ভদ্রলোক এবার খিকখিক করে হেসে বললেন, আরে! আমিও তো সেখানেই যাচ্ছি।
ছোটমামা গম্ভীরমুখে বললেন,–বাবা কন্ধকাটা তার থানে বড়দের দেখতে পেলেই রে-রে করে তেড়ে আসেন। তাই এই যে দেখছেন ভাগনে পুটু। একে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। বাবা কন্ধকাটা ছোটদের খুব ভালোবাসেন।
–তাই বুঝি? তা তোমার ভাগ্নে সেখানে গিয়ে কী করবে?
–থানের মাটি খাবলে তুলবে। রুমালে বেঁধে নিয়ে আসবে। সেই মাটি গুলে মায়ের কোমরে মাখিয়ে রাখলে বাত সেরে যাবে, বুঝলেন?
ভদ্রলোক আবার দু-হাত দিয়ে তার মুন্ডুটা নাড়ানাড়ি শুরু করলেন। তারপর বললেন, উঃ! বড্ড জ্বালায় পড়া গেল দেখছি। মনে হচ্ছে যেন আমার মুভুটা ঘাড় থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ছোটমামা বললেন, আপনি কিছু ভাববেন না। বাবা কন্ধকাটার থানে যাওয়া পর্যন্ত মুন্ডুটাকে চেপে ঘাড়ে বসিয়ে রাখুন। তারপর আপনি আর আমি ঝোঁপের আড়ালে বসে থাকব। আর পুঁটু আপনার জন্যও খানিকটা মাটি এনে দেবে। ওখানে একটা ঝিল আছে দেখেছি। আপনি মাটিগুলো তুলে কাদা করে মুন্ডুর পেছনদিকে ঘাড় অব্দি মাখিয়ে রাখবেন। ব্যস!
ভদ্রলোক শুধু বললেন,–দেখা যাক।…
কালিকাপুর স্টেশনে নামবার পর একদল বরযাত্রী বরকনে নিয়ে হইহই করে ট্রেনে উঠছিল। সেই ভিড়ে ভদ্রলোককে আর দেখতে পেলুম না।
কথাটা ছোটমামাকে বললুম। ছোটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন,–ছেড়ে দে তো পাগলের কথা। দেখেই বুঝেছিলুম বদ্ধপাগল। পা চালিয়ে চল। সাড়ে ছটার ট্রেনে আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।
কিছুক্ষণ পরে ছোটমামা হাঁটার গতি কমালেন। সামনেই ধ্বংসস্তূপ আর ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতরে উঁচু ভাঙা পাঁচিল দেখা যাচ্ছিল। সেটা লক্ষ করে দুজনে জঙ্গলে ঢুলুম। তারপর বটগাছটাও চোখে পড়ল। ছোটমামা একটা ঝোঁপের আড়ালে বসে ফিসফিস করে বললেন, কুইক পুঁটু! মাটিটা বৃষ্টিতে নরম হয়ে আছে। এই রুমালটা নে। যতটা পারবি, খাবলে মাটি তুলে নিবি। চলে যা।
ভয়ে-ভয়ে এগিয়ে গেলুম। উঁচু ভাঙা পাঁচিলের পাশে বটগাছটার কাছে গিয়ে দেখলুম, গুঁড়ির নিচে একটা প্রকাণ্ড ইটের চাঙড়। তার ওপর একটা মড়ার খুলি।
খুলিটা দেখামাত্র আঁতকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে এলুম। কিন্তু দিদিমার বাতের কষ্টের কথা মনে পড়ল। তখন সেখানেই গুঁড়ি মেরে বসে রুমাল বিছিয়ে কয়েক খাবলা মাটি তুলে নিলুম। তারপর মাটিগুলো রুমালে বেঁধে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি, তখনই দেখলুম ট্রেনের সেই ভদ্রলোক পাঁচিলের পাশ দিয়ে চুপিচুপি আসছেন। তাঁর দৃষ্টিটা মড়ার খুলির দিকে।
তারপর দেখলুম, ভদ্রলোক তার কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা মড়ার খুলি বের করলেন এবং ইটের চাঙড়ে সেই খুলিটা রেখে থানের মড়ার খুলিটা তুলে নিয়ে পাঁচিলের আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন।
ছোটমামা ঝোঁপের আড়ালে থেকে ব্যাপারটা দেখছিলেন। এবার ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,–আয় তো পুঁটু! ব্যাপারটা দেখি।
ছোটমামা তখন বেপরোয়া। বাবা কন্ধকাটার কথা ভুলে ভাঙা পাঁচিলের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেলেন। আমিও ছোটমামাকে অনুসরণ করলুম। কিছুটা দৌড়ে গিয়েই ভদ্রলোককে দেখা গেল। তিনি সামনের দিকে হনহন করে এগিয়ে চলেছেন। ছোটমামা চেঁচিয়ে উঠলেন,–ও মশাই! ও মশাই! শুনুন! শুনুন!
