ছোটমামা ফের চার্জ করলেন, কী অমঙ্গল হবে, শুনি?
গেছোবাবা বলল,–পুলিশ ধরবে। জানিস তো? বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। আর পুলিশে ছুঁলে আঠারো দুগুণে ছত্রিশ। নে, গড় কর। গড় কর!
গেছোবাবা নিজের পা দেখতে থাকল লম্বা হাতে। চেহারাও লম্বা। জ্যোৎস্নায় ওকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সন্ন্যাসীদের মতো ঝাকড়-মাকড় চুলদাড়ি, খালি গা, পরনে কৌপিন। ছোটমামা একটু দোনোমনো করে বললেন,–খামোকা পুলিশে আমাদের ধরবে কেন? আমরা চোর না ডাকাত?
গেছোবাবা হিঁ-হিঁ শব্দ করে ভুতুড়ে হাসল। পাঁচুকে জিগ্যেস করিস সেসব কথা। পাঁচুকে দর্শন দিয়েছিলুম। ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে গড় করেনি। তারপর আর কী! ছমাস ঘানি টানতে হয়েছিল জেলে। এক মাস পাথর ভেঙে-ভেঙে হাত দুখানায় কড়া পড়ে সে এক অবস্থা! গড় কর, গড় কর!
কথাগুলো শুনতে-শুনতে কী এক ভয়ে ঝটপট গড় করে ফেললুম। ছোটমামা একটু তফাতে, বাধা দেওয়ার সুযোগ পেলেন না। গেছোবাবা আশীর্বাদ করলেন হাত তুলে,-জিতা রহো বেটা! আর ছোটমামার কী হল, জেদ ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
গেছেবাবা যেন রাগ করেই আগের মতো চার পা হল এবং ঠিক হনুমানের মতো দৌড়তে-দৌড়তে বটগাছের দিকে নিপাত্তা হয়ে গেল।
এবার ছোটমামা আরও অবাক হয়ে বললেন, কী অদ্ভুত! মানুষ না হনুমান? তারপর আমার দিকে তেড়ে এলেন, তুই ওই হনুমানটাকে গড় করলি। রামায়ণের হনুমানজি হলে কথা ছিল। তুই কী রে পুঁটু?
এই সময় পেছনে দিক থেকে টর্চের আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর। তারপর মাটি কাঁপিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে কেউ এগিয়ে আসতে-আসতে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, কারা ওখানে? কী হচ্ছে রাতবিরেতে, আঁ?
ছোটমামা সঙ্গে সঙ্গে কেঁচো হয়ে গেলেন, বললেন, বড়বাবু নাকি? নমস্কার, নমস্কার!
থানার দারোগা বন্ধুবাবুর এমন অতর্কিত আবির্ভাবে আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠছিল। গেছোবাবার কথাটা তাহলে হাতেনাতে ফলতে চলেছে। লোকে বলাবলি করে, এমন ডাকসাইটে পুঁদে পুলিশ অফিসার নাকি কেউ কখনও দ্যাখেনি। চোর-ডাকাত তল্লাট ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। আমাদের ছোট্ট শহরে আজকাল প্রচুর শান্তি।
বঙ্কুবাবু প্রকাণ্ড মানুষ। টর্চ নিভিয়ে বললেন, হুম! আপনারা এখানে কী করছেন?
ছোটমামা কাচুমাচু হেসে বললেন, চঁদ দেখছিলুম সার! দেখুন না কেমন সুন্দর চাঁদ-ফুল-মুন। এমন নিরিবিলি জায়গায় চাঁদ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই…
বঙ্কুবাবু থামিয়ে দিয়ে বললেন,–সঁদ! চাঁদের কী দেখার আছে? আঁ? নিরেট পাথর। বাতাস নেই। প্রাণ নেই। যেন শ্মশান! চালাকি ছাড়ুন!
ছোটমামা বলে উঠলেন, আমি যে কবি, সার! পোয়েট!
পদ্য লেখেন? বন্ধু দারোগা অট্টহাসি হাসলেন, যেন ভূমিকম্প হতে থাকল। পদ্য লিখেই বাঙালি জাতটা উচ্ছন্নে গেছে। কখনও পদ্য লিখবেন না। আর একটু আধটু যদিবা লেখেন, দ-াদ নয়। চাঁদে আছেটা কী মশাই? বলে আমার ওপর টর্চের আলো ফেললেন। –এটি কে?
