কিন্তু বাবার মনে কী ছিল, হঠাৎ উড়ে চলে গেলেন। পিসিমা করুণ মুখে বললেন,–বাবা যে ভোগ ফেলে চলে গেলেন কেবলরাম। তাহলে আমার কী হবে?
কেবলরাম বলল,–কিছু ভাববেন না। ভোগ থানে ছেড়ে দিচ্ছি। বাবা যখন খুশি ফিরে এসে খাবেন। চলুন, এখন আর বসে থেকে লাভ নেই।
–আমার অসুখের ওষুধ যে দিয়ে গেলেন না?
–ওই তো ওষুধ আপনার মাথায়!
পিসিমা ঝটপট মাথায় হাত দিতেই পেয়ে গেলেন কিছু। সঙ্গে-সঙ্গে আঁচলে বাঁধলেন। কেবলরাম ইঁদুরগুলো ছেড়ে দিল পাথরের ওপর। পিসিমা গাড়ির কাছে এলে বললুম,–ওষুধটা দেখি, পিসিমা!
পিসিমা বললেন, এখন দেখতে নেই। পরে দেখিস। ও কেবল, ভবদাকে ডাক।
এই সময় ভবভূতির সাড়া পাওয়া গেল বন্দুকের আওয়াজে। নিশ্চয় পাখিটাখি মারলেন। কেবল ওঁকে ডাকতে গেল।
একটু পরে ফিরলেন দুজনে। দুজনেরই মুখ গম্ভীর। কিন্তু শিকার কই? জিগ্যেস করলে ভবভূতি শ্বাস ছেড়ে শুধু বললেন, খুঁজে পেলুম না। যা পাথর চারদিকে। যাকগে! খামোক একটা গুলি খরচ হল।
সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। আবার কাঁচা রাস্তায় নড়চড় করতে করতে গাড়িটা এগোল কষ্টেসৃষ্টে।
পিসিমা ওষুধটা দেখিয়েছিলেন। শুকনো এক টুকরো কাঠি কিংবা শেকড়, বুঝতে পারিনি। সেটা হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে কেবলরামের নির্দেশ মতো রোজ সুচের ডগায় একবিন্দু তুলে জলের সঙ্গে খেতেন পিসিমা। আশ্চর্য ব্যাপার। আর রাক্ষস, ভাল্লুক বা পেত্নিটা এসে জ্বালাত না। দিব্যি ঘুমোতেন। সবসময় হাসিখুশি মেজাজ।
একদিন ভবভূতি এসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যাওয়ার পর কেবলরাম বলেছিল, ভবছরের মাথাটা দেখেছেন? পেছনে গোটাকতক চুল ছিল, তাও আর নেই! হুঁ–হুঁ বাবা, শাপ বলে কথা!
জিগ্যেস করেছিলাম, কীসের শাপ? কে শাপ দিল ওঁকে?
আবার কে? দণ্ডীবাবা! কেবলরাম গলা চেপে বলেছিল। বলতে বারণ করেছিলেন দুটো টাকা দিয়ে। তাই বলিনি। কিন্তু টাকা শোধ হয়ে গেছে অ্যাদ্দিনে। এবার বলে দিই দাদাবাবু ভবছার সেদিন কেকরাডিহির দণ্ডীবাবাকে গুলি করে মেরেছেন, জানেন?
–অ্যাঁ! বলিস কী রে?
–হ্যাঁ–দাদাবাবু। গিয়ে দেখি এই কাণ্ড। দণ্ডীবাবা পড়ে রয়েছেন গুলি খেয়ে। আর ভবছার মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে আমি হায়-হায় করে উঠলুম। তখন উনি বলেন কী, পানকৌড়ি উড়ে যাচ্ছে ভেবে গুলি করেছিলুম রে! তুই দুটো টাকা নেকাকেও যেন বলিস নে।
বলেছিলুম,–চেপে যা। আমায় যা বললি, বললি। কখনও পিসিমা যেন না শোনেন।
বুদ্ধিমান কেবলরাম কথাটা পিসিমাকে বলেনি আজও। তবে একথা সত্যি যে ভবভূতির মাথায় আর একগাছিও চুল নেই। কেকরাডিহির দণ্ডীবাবার অভিশাপ ছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে?
