কিন্তু সেই রথের দিকে দিদিমা এগোতেই পারলেন না। মা যেমন বলেছিলেন,–বিচ্ছিরি কাদা! বড্ড বেশি ভিড়!
অগত্যা দিদিমা বললেন, আয় পুঁটুদাদা! ভিড় কমুক। তখন রথদর্শন করব।
আমি জেদ ধরলুম। তাহলে ততক্ষণ পাঁপড়ভাজা খাওয়াও দিদা! নইলে আমি তোমাকে একা রেখে দৌড়ে বাড়ি চলে যাব।
দিদিমা তখন আর কী করেন! ভিড় এড়িয়ে একটা পাঁপড়ভাজার দোকানে গেলেন। আমাকে একখানা পাঁপভাজা কিনে দিয়ে সম্ভবত লোভ সম্বরণ করতে, পারলেন না। নিজেও একখানা পাঁপড়ভাজা কিনে ফেললেন। আর সেই সময় টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ মেলার মানুষজন সেই বৃষ্টিকে পাত্তা দেয়নি। ক্রমে বৃষ্টি বাড়তে থাকলে হইহট্টগোল শুরু হয়ে গেল। দিদিমা আমার হাত ধরে টানতে টানতে ভাগ্যিস মেলার একপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। তা না হলে দুজনেই ভিড়ের চাপে দলা পাকিয়ে কাদায় পড়ে থাকতুম।
বৃষ্টি যত বাড়ছিল, তত মেঘ গর্জে উঠছিল। বিদ্যুতের ঝিলিক এবং মুহুর্মুহু কানে তালাধারানো মেঘগর্জন। এদিকে দুজনেই ভিজে কাকভেজা হয়ে যাচ্ছি। দিদিমা ব্যস্তভাবে বললেন,–ও পুঁটু! বাড়ি ফিরে চলো।
আবার সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের পাশ গিয়ে দুজনে ফিরে আসছিলুম। হঠাৎ দিদিমা বললেন,–এখানে গাছতলায় একটুখানি দাঁড়াও পুঁটু! আমি যে আর হাঁটতে পারছিনে।
বলে তিনি বসে পড়লেন। ততক্ষণে চারদিক কালো হয়ে এসেছে। একটু দূরে মেলার আলোগুলো জুগজুগ করছে। আমার অবস্থা তখন ভ্যা করে কেঁদে ওঠার মতো। বললুম,–দিদা! এবার ওঠো!
দিদিমা কান্নাজড়ানো গলায় বললেন,–ও পুটু! আমি যে উঠতে পারছিনে। কোমরের পেছনে কে যেন কামড়ে ধরেছে।
শুনেই আমি প্রচণ্ড ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম,–ছোটমামা! ও ছোটমামা!
ছোটমামা কোথায় আছেন, তা জানতুম না। কিন্তু আমার গলা দিয়ে ওই কথাই বেরিয়ে গেল। দিদিমা যতবার ব্যথায় ককিয়ে উঠছিলেন, ততবার আমি ছোটমামাকে ডাকছিলুম।…
এরপর কীভাবে দিদিমা আর আমি বাড়ি ফিরেছিলুম, তা সবিস্তারে বলছি না। আমাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে মা ছোটমামা আর বাবাকে ঠাকরুনতলায় পাঠিয়েছিলেন। মেলায় আমাদের খুঁজে না পেয়ে তারা শর্টকাটে সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের পাশ দিয়ে আসছিলেন। তারপর টর্চের আলোয় আমাদের দেখতে পান।
বাড়ি ফিরে ছোটমামা হাসতে-হাসতে মাকে বলেছিলেন,–জানো দিদি? টর্চের আলো ফেলে দেখি, পুঁটু তখনও পাঁপড়ভাজা খাচ্ছে আর আমাকে ডাকাডাকি করছে। এদিকে মা-ও কিন্তু হাত থেকে পাঁপভাজা ফেলে দেয়নি।
এই নিয়ে সে-রাত্রে বাড়িতে খুব হাসিতামাশা হল। কিন্তু পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি, দিদিমা যে ঘরে শুয়েছিলেন, সেই ঘরের দরজার সামনে পাড়ার মহিলাদের ভিড়। বাবা গম্ভীরমুখে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। দিদিমার ঘর থেকে চাপা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। বাবাকে কিছু জিগ্যেস করতে সাহস হল না।
একটু পরে ছোটমামার সঙ্গে আমাদের গ্রামের ডাক্তার নাডুবাবু বাড়ি ঢুকলেন। ছোটমামার হাতে তাঁর ডাক্তারি বাকসো। নাড়ুবাবুকে দেখে পাড়ার মহিলারা দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন। সেই সুযোগে আমি গিয়ে দরজায় উঁকি দিলুম। দেখলুম, দিদিমা বিছানায় শুয়ে আছেন এবং মাঝে-মাঝে আর্তস্বরে বলছেন, উঁহুহুহু! ও ঠাকুর! এ কী হল? কে আমার কোমরে কামড়ে দিল?
