ছোটমামা বলেছিলেন,–ঠিক বলেছ মোনাদা! একজন ছিলেন সাদাসিধে ভদ্রলোক। অন্যজন ছিলেন কোনও সাধুবাবা।
দিদিমা বলেছিলেন, তা না হয় বুঝলুম। কিন্তু যে যার নিজের খুলি ফেরত পেয়ে মারামারি বাধাল কেন?
ছোটমামার অমনি জবাব, মনে হচ্ছে, সাধুবাবার ভূতের জন্য সেই ভূত ভদ্রলোক যে খুলিটা থানে রেখেছিলেন, সেটা সাধুবাবার খুলিই নয়। মাথায় ফিট করেনি বলেই দৌড়ে গিয়ে সাধুবাবা খটাখট ঘুষি মারছিল ভূত-ভদ্রলোককে।
মোনা-ওঝা খিকখিক করে হেসে বলেছিল,–ওসব কথা থাক। মা-জননীর কোমর থেকে পেতনিটা পালিয়ে গেছে। তবে জোরে কামড়ে ধরেছিল তো? তাই ব্যথা পুরোপুরি সারতে আর দিনতিনেক লাগবে।
হ্যাঁ। মোনা ঠিকই বলেছিল। তিনদিন পরে দিদিমা দিব্যি হাঁটাচলা করতে পেরেছিলেন।…
গেছোবাবার বৃত্তান্ত
ঝিলের ধারে বসে ছোটমামা মুগ্ধচোখে চঁদ দেখতে-দেখতে বলছিলেন,–আচ্ছা পুঁটু, সত্যি করে বল তো, ওই চাঁদে আমেরিকানরা হেঁটেছে, বিশ্বাস হয়? অসম্ভব পুঁটু, অসম্ভব। কবি লিখেছেন, এমন চাঁদের আলোয় মরি যদি সেও ভালো সে-মরণ স্বৰ্গসমান…।
ঠিক এই সময়ই বাঁ-দিকে কোথাও আবছা খসখস-মচমচ শব্দ শুনতে পেলাম। ভাঙা শিবমন্দির খুঁড়ে মস্ত বটগাছ। হাওয়া-বাতাস বন্ধ। সন্দেহজনক শব্দটা সেই গাছের ভেতর থেকে ভেসে এল।
গা ছমছম করতে থাকল। সেইদিকে তাকিয়ে রইলাম। ছোটমামাকে ইদানীং পদ্যে পেয়েছে। চাঁদ, ফুল, পাখি প্রজাপতি নিয়ে শখানেক পদ্য লিখে ফেলেছেন। কিন্তু নিছক লিখেও যেন ওঁর তৃপ্তি নেই, জিনিসগুলো অর্থাৎ ফুল, পাখি, প্রজাপতি, নেড়ে-ঘেঁটে দেখতে বেজায় তৎপর। এদিনই সকালে একটা প্রজাপতির পেছনে যেভাবে ছুটোছুটি করছিলেন! যাই হোক, তাতেও আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমাকে নিয়ে টানাটানিতেই আমি অস্থির। নিরিবিলি শুনশান ঝিলের ধরে ভাঙা মন্দির নিয়ে কত ভুতুড়ে গল্প চালু আছে। দিনদুপুরেই সেদিকটাতে পারতপক্ষে কেউ পা বাড়ায় না। এখন তো সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। জ্যোৎস্নায় চারদিকে যেন একশো ভূত। তার ওপর হঠাৎ বটগাছটটা থেকে ওইসব শব্দ।
ভয়ে-ভয়ে বললুম,–ছোটমামা, এবার বাড়ি ফেরা যাক।
ছোটমামা চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছিলেন। একটু রেগে গিয়ে বললেন,-দিলি তো পদ্যটা নষ্ট করে। বেশ একটা লাইন এসেছিল!