খুলি যদি বদলে যায়
এই অদ্ভুত ঘটনাটা আমার ছোটবেলায় ঘটেছিল। তখন আমার বয়স মোটে দশ বছর। আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি।
আমাদের গ্রামে আষাঢ় মাসে রথযাত্রা উপলক্ষে খুব ধুমধাম হতো। ঠাকরুনতলার খোলামেলা বিশাল চত্বরে মেলা বসত। আশেপাশের সব গ্রাম থেকে মানুষজন এসে ভিড় জমাত।
সেবার রথের মেলার সময় দিদিমা এসেছিলেন। তিনি রথের মেলা দেখতে যাবেন শুনে মায়ের প্রচণ্ড আপত্তি। না, না! মেলায় বড় ভিড় হয়। এদিকে বিষ্টিবাদলায় ঠাকরুনতলার চত্বরে বিচ্ছিরি কাদা। তা ছাড়া তোমার রোগা শরীর। দৈবাৎ পা পিছলে আছাড় খেলে কী হবে ভেবেছ?
দিদিমা মায়ের আপত্তি গ্রাহ্য করলেন না। আমার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বললেন,–এই পুঁটুদাদা আমার সঙ্গী হবে। তুমি কিচ্ছু ভেব না।
বেগতিক দেখে মা ডাকলেন,–ছোটকু! ও ছোটকু!
ছোটকু মানে আমার ছোটমামা। ছোটমামা আমাদের বাড়িতে থেকে মহকুমাশহরের কলেজে পড়তে যেতেন। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে রেললাইন গেছে। স্টেশনও আছে। ছোটমামা ট্রেনে চেপে কলেজ যেত।
মায়ের ডাকাডাকিতে ছোটমামার সাড়া পাওয়া গেল না। যাবে কী করে? ছোটমামাকে দুপুরে খাওয়ার পর সেজেগুজে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলুম। মাকে কথাটা জানিয়ে দিলুম। মা খাপ্পা হয়ে বললেন,–আসুক ছোটকু। দেখাচ্ছি মজা। ও থাকলে তোমাকে নিয়ে যেত।
দিদিমা বললেন,–আমার পুঁটুদাদামণিই যথেষ্ট। চলো ভাই!
মা আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, দিদার সঙ্গী হয়ে তুমি যেন ভিড়ে হারিয়ে যেও না। দিদার একটা হাত শক্ত করে ধরে থাকবে।
আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, আমার মায়ের সাড়া পেলুম। দিদিমার কাছে এসে তিনি বললেন,–এই ছাতিটা নিয়ে যাও মা! বৃষ্টিতে ভিজলে রোগা শরীরে আবার কী রোগ বাধিয়ে বসবে।
এবার দিদিমা চটে গেলেন। রথযাত্রার মেলায় ছাতি মাথায় যাব? তুই জানিস? রথের পরবে বিষ্টিতে ভিজলে পুণ্যি হয়!
মা গম্ভীরমুখে বাড়ি ঢুকে গেলেন। দিদিমার একটা হাত ধরে আমি বললুম,– তুমি ঠিক বলেছ দিদা। বিষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভালো লাগে।
শর্টকাটে ঠাকরুনতলা আমাদের বাড়ি থেকে তত কিছু দূর নয়। সিঙ্গিমশাইয়ের আমবাগানের পাশ দিয়ে একটা ঘাসে ঢাকা পোড়ো জমি পেরিয়ে আমরা শিগগির রথের মেলায় পৌঁছে গেলুম। তারপরই পাঁপড়ভাজার গন্ধে জিভে জল এসে গেল। বললুম,–ও দিদা! আগে পাঁপড়ভাজা খাব।
দিদিমা বললেন, খাবে বইকী। তুমি-আমি দুজনেই খাব। আগে রথদর্শন করি। তারপর অন্য কিছু।
এই মেলায় রথদর্শন ও প্রণাম ছিল মূল আকর্ষণ। জমিদারবাড়িতে একটা পেতলের রথ ছিল। সেটা রথযাত্রার দিন টেনে এনে ঠাকুরতলার শেষপ্রান্তে রাখা হতো। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টিবাঁধা পাইকরা লাঠি উচিয়ে সেই রথ পাহারা দিত। ভক্ত মানুষজন দূর থেকে প্রণাম করত।