নাড়ডাক্তার দিদিমাকে পরীক্ষা করে দেখে বললেন,–পুরোনো বাত। সারতে একটু দেরি হবে।…..
যাই হোক, দিদিমা সেই যে শয্যাশায়িনী হলেন তো হলেন। নাড়ডাক্তারের মোক্ষম সব ইঞ্জেকশন আর ওষুধে কাজ হল না। এরপর শহরের ডাক্তার নিয়ে এসেছিলেন বাবা। তিনিও দিদিমাকে বিছানা থেকে ওঠাতে পারলেন না। কোমরের যন্ত্রণাও কমল না। শেষে এলাকার নামকরা কবিরাজমশাইকে আনা হল। লোকে তাকে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী বলত। কিন্তু তাঁর ওষুধেও কাজ হল না। আমার মনে পড়ে, প্রতিদিন ভোরবেলা হামানদিস্তার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যেত। দেখতুম, মা বারান্দায় বসে ছোট্ট গোলাকার লোহার পাত্রে একটা ছোট্ট লোহার ডাণ্ডা দিয়ে কিছু পিষছেন। ছোটমামার কাছে শুনেছিলুম, ধন্বন্তরী কবিরাজমশাইয়ের দেওয়া ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে। সেই ওষুধ দিদিমার কোমরে প্রলেপ দেওয়া হবে।
কিছুদিন পরে এক রবিবার সিঙ্গিবাড়ির কাকিমা দিদিমাকে দেখতে এলেন। তিনিই মাকে পরামর্শ দিলেন, সবরকম চিকিৎসা তো করা হল। কিন্তু কাজ হল না। এবার টোটকা ওষুধ বা তুকতাক, মন্তরতন্তরে যদি বাত সারে, চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?
মা বললেন,–আমিও তা-ই ভাবছিলুম। কিন্তু তেমন কাকেও পাচ্ছি কোথায়?
সিঙ্গিবাড়ির কাকিমা বললেন,–কেন? তেমন লোক তো হাতের কাছেই আছে। কথায় বলে, গেঁয়ো যোগী ভিক্ষে পায় না।
–কে সে?
–মোনা-ওঝা। আবার কে? ওই যে তোমার মা বারবার বলেন, কোমরে কে কামড়ে ধরে আছে, তাতেই তো আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল। তোমরা কী ভাববে বলে কথাটা বলিনি। আমাদের আমবাগানে একটা গাছ আছে। সেই গাছের তলায় বৃষ্টির সময় তোমার মা-থাকগে ওসব কথা। মোনাকেই ডাকো!
কথাটা শুনে আমি আঁতকে উঠেছিলুম। আমার মনে পড়েছিল, সিঙ্গিমশাইয়ের আমবাগানে দুলেপাড়ার একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কী ভুল! কী ভুল! রথের মেলায় যাওয়ার দিন সেই কথাটা একেবারে মনে ছিল না! নির্ঘাত আমরা সেই গাছটারই তলায় বৃষ্টির সময় আশ্রয় নিয়েছিলুম।
