কেবলরাম ভয় পাওয়া গলায় বলল, কক্ষনো ও কাজ করবেন না ছার! দণ্ডীবাবা খেপে যাবেন। শাপ দেবেন। শাপে কী হবে জানেন ছার?
ভবভূতি গোঁফ পাকিয়ে বললেন, কী হবে শুনি!
–মাথার সব চুল উড়ে যাবে।
ভবভূতি নিজের মাথার প্রকাণ্ড টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, ধুস! আমার তো চুলই নেই! পেছনে কয়েকগাছা আছে–্যায় তো তাও যাক। ক্ষতি কীসের?
আমাদের গাড়ি শহর ছাড়িয়ে নদীর ব্রিজে পৌঁছল। তারপর ফাঁকা রাস্তা একেবারে। সারা পথ ভবভূতি কেবলরামের সঙ্গে রসিকতা করতে করতে চললেন। পিসিমা খুব হাসলেন। তার ফলে কেকরাডিহির দণ্ডীবাবার প্রতি আমার ভক্তিটা ক্রমশ বেড়ে গেল। এই হাসিখুশিটা খুব শুভ লক্ষণ বইকী।
মাইল দশেক চলার পর কেবলরাম বলল,-এবার কাঁচা রাস্তা দাদাবাবু!
কাঁচা মানে কাঁচা। জীবনে এমন অখাদ্য রাস্তায় কখনও গাড়ি চালাইনি। ভয় হচ্ছিল, গাড়ি না বিগড়ে যায়। আরও মাইল চারেক এগিয়ে পড়ল বদিকে একটা বিশাল ডাঙাজমি। ঘুটিং কাকড় যত, তত ছোটবড় পাথরের টুকরো। বাংলা বিহারের সীমান্ত এলাকা এটা। কেবলরাম চেঁচিয়ে উঠল,–এইখানে! এইখানে! গাড়ি থামালুম।
কেবলরাম মাঠের ওধারে একটা গ্রাম দেখিয়ে বলল,–এই হল গে কেকরাডিহি, দাদাবাবু। আর এই হল গে দণ্ডীবাবার থান।
ভবভূতি বললেন,–থান? কোথায় থান?
একটা বাজপড়া ন্যাড়া তালগাছ দেখিয়ে কেবলরাম টিপ করে প্রণাম করল। রাঙাপিসিমাও তার দেখাদেখি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। ন্যাড়া তালগাছের পেছনে একটা মস্ত বড় পাথর রয়েছে। কেবলরাম বলল,-বাবার ভোগ রাখতে হবে ওই পাথরটার ওপর। আর বাবা উড়ে এসে বসবেন ওই মুড়ো তালগাছটার মাথায়। এসে যখনই কাকা করে ডাকবেন তখন ওনাকে সব বলতে হবে।
ভবভূতি বললেন, বাবার ভোগটা কী হে কেবলচন্দ্র?
–আজ্ঞে হঁদুর। মরা হলে চলবে না। জ্যান্ত চাই। লেজে সুতো বেঁধে পাথরটার ওপর রাখতে হবে। পালাতে পারবে না। সুতোটায় এক টুকরো পাথর চাপা দিয়ে রাখলেই চলবে।
পিসিমা ব্যাগ থেকে পাঁচটা টাকা বের করে বললেন, তুই তাহলে শিগগির ইঁদুর নিয়ে আয় বাবা।
কেবলরাম টাকাটা ফতুয়ার পকেটে ঢুকিয়ে বলল, আপনি থানের সামনে গে বসুন পিসিমা। হাতজোড় করে চোখ বুজে বসে থাকবেন। ভাগ্যে দর্শন থাকলে পাবেন-শইলে পাবেন না। আমার কোনও দোষ নেই। বলেছিলুম, বারবেলা তিথি নক্ষত্র দেখে আসতে হবে।
পিসিমা বললেন,–তুই যেন শিগগির ভোগ নিয়ে আসবি। দেরি করিসনে বাবা!
