামা গলা চেপে বললেন,-পাঁচুকে তুমি চেনো?
খুব চিনি-ভুতো ফিক করে হাসল। এ টাউনে ওকে কে না চেনে?
–পাঁচু গাছে চড়তে পারে?
–হুঁ।
–হনুমানের মতো চার পায়ে দৌড়তে পারে?
–হুঁ।
ছোটমামা ভেংচি কাটলেন, হুঁ! খালি হুঁ! তুমি দেখেছ কখনও?
ভুতো গেছোবাবার ভঙ্গিতে বলল, আজ্ঞে, দেখলেও দেখেছি, না দেখলেও না দেখেছি।
এইতেই ভীষণ চটে গিয়ে ছোটমামা বললেন, তুমিও দেখছি গেছোবাবার এক চেলা!
