কেংকেলাস দারোগা মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে বললেন, ভালো। খুশি হলাম তোমাকে দেখে। কোন ক্লাস পড়ছ?
গদাধর জবাব দিতে যাচ্ছে, হঠাৎ দূরে সেই খনির গর্তের কাছে কারা চেঁচিয়ে উঠল,–চোর! চোর! চোর! অমনি কেংকেলাস দারোগা ফুটবলের মতো শূন্যে উঠে সেদিকে হাইকিক হয়ে চলে গেলেন।…
.
আবার বাধা পড়ল। গদাধরবাবু হার্টের রুগি। ডাক্তারবাবু এসে পড়লেন ইঞ্জেকশন দিতে। গদাধর বললেন, আজকের মতো এই তোমরা এখন এসো ভায়া। মঞ্জু, ঠামাকে ডাক।…
সবাই উঠলেন। যেতে-যেতে গোঁসাই বলে গেলেন! কেংকেলাসই বটে। কাকে বললেন, কে জানে।
কেকরাডিহির দণ্ডীবাবা
কেবলরাম বলল, যখন-তখন গেলেই হল না মাঠান! বারবেলা তিথি নক্ষত্র বলে কথা আছে না? ঠিক সময় গেলে তবে দর্শন পাবেন।
রাঙা পিসিমা মুখ ভার করে বললেন,–যখনই বলি, তোর খালি ওই এক কথা। এদিকে রোগ বাড়তে বাড়তে মাথায় ঠেকেছে। কখন একটা কিছু সর্বনাশ হয়ে গেলেই হল। বাড়ির লোকের আর কী? আমার মরার পথ তাকিয়েই আছে সবাই। হাড় জুড়বে সব্বাইকার!
এমন কথা শুনে আর চুপ করে থাকা যায় না। বললুম,–ও কী বলছেন। পিসিমা। চলুন, আজই আপনাকে নিয়ে বেরুব।
কেবলরাম মাথা চুলকোতে-চুলকোতে মুখ বেজার করে বেরিয়ে গেল। পিসিমা আশ্বস্ত হয়ে লাঠি ঠুক ঠুক করে নিজের ঘরে গেলেন। কোণার দিকে চেয়ারে বসে ভবভূতি চুরুট টানছিলেন আর পুরোনো কাগজ পড়ছিলেন। এবার বললেন, কারও অসুখ-বিসুখ করেছে মনে হচ্ছে?
বললুম, আবার কার? রাঙা পিসিমার।
–কী অসুখ?
–বোঝা যাচ্ছে না ঠিক।
–ধুস! লক্ষণ-টক্ষণগুলো কী?
–এই ধরুন, রাত্তিরে ভালো ঘুম হয় না। যেটুকু হয়, সেটুকু নাকি ভয়ঙ্কর স্বপ্নে ভরা। কখনও দেখেন, রাক্ষস আসছে হাঁ করে তেড়ে। কখনও দেখেন, সাতটা ভালুক এসে দাঁত বের করে বেজায় ঝগড়াঝাটি করছে। এইসব আর কী!
ভবভূতি একটু হেসে বললেন,–ও কিছু না। বদহজম। হজমি ওষুধ খাইয়ে দিও।
বিরক্ত হয়ে বললুম, হজমি ওষুধ! গিয়ে দেখুন না ঘরভর্তি খালি নানারকম হজমি ওষুধের শিশি।
ভবভূতি চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–তোমার পিসিমার বয়স হয়েছে তো! এ বয়সে অমন হয়েই থাকে। আমার বারাসতের মাসিমার অবস্থা দেখলে তো চমকে উঠতে। বেশ বসে আছেন। হেসে কথা বলছেন। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠতেন, কী রে বংশীবদন? চল্লি কোথায়? জিগ্যেস করলে বলতেন, ওই আমাদের ঘুঘুডাঙার বংশী। বড় ভালো ছেলে ছিল। আহা! সাপের কামড়ে এই বয়সেই বেচারা মারা পড়ল।
ভবভূতি হাসতে লাগলেন। তারপর বললেন,–তা পিসিমাকে কোথাও নিয়ে যাবে বুঝি? কোনও বড় ডাক্তারের সন্ধান পেয়েছ?