–আমার ভাগ্নে সার! পুঁটু।
–একেও লাইন ধরিয়েছেন দেখছি! অ্যাই থোকা, কোন ক্লাসে পড়ো?
ঢোক গিলে বললুম, ক্লাস এইট।
পড়াশোনা নেই? –বঙ্কুবাবু ধমক দিলেন। কতগুলো পদ্য লিখেছ অঙ্কের খাতায়? আমার ভাগ্নে পুঁচকে অঙ্কের খাতায় পদ্য লিখেছিল। তাকে কী করেছিলাম জানো?
ভয় পেয়ে বললুম,–আমি পদ্য লিখিনে। ছোটমামা বললেন, বেড়াতে যাচ্ছি, তাই সঙ্গে এলুম। এসেই গেছোবাবাকে দেখে
ছোটমামার চিমটি খেয়ে থেমে গিয়েছিলুম। বঙ্কুবাবু বললেন, কী বললে, কী বললে? গেছোবাবা না কী যেন?
আমি বলছি স্যার। ছোটমামা বললেন, একটা অদ্ভুত লোক সার। একটু আগে একটা লোক-জাস্ট একটা হনুমান সার!
–গাছেই নাকি থাকে। সেভেনটিন ফিফটি সেভেন–
এরপর কীভাবে এবং কী ঘটল গুছিয়ে বলতে পারব না। বন্ধুবাবু হুইসল বাজিয়ে দিলেন। আর ধুপধাপ শব্দে একদঙ্গল কনস্টেবল এসে পড়ল কোত্থেকে। বঙ্কুবাবু
ছোটমামাকে দেখিয়ে বললেন,-পাকড়ো ইসকো!
–খোকাবাবুকে নেহি। ঔর মরাধারি! তুম খোকাবুকো ঘর পঁহুচা দো!
.
বাবা আমার মুখে তার শ্যালকের খবর পেয়েই থানায় দৌড়েছিলেন। আমাকে ঘিরে ভিড় ঘরের ভেতর। মা, পিসিমা, দিদি, ঠাকুমা এবং শেষে ঠাকুরদা ও পিসেমশাইও চারদিক থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্নে আমাকে জেরবার করছিলেন। ছোটমামাকে কেন পুলিশে ধরল? চাঁদ দেখা কি বেআইনি? গেছোবাবার দর্শনও কি বেআইনি?
গেছোবাবার কথা বলতেই ঠাকুমা চমকে উঠে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। কপালে ঠেকান জোড়হাত, চোখ বন্ধ, ঠোঁট কঁপছিল। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ঠাকুরদার দিকে তাকালেন। ঠাকুরদা আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঠাকুমা আমাকে কাছে যেতে বললেন, আমি জানতুম! ঠিক জানতুম, বাবা ঝিলের ধারে শিবতলা তল্লাটেই আছেন। কেউ আমাকে পাত্তা দিত না।
পিসেমশাই বললেন,–এ গেছোবাবা ব্যাপারটা ঠিক মাথায় আসছে না। এটার সায়েন্টিফিক এক্সপ্লানেশন–
পিসিমা চোখ কটমট করে বললেন, তুমি তো নাস্তিক। তোমার মাথায় অনেক কিছুই-আসে না। সায়েন্টিফিক এক্সপ্লানেশন–সবখানেই সায়েন্স খাটে না। ও মা, বলো না!
উনি ঠাকুমার দিকে তাকালে ঠাকুমা ফোকলা দাঁতে একটু করুণ হাসলেন। –তখন তোদের জন্মই হয়নি। ঝিলের ওদিকটায় সে কী জঙ্গল! দিনদুপুরে বাঘ বেরোত। সেই সময়কার কথা তো, প্রথমে দর্শন পেয়েছিল রামু-ধোপার বাবা রঘু। ঝিলে কাপড় কাঁচতে যেত সে। দিনমানে ঘাসের ওপর কাপড়গুলো শুকোতে দিত। শিবতলার ছায়ায় গিয়ে বসে থাকত। তারপর…।