তখনই ধুপ করে শব্দ হল এবং চমকে উঠে দেখলুম, বটতলার চকরা-বকরা আলোছায়ায় কালো কী একটা পড়ল। তারপর সেটা চার পায়ে হেঁটে কঁকা জায়গায় গেল, সেখানে ঝলমলে জ্যোৎস্না। হনুমানই হবে তাহলে।
কিন্তু হঠাৎ প্রাণীটা দু-পায়ে সিধে হল এবং সোজা আমাদের দিকে হেঁটে এল। ছোটমামাকে আঁকড়ে ধরেছিলুম সঙ্গে-সঙ্গে। ছোটমামা পুঁটে-বলে হাঁক ছেড়েই চুপ করে গেলেন। এবার তিনিও প্রাণীটিকে দেখতে পেয়েছিলেন।
প্রাণীটি আমাদের অবাক করে বলে উঠল, কী রে? ভয় পেয়েছিস নাকি? পাসনে। আমি সেই গেছোবাবা।
মানুষের গলায় কথা শুনে ছোটমামার সাহস ফিরে তো এলই, পদ্যের লাইনে বাধা পড়ায় ভেতর-ভেতর খাপ্পা হয়েও ছিলেন। তেড়েমেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–গেছোবাবা মানে?
গেছোবাবা খি-খি করে হেসে বলল,–সে কী রে? আমার কথা শুনিসনি? আমি গেছোবাবা, গাছে-গাছে থাকি। গাছেই আমার বসবাস। তবে তোরা আজকালকার ছেলে, আমায় চিনবিই বা কী করে? চিনত তোদের ঠাকুরদা, তাদের ঠাকুরদা, তস্য তস্য ঠাকুরদা! ওরে বয়েসটা তো কম হল না। সেই যেবার লর্ড ক্লাইভ পলাশির যুদ্ধ জিতে তোদের এই টাউনে ঢুকল…
ওয়েট! ওয়েট!–ছোটমামা থামিয়ে দিলেন।–পলাশির যুদ্ধ? মানে…সেভেনটিন ফিফটি সেভেন! তার মানে তুমি বলতে চাও, তোমার বয়স…পুঁটে, হিসাব কর তো।
গেছোবাবা বলল, খামোকা ছেলেটাকে আঁক কষিয়ে হবেটা কী? তোরা এই যে আমার দর্শন পেলি, সেই তোদের বাপের ভাগ্যি। গড় কর এক্ষুনি! গড় কর!
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গড় করতে যাচ্ছি, ছোটমামা আমার চুল খামচে ধরে আটকালেন। বললেন,–ওয়েট, ওয়েট। যাচাই করে নিই। ওহে গেছোবাবা, তুমি এতকাল বেঁচে আছো বলতে চাও? ফ্রম এইটিনথ সেঞ্চুরি। অমৃত খেয়েছিলে নাকি?
ছোটমামার বাঁকা হাসি শুনে গেছোবাবা বলল,–খেলেও খেয়েছি, না খেলেও না খেয়েছি।
ছোটমামা চার্জ করলেন, হেঁয়ালি ছাড়। কে তুমি? নাম কী?
নাম একটা ছিল বটে! ভুলে গেছি। –গেছোবাবা মাথা চুলকে বলল, গাছে বসত করতে গিয়ে গেছোবাবা নাম পেয়েছিলুম। তখনকার লোকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করত। যে গাছে থাকতুম, তার তলায় খাবার রেখে যেত। আজকাল কী যে হয়েছে। লোকে আমাকে ভুলেই গেছে রে! বড় দুঃখ হয়।
লতাপাতা খাই। কখনও ফলমাকড়টা খাই। এই বলে গেছোবাবা পাশের একটা ঝোঁপ থেকে লতা-পাতা ছিঁড়ে চিবোতে শুরু করল। চিবোতে-চিবোতে বলল,–এগুলো একটু তিতকুটে। তবে মোটের ওপর মন্দ না। তোরাও খা না! খেয়ে দ্যাখ!
ছোটমামা কয়েক পা এগিয়ে গেলেন! বুঝলুম, গেছোবাবা সত্যিসত্যি পাতা খাচ্ছে কি না দেখতে গেলেন। আমি অবাক হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলুম। ছোটমামা বললেন, কী অদ্ভুত! তুমি যে দেখছি সত্যিই পাতা খাচ্ছ। ওহে গেছোবাবা, এগুলো খেয়ে তোমার বদহজম হয় না?
হলে হয়, না হলেও না হয়–গেছোবাবা ঢেকুর তুলে বলল। তা অত কথায় কাজ কী তোদের? বড় ভাগ্যে দর্শন পেলি। এবার গড় করে চলে যা। নইলে অমঙ্গল হবে।