কেবল যেতে-যেতে বলল, যাব আর আসব। নেতাইদার ঘরে ইঁদুর পোষা আছে না? লোকেরা হরদম কিনে এনে ভোগ দিচ্ছে বাবাকে।
সে চলে গেলে পিসিমা লাঠি ঠুকঠুক করে ন্যাড়া তালগাছটার গুঁড়ির কাছে গিয়ে করজোড়ে বসে পড়লেন। ভবভূতি চারদিকটা দেখে নিয়ে বললেন,–দেখি, কোথাও শিকার পাই-টাই নাকি।
উনি বন্দুক বাগিয়ে সামনে ছোটবড় পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। গ্রীষ্মের বিকেল। কিন্তু খোলামেলা জায়গা বলে হু হু করে বাতাস বইছে। গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। দৃষ্টি তালগাছের মাথার দিকে। উঁহু মাথাই নেই তালগাছটার। একেবারে কবন্ধ। এখন শুধু ভাবনা, কেবলরাম ভোগ আনবার আগে বাবা এসে পড়লে পিসিমা কীভাবে ঠেকিয়ে রাখবেন।
একটু আনমনা হয়েছিলাম। হঠাৎ কানে এল ভরাট গম্ভীর গলার ডাক, গা গা গা! তাকিয়ে দেখি তালগাছের বাজপড়া ডগায় কখন এসে গেছে এক দাঁড়কাক। পেন্নায় চেহারা। আর সে কী ডাক! কা কা নয়–একেবারে গা গা গাও গাও!
পিসিমা নিশ্চয় গাও গাও শুনেই ভজন গাইতে শুরু করেছেন। ভারি মিঠে গলা তো রাঙাপিসিমার! উনি যে এত সুন্দর গান গাইতে পারেন, জানতুম না তো!
দণ্ডীবাবা মুগ্ধভাবে বসে গান শুনছেন মনে হল। কিন্তু কেবলরাম আসছে না কেন? বাবা যদি রাগ করে চলে যান? পিসিমা যেন ওঁকে ঠেকিয়ে রাখতেই ভজন লম্বা করে চলেছেন। পিসিমার বুদ্ধিসুদ্ধি আছে বলতে হয়। যখনই দম নিতে থামছেন, দণ্ডীবাবা ডেকে উঠছেন,–গা গা! গাও গাও!
এক সময় পা টিপেটিপে কেবলরাম এসে পড়ল। তার হাতে মোটা সুতোয় বাঁধা তিনটে নেংটি ইঁদুর ঝুলছে অথবা দুলছে। সুতো বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কেবলরামের ঝাঁকুনি খেয়ে ফের লম্বা হয়ে পা ছুঁড়ছে। লেজ নাচাচ্ছে।
সে ভক্তিভরে সাবধানে হামাগুড়ি দিয়ে পিসিমার কাছে ভোগ পৌঁছে দিতে গেল। এখন একটাই সমস্যা। পিসিমার ইঁদুর-আরশোলাতে বড্ড ভয়। কেবলরাম অবশ্য সেটা জানে। কিন্তু পিসিমার কাছাকাছি ভোগ রাখলে পিসিমা কতটা সামলাতে পারবেন জানি না। উত্তেজনায়-উদ্বেগে তাকিয়ে রইলুম।
ইঁদুর তিনটে দেখামাত্র পিসিমার গান থেমে গেল। তিনি ইশারায় কেবলরামকে দূরে ওগুলো রাখতে বলছেন এবং সেই সঙ্গে হাউমাউ করে দণ্ডীবাবার উদ্দেশে বলছেন, ভয়ঙ্কর, ভয়ঙ্কর স্বপ্ন বাবা! বড়-বড় রাক্ষস-খোক্ষস! হাঁ করে গিলতে আসে। আর একটা কালো কুচ্ছিত পেত্নি বাবা, সাদা থানের কাপড় পরে আমাকে ভেংচি কাটে। গাল দেয়। আমি কোনও দোষ করিনি বাবা, তবু আমাকে গালমন্দ করে। শোনো বাবা, একটা-দুটো নয়–সাত-সাতটা ভালুক এসে নাচে। আমার দম আটকে যায় বাবা!
দণ্ডীবাবা ডানা চুলকোচ্ছেন ঠোঁট দিয়ে। তারপর হঠাৎ ওপাশে ঘুরে কী যেন দেখতে থাকলেন। এবার ইঁদুর তিনটে দেখিয়ে মরিয়া হয়ে কেবলরাম চেঁচাল, ইদিকে দেখুন বাবা! ভোগ এনেছি আপনার!
