ছোটমামা বিকেলে মোনা-ওঝাকে ডেকে নিয়ে এলে ওর প্রমাণ মিলল। মোনা ওঝার মাথায় জটা, মুখে গোঁফদাড়ি। কপালে লাল ত্রিপুক আঁকা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। কাঁধের তাপ্লিমারা গেরুয়া রঙের ঝোলা থেকে সে একটা মড়ার খুলি বের করে দিদিমার ঘরে ঢুকল। তারপর মেঝেয় বসে মড়ার খুলিটা রেখে সে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে ডাকল, ওগো মা! ও জননী! বলুন তো আপনার কোথায় ব্যথা?
দিদিমা ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে বললেন,–কোমরের পেছনে।
–ব্যথাটা কীরকম বলুন তো মা?
দিদিমা একটু ককিয়ে উঠে বললেন,–কে যেন কামড়ে ধরে আছে।
মোনা-ওঝা হি-হি করে হেসে বলল,-বুঝেছি! বুঝেছি! এবার বলুন তো মা জননী, কবে কখন ব্যথাটা শুরু হয়েছিল?
মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। মোনা তাঁকে চোখের ইশারায় চুপ করাল। দিদিমা অতিকষ্টে বললেন, পুঁটুর সঙ্গে রথের মেলায় গিয়েছিলুম। হঠাৎ বিষ্টি এল। আমরা সিঙ্গিমশাইয়ের আমবাগানে এসে–
মোনা-ওঝা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,–থাক, থাক। আর বলতে হবে না। বলে সে মড়ার খুলিটার দিকে রাঙা চোখে তাকাল। –শুনলি তো বাবা মা-জননীর কথাটা? এবার তুই আমার কানে কানে বলে দে, কী করে ওই হতচ্ছাড়ি পেতনিটাকে তাড়ানো যায়?
সে মড়ার খুলিটা কানের কাছে কিছুক্ষণ ধরে ফোঁস করে সশব্দে শ্বাস ছাড়ল। তারপর বলল,–হুঁ। গলায় দড়ি দিয়ে মরা আত্মা। পেতনি হয়ে গেছে। মা-জননীর কোমর কামড়ে ধরে জ্যান্ত মানুষদের ওপর রাগ দেখাচ্ছে।
বলে মোনা-ওঝা মায়ের দিকে তাকাল,–দিদি! খুলেই বলছি। এ পেতনিকে তাড়ানো আমার কম্ম নয়। কালিকাপুরে বাবা কন্ধকাটার থান আছে। সেই থানের খানিকটা মাটি তুলে এনে মা-জননীর কোমরে মাখিয়ে দিলেই পেতনিটা পালিয়ে যাবে।
ছোটমামা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার বললেন, কালিকাপুর আমি চিনি। গতবার ফুটবল খেলতে গিয়ে একটা রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখেছিলুম। জায়গাটা একেবারে জঙ্গল হয়ে আছে।
মোনা-ওঝা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,–বাবা কন্ধকাটার থান সেই জঙ্গলের মধ্যিখানে। একটা ভাঙা দেউড়ি এখনও উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে একটা বটগাছ। বটগাছের তলায় বাবা কন্ধকাটার থান।
ছোটমামা বললেন, কুছ পরোয়া নেই। এখনই বেরিয়ে পড়ছি। সওয়া চারটের ট্রেনটা পেয়ে যাব। মোটে তিনটে স্টেশন।
মোনা জিভ কেটে বলল,–ওঁ হুঁ হুঁ হুঁ! কন্ধকাটা কথাটা দাদাবাবু কি বুঝতে পেরেছেন? মুন্ডু নেই। বুকের দুপাশে দুটো চোখ। সাংঘাতিক ব্যাপার! আপনাকে থানে দেখতে পেলেই সর্বনাশ। তিনি বটগাছে লুকিয়ে থাকেন।
মা করুণমুখে বললেন, তা হলে তুমি নিজেই সেই থানের মাটি এনে দাও না মোনা!