ভদ্রলোক মুখটা ঘোরালেন। দেখে চমকে উঠলুম। এ মুখ তো সেই মুখ নয়। লম্বা চুল নেই। প্রকাণ্ড গোঁফ আছে। ট্রেনের তিনি ছিলেন ফরসা। ইনি কুচকুচে কালো। অথচ সেই ছাইরঙা পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি।
ছোটমামার একরোখা জেদি স্বভাব আমার জানা। দৌড়ে তার কাছাকাছি গিয়ে আবার যেই বলেছেন,–ও মশাই। ব্যাপারটা কী? অমনি ভদ্রলোক আবার মুখ ঘোরালেন। বিকেলের রোদ পড়েছিল সেখানে। আতঙ্কে হতবুদ্ধি হয়ে দেখলুম, এবার আর মানুষের মুখ নয়। আস্ত মড়ার খুলি।
ছোটমামা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। আর তারপরই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। আমার পাশ দিয়ে কী একটা ছুটে গেল। আমি আতঙ্কে প্রায় কেঁদে উঠে ডাকলুম,– ছোটমামা! ছোটমামা!
ছোটমামাও যেন হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার ডাক শুনে দৌড়ে চলে এলেন। তারপর দেখলুম, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সেই কঙ্কালের সঙ্গে গেরুয়া খাটো লুঙ্গিপরা আর একটা কঙ্কালের ঘুষোঘুষি চলেছে। ছোটমামা হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন, কী বিচ্ছিরি ব্যাপার! ছ্যা-ছ্যা! মরে গিয়েও কি মারামারি করা উচিত? বল তো পুঁটু!
কান্নাজড়ানো গলায় বললুম,–ছোটমামা! আমরা পালিয়ে যাই।
ছোটমামা আমার হাত থেকে রুমালে বাঁধা মাটিগুলো নিয়ে বললেন,–পালাব কেন রে? আস্তেসুস্থে যাব। মরুক ব্যাটাচ্ছেলেরা মারামারি করে! ছ্যা-ছা! এ কি ভদ্রলোকের কাজ? বাবা কন্ধকাটা হয়তো মজা দেখছেন।
চলে আসবার আগে দেখলুম, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কঙ্কাল আর গেরুয়া খাটো লুঙ্গিপরা কঙ্কাল পরস্পরকে জাপটে ধরে একটা ঝোঁপের মধ্যে প্রচণ্ড লড়ে যাচ্ছে। আর ঝোঁপটা খুব নড়ছে।…
এসবের চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার, বাবা কন্ধকাটার থানের মাটি দিদিমার কোমরে মাখিয়ে রাখার পরদিনই তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পেরেছিলেন। মোনা-ওঝা এসে ছোটমামার মুখে সব ঘটনা শুনে বলেছিল, লড়াইটা খুলি বদলের। বুঝলেন ছোটবাবু? গত বছর অনেক জায়গায় খুব বানবন্যা হয়েছিল। অনেক মানুষ জলে ডুবে মারা পড়েছিল। সে-ও তো অপঘাতে মরণ। আর অপঘাতে মরলেই মানুষ ভূত হয়ে যায়। কিন্তু ভূত হলে কী হবে? দেহের ওপর মায়া কি সহজে যায়? কিন্তু দেহ তো তখন কঙ্কাল! আমার মনে হচ্ছে, ওই দুই ভূতের মধ্যে খুলি বদল হয়ে গিয়ে গণ্ডগোল বেধেছিল।