ভবভূতিবাবু লোকটিই এমন। কান করে কিছু শোনে না। বললুম,–পেয়েছি।
–কোথায় শুনি?
–কেকরাডিহিতে।
–কেকরাডিহি? সে আবার কোথায় হে?
–কেবলরামের দেশ।
ভবভূতি নাক সিঁটকে বললেন, হুঃ! নিশ্চয় বেহদ্দ পাড়াগাঁ। তোমাদের কেবলচন্দ্রটিকে দেখলেই বোঝা যায়, তার দেশটা কেমন। তা সেখানে বুঝি কোনো ওঝাটোঝার খবর পেয়েছ?
–কতকটা তাই জ্যাঠামশাই। তবে তিনি মানুষ নন।
ভবভূতি চমকে উঠে বললেন,–আঁ! মানুষ নন! তবে কী–
–পক্ষী।
পক্ষী! মানে পাখি? –ভবভূতি খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। –পাখি করবে মানুষের চিকিৎসা! ওই ব্যাটা কেবলচন্দ্রটা বলেছে বুঝি? যেও না হে, মারা পড়বে।
গম্ভীর হয়ে বললুম, জ্যাঠামশাই। ব্যাপারটা বলি শুনুন। কেকরাডিহি গ্রামের কাছে একটা পোডড়া মাঠ আছে নাকি। সেখানে মাঝে-মাঝে একটা দাঁড়কাক আসে কোত্থেকে। মানুষের ভাষায় কথা বলে। রোগিদের রোগের কথা শুনে ওষুধ দেয়। কীভাবে খেতে হবে, তাও বলে দেয়।
ভবভূতি আরও হেসে বললেন, দাঁড়কাকটার সঙ্গে একটা ওষুধের বাকসোও থাকে বুঝি?
–না, না। কথাটা শুনুন আগে। রোগের কথা আঁতিপাতি জিগ্যেস করে দাঁড়কাকটা উড়ে যায়। চক্কর মেরে কোত্থেকে ঠোঁটে করে একটা শেকড়বাকড় নিয়ে আসে।
ভবভূতির চুরুট নিভে গিয়েছিল! ফের দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে ঠোঁটে চুরুট থাকা অবস্থায় বললেন,–গাঁজা! তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–গুল! শেষে বললেন,–বেঘোরে মারা পড়বে। যেও না।
তারপর যেন খাপ্পা হয়েই বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু দুপুরবেলা যখন গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছি সবে, দেখি ভবভূতি সেজেগুজে হন্তদন্ত হয়ে হাজির। মাথায় ফেল্ট টুপি, গায়ে বুশশার্ট, পরনে ব্রিচেসের মতো আঁটো প্যান্ট, পায়ে হাটিং বুট এবং কাঁধে কিটব্যাগ, পিঠে বন্দুক। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে একগাল হেসে বললেন,–চলল, আমিও যাই সঙ্গে। অনেকদিন শিকার-টিকার করিনি। হাতটা সুড়সুড় করছে।
রাঙাপিসিমা খুশি হয়ে বললেন, ভবদাকে পেয়ে মনে জোর এল। পাড়াগাঁয়ে আজকাল বড্ড নাকি ডাকাতের উপদ্রব।
ভবভূতি নাদুস-নুদুস হুঁড়িওয়ালা প্রকাণ্ড মানুষ কিন্তু বেজায় বেঁটে। আমার পাশে বসে বললেন, ক্যাবলা, পেছনে যা। কেবলপেছনে পিসিমার কাছে গিয়ে বসল। তারপর ভবভূতি বললেন, হ্যাঁ রে কেবলচন্দ্র, তোদের ওখানে বাঘ-টাঘ নেই?
কেবলরাম একগাল হেসে বলল,–নেই কী, তাই বলুন ছার।
ছার শুনে রাঙাপিসিমা খিকখিক করে হেসে উঠলেন। আমার ভালোই লাগল। অনেককাল পিসিমাকে হাসতে দেখিনি। ভবভূতি বললেন,–বাঘ আছে বলছিস? কিন্তু বাঘ মারা আজকাল যে বেআইনি। বাঘ মারব না। বরং দু-চারটে পাখিটাখি মারব।