মোনা হাসল।-ওরে বাবা! আমাকে থানের ত্রিসীমানায় দেখলে বাবা কন্ধকাটা রে-রে করে তেড়ে আসবেন। তবে তাঁর থানের মাটি আনার সহজ উপায় আছে। বাবা কন্ধকাটা ছোটদের খুব ভালোবাসেন। এই খোকাবাবু থানে গিয়ে এক খাবলা মাটি তুলে রুমালে বেঁধে আনে, বাবা মোটেও রাগ করবেন না।
কথাটা শুনে আমি আঁতকে উঠে বললুম, আমি একা ওখানে যেতে পারব না।
ছোটমামা বললেন,–কী বোকার মতো কথা বলছিস পুটু? আমি তোর সঙ্গে যাব। তারপর আমি ঝোঁপের আড়ালে বসে থাকব। তুই থানের মাটি নিয়ে আসবি। কিচ্ছু ভাবিস নে! কন্ধকাটা হোক, আর যে ব্যাটাচ্ছেলেই হোক, আমার সামনে এলে অ্যায়সা একখানা ঝাড়ব না–কথা শেষ না করে ছোটমামা ফুটবলে কিক করার ভঙ্গি তে শূন্যে লাথি ছুড়লেন।
তারপর ছোটমামা আমার একটা হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে বারান্দায় গেলেন। বললেন,-এক মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নে। আমি রেডি হয়েই আছি। চারটে বাজে। স্টেশনে পৌঁছতে এখনও প্রচুর সময় আছে। এই ট্রেনটা দৈবাৎ লেট করলে তো ভালোই হবে।…
তখনকার দিনে ট্রেনে বা বাসে মোটেও ভিড় হতো না। লোকেরা পায়ে হেঁটেই যাতায়াত পছন্দ করত। ট্রেনে যে কামরায় আমরা উঠেছিলুম, তাতে মোটে জনাতিনেক যাত্রী। তারা পরস্পর দুরে জানালার কাছে বসে ছিল। ছোটমামা নিজে একটা জানালার ধারে বসে বললেন, তুই আমার পাশে বোস পুটু! জানালার ধারে বসলে কয়লার গুড়ো এসে চোখে ঢুকে যাবে।
একটু তফাতে এক ভদ্রলোক জানালার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিলেন। তাঁর মাথায় সিঁথিকরা লম্বা ঘাড় ছুঁই-ছুঁই কঁচাপাকা চুল। পরনে ধুতি আর ছাইরঙা পাঞ্জাবি। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর নাকের পাশে মোটা একটা জডুল। কাঁধের ব্যাগটা পাশে সিটের ওপর রেখে তিনি চিবুকে একটা হাত এবং মাথায় একটা হাত চেপে মাথাটা নড়িয়ে দিলেন।
ব্যাপারটা ছোটমামারও চোখে পড়েছিল। ফিসফিস করে বললেন,-পাগল নাকি রে?
আশ্চর্য ব্যাপার! ট্রেনের তুলকালাম শব্দের মধ্যেও কথাটা কি ভদ্রলোকের কানে গেল? তিনি একটু হেসে বললেন, পাগল হইনি এখনও! তবে পাগল হতে বেশি দেরি নেই!
ছোটমামা বললেন, কিছু মনে করবেন না। আপনি নিজের মুন্ডুটা ধরে অমন করে নাড়ানাড়ি করছেন কিনা? তাই মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেছে।
ভদ্রলোক এবার দুটো হাত দুই গালে চেপে মাথাটা কিছুক্ষণ নাড়ানাড়ি করে বললেন,–এই এক বিপদ হয়েছে আমার। মুন্ডুটা কিছুতেই ঘাড়ের সঙ্গে ফিট করছে না।
ছোটমামা জিগ্যেস করল, আপনার ঘাড়ে কি বাত হয়েছে?
–কেন? কেন?
–মানে আমার মায়ের কোমরে বাত হয়েছে তো! সাংঘাতিক বাত। মা দিদিকে বলেন, তার কোমর ধরে আপনার মতো নাড়ানাড়ি করো। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তাই আমরা যাচ্ছি কালিকাপুরে বাবা কন্ধকাটার থানে।
