গোঁসাই বললেন,–অভ্রের?
হ্যাঁ, অভ্রের বলে গদাধরবাবু চোখ বুজলেন আবার। একটু-একটু দুলতেথাকলেন। এমন সময় ওঁর নাতি আর নাতনি, মুকুল আর মঞ্জুও এসে জুটল। তাদের সঙ্গে গদাধরের চাকর তিনকড়ি একটা ট্রে সাজিয়ে চা-চানাচুর আনল। সঙ্গে সঙ্গে খুব জমে উঠল আড্ডা।
মুকুল বলল, কীসের গল্প দাদু? ভূতের, না রাক্ষসের? আমি ভূতেরটা শুনব।
মঞ্জু বলল,-না, না দাদু। আমি শুনব রাক্ষসের।
গদাধর একটু হেসে বললেন, তাহলে চুপটি করে বোসো৷ গল্প নয়—একেবারে সত্যি ঘটনা। ভূতেরও বলতে পারো, রাক্ষসেরও বলতে পারো।
গোঁসাই ফিক করে হেসে বললেন,–তাহলে সন্ধি করে নাও। ভূত্রাক্ষসের গল্প। ভূত্রাক্ষস নিশ্চয় সাংঘাতিক ব্যাপারই হবে।
তুমি থামো তো!–ধমক দিয়ে গদাধর ফের শুরু করলেন। চায়ে চুমুক দিতেও ভুললেন না। ঘরে এখন শুধু চানাচুরের মুচমুচে শব্দ আর চায়ের সুড়সুড়! কে জানে কেন, মুকুল আর মঞ্জু দাদু আর তাঁর বন্ধুদের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপিচুপি হাসতে থাকল। কিন্তু সে হাসি মিলিয়ে যেতে দেরি হল না অবশ্য।
গল্পটা আর গদাধরবাবুর মুখের কথায় না সাজিয়ে চলতি কায়দায় বলা যাক।…
.
তো কিশোর বয়সি গদাধর আর ভূতনাথ একদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বেরিয়ে পড়ল সিন্দ্রির মাঠে। সেই পোড়ো অভ্রখনি দেখতে।
এখন সিন্দ্রিতে সার কারখানা হয়েছে। কত সব ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, লোকজন। বিশাল এলাকা জুড়ে শহর গড়ে উঠেছে। কিন্তু তখন একেবারে খাঁ-খাঁ মাঠ আর কোথাও-কোথাও জঙ্গল। কোথাও আদিবাসীদের বসতিও ছিল।
১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক ইংরেজ ওই অখনির মালিক ছিলেন। খনির সব অভ্র শেষ হয়ে গেলে দুবছর পরেই তিনি খনিটা ছেড়ে দেন। সুদূর ভাগলপুরের এক রাজা নাকি ছিলেন ওইসব জমির মালিক। লিজ করা জায়গা আবার ফিরে এসেছিল সেই রাজার হাতে। তার কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে আদিবাসীরা খনির ওপরকার জমিতে চাষবাস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ফসল কাঁচা থাকতেই শুকিয়ে যেত। সব মেহনত বরবাদ। অগত্যা জমি ছেড়ে দিয়েছিল তারা। জঙ্গল-ঝোঁপঝাড় গজিয়ে গিয়েছিল আবার। তারই নিচে সুড়ঙ্গ আর পাতালপুরীর মতো পোড়োখনিটা রয়েছে।
গদাধর আর ভূতনাথ সেখানে গিয়ে হাজির হল।
ভূতনাথ বলল,-পোড়ো-খনিটার তিনটে মুখ আছে। আমি দুটোর মধ্যে ঢুকে অনেকটা দূর অবধি দেখে এসেছি। ভীষণ অন্ধকার কিন্তু। টর্চ ছাড়া যাওয়া যায় না। সেজন্যেই টর্চ এনেছি। আজ তোমাকে নিয়ে তৃতীয় সুড়ঙ্গটায় ঢুকব চললো।
তৃতীয় মুখটা ঘন ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে একটা ঝাকড়া বটগাছের হাত বিশেক দূরে। মুখটা আন্দাজ হাত পনেরো চওড়া। দুজনে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে ধরে অতি কষ্টে নামল।
বর্ষার জল তখন জমে আছে ডোবার মতো। সেই জলের ধার দিয়ে ওরা সুড়ঙ্গের দরজায় পৌঁছল। গদাধরের কেন যেন গা ছমছম করে উঠল। ভেতরটা কী অন্ধকার! টর্চ জ্বেলে আগে ঢুকল ভূতনাথ, পেছনে গদাধর।
সুড়ঙ্গটা বেশ চওড়া আর উঁচু। কিছুটা যেতেই হঠাৎ পোড়া গন্ধ লাগল নাকে। মনে হল ভেতরে কোথাও কে উনুন জ্বেলেছে যেন।
ভূতনাথ ফিসফিস করে বলল,-বুঝেছি। বাছাধনের ওই সুড়ঙ্গ দুটো পছন্দ হয়নি। এই তিন নম্বরে এসে জুটেছে।
গদাধর বলল,–কে? কার কথা বলছ ভুতু?
ভূতনাথ টর্চ নিভিয়ে বলল, কে জানে! ব্যাটার চেহারা বড় বিচ্ছিরি। একেবারে মামদো ভূতের মতো। আধপোড়া মাংস খায়। তবে ওকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর টর্চ জ্বালব না। তুমি আমাকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে এসো।
ঘুরঘুট্রি অন্ধকার। মাঝে-মাঝে মাকড়সার ঝুল জড়িয়ে যাচ্ছে গদাধরের মাথায়। আর কেমন বিচ্ছিরি গন্ধ। পায়ে গুঁতো মেরে কী একটা জন্তু দৌড়ে যেতেই গদাধর চেঁচিয়ে উঠেছিল আর কী! ভূতনাথ বলল, চুপ, চুপ। স্পিকটি নট।
কিছুটা এগোতেই বোঝা গেল সুড়ঙ্গটা ডাইনে ঘুরেছে। তারপর গদাধর যা দেখল, ভয়ে বিস্ময়ে মুখে কথা সরল না।
একটা মানুষ নাকি, মানুষই নয়–ভূতুড়ে চেহারা, সামনে গনগনে লাল আগুনের অঙ্গার থেকে একটা খেঁকশিয়ালের মতো খুদে জন্তু পুড়িয়ে কড়মড় করে খাচ্ছে। আগুনের ছটায় আবছা তার ভয়ংকর চেহারাটা ফুটে উঠেছে।
দুজনে বসে পড়েছিল চুপচাপ। একটু পরে কে জানে কেন, গদাধরের প্রচণ্ড হাঁচি পেল। কিছুতেই সামলাতে পারল না। হ্যাঁচ্চো করে একখানা জব্বর হাঁচি ঝেড়ে দিল।
অমনি ভুতুড়ে চেহারার সেই পোড়ামাংসখেকোটা এদিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে গর্জে উঠল চেরাগলায়–কেঁ রেঁ?
ওরে বাবা! ভূত নাকি নাকিস্বরে কথা বলে। তাহলে এ ব্যাটা সত্যি ভূত। গদাধর ঠকঠক কঁপতে শুরু করেছে।
কিন্তু ভূতনাথের গ্রাহ্য নেই। টর্চ জ্বেলে তার মুখের ওপর ফেলে বলল, ও কী খাচ্ছ মামা? খেঁকশিয়াল, না খরগোশ?
হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ! –সে কী পিলে চমকানো হাসি! ওই হাসি হেসে সে নাকিম্বরে বলল,–কেঁ রেঁ? ভুঁতুঁ নাঁকি? আঁয়, আঁয়!
বলে সে একটা কাঠ গুঁজে দিল আগুনে। হু-হুঁ করে জ্বলে উঠল কাঠটা। তার ফলে আলো হলো প্রচুর। ভূতনাথ গদাধরকে টেনে নিয়ে গিয়ে একটু তফাতে বসল।
–ওঁটা কেঁ রেঁ?
ভূতনাথ বলল, আমার বন্ধু গদাই। তোমাকে দেখতে এসেছে, মামা।
আবার হিঁ হিঁ করে হেসে সে বলল, আঁমাকে দেঁখবি? তঁবে ভাঁলো কঁরে দ্যাঁখ! এঁই দ্যাঁখ!
বলেই সে গদাধরের চোখের সামনে একটা প্রকাণ্ড কালো বাদুড় হয়ে ছাদ আঁকড়ে ধরে দিব্যি দুলতে শুরু করল। গদাধর হাঁ করে তাকিয়ে আছে তো আছে। ভূতনাথের কাধ আঁকড়ে ধরেছে নিজের অজান্তে। কাঁপুনি সামলাতে পারছে না। এ কি সম্ভব!
