ভূতনাথ হাসতে-হাসতে বলল, খুব হয়েছে মামা। তোমার খাবার পড়ে রইল যে। এক্ষুনি কেংকেলাস এসে মেরে দেবে!
অমনি বাদুড়বেশী কিম্ভুত সেই প্রাণীটি ধুপ করে পড়ল। পড়ে আবার আগের চেহারা নিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, কঁ, কঁ?
–কেংকেলাস এসে তোমার খাবার খেয়ে ফেলবে। ঝটপট শেষ করে নাও।
–ইঁস! কেঁংকেলাসকে তাঁহলে কুঁলে আঁছাড় মাঁরব নাঁ?
–পারবে না মামা। তার গায়ের জোর তোমার চেয়ে ঢের বেশি।
সে কোনও কথা না বলে কড়মড়িয়ে খুদে প্রাণীর রোস্টটা সাবাড় করতে ব্যস্ত হল। মাথাটি চিবিয়ে খাবার পর তৃপ্তিতে একটু ঢেকুর তুলে বলল, হ্যাঁ রে
–বলল মামা।
–কেঁংকেলাস কোথায় থাকে বেঁ?
–ওপরের বটগাছটায়। সেদিন শুনলে না? কেমন মনের আনন্দে ঠ্যাং ঝুলিয়ে গান গাইছিল!
গদাধরের মনে হল, মামদোটা কেমন মনমরা হয়ে গেল এই শুনে। হওয়ারই কথা। ওরা সুড়ঙ্গের মধ্যে যেখানে বসে আছে, হয়তো তার ছাদের ওপাশেই সেই বটগাছটা।
সে ভূতনাথের কথা শুনে বেজার মুখে বলল,–উঁতু! তাহলে আঁমি রং আঁন্য কোথাও চলে যাই রে।
তাই যাও মামা-ভূতনাথ বলল, চাসনালার ওখানে একটা পোড়া কয়লাখনি . আছে। সেখানে মনের সুখে থাকো গে!
নাঁ বেঁ! কয়লাখনির দিকে গেলেই আঁমি কালো হয়ে যাব। বলে মামদো তার লিকলিকে হাতের চামড়া থেকে ময়লা রগড়াতে থাকল।
ভূতনাথ বলল, এই সেরেছে! ও মামা, মনে হচ্ছে এই অভ্রখনির আসল বাসিন্দা ভদ্রলোক এসে পড়েছেন, পালাও, পালাও!
দুমদাম পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ক্রমশ শব্দটা এদিকেই আসছে। একবার ঘুরে অন্ধকারটা লক্ষ করেই মামদোটা চোখের পলকে একটা প্রকাণ্ড চামচিকে হয়ে গেল এবং সনসন করে গদাধরের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে পালিয়ে গেল। কী বিচ্ছিরি গন্ধ তার গায়ের।
গদাধরের গালে একটুখানি ঠেকে গিয়েছিল সেই চামচিকের ডানার ডগাটা। আর তাই থেকেই এখন একটা মস্ত আঁচিল হয়ে গেছে।
তো একটু পরে বেঁটে গোলগাল গাঙফড়িং-এর ডানার মতো সাদা রঙের একটা মানুষ কিংবা মানুষ নয়, এমন এক প্রাণী এসে দাঁড়াল আগুনের কুণ্ডটার পাশে।
তার চুলগুলো খোঁচা-খোঁচা, লাল। গোঁফও তেমনি। কানদুটো প্রকাণ্ড। বড় বড় গোল চোখ। সে ভারিক্তি গলায় বলল,-কে রে তোরা?
ভূতনাথ গদাধরকে চিমটি কেটে সেলাম ঠুকল। গদাধরও বুঝল, তাকেও সেলাম ঠুকতে হবে। ভূতনাথ বলল, দাদামশাই, আমি ভুতু। আর এ আমার বন্ধু গদাই।
–আমার ঘরে তোরা কোন মতলবে রে?
ভূতনাথ বিনীতভাবে এবং চাপাগলায় বলল, দাদামশাই, তোমায় সাবধান করতে এলাম। কেংকেলাস তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
অমনি কিম্ভুত প্রাণীটা চাপাগলায় বলে উঠল, কে, কে?
–কেংকেলাস, দাদামশাই।
এই আজব জীবটি কেংকেলাস শোনামাত্র থপথপ করে দৌড়ে যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ভূতনাথ হাসতে-হাসতে বলল, খুব ভয় পেয়ে গেছে।
গদাধর এতক্ষণে জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল,–কেংকেলাস কে। কিন্তু সুযোগই পেল না। খনিমুখের দিকে আবছা চাচামেচি শোনা গেল।
তারপর কারা দৌড়ে আসছে মনে হল।
গদাধর হাঁ করে তাকিয়ে দেখল, গোটা পাঁচেক মানুষ কিংবা মানুষ নয় গোছের আজব প্রাণী এসে তাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে আগুনের কুণ্ডটার দিকে ঝুঁকে রইল।
মাথায় তিন ফুট থেকে চার ফুট উঁচু এই জীবগুলো কালো পাকাটির মতো। কাঠির ডগার মুণ্ডু বসালে যেমন হয়, তেমনি। কিন্তু হাত-পা আছে দস্তুরমতো। চোখগুলো ড্যাবড়েবে, লালচে। গোঁফও আছে। তারা চ্যাঁ-চ্যাঁ করে কী বলছে, বোঝা যাচ্ছিল না। মনে হল, সেই মামদোর এটো চিবুনো হাড়গুলো খুঁজছে তারা।
তারপর তাদের চোখ পড়ে গেল ভূতনাথদের দিকে। অমনি পাশটিতে দাঁড়িয়ে গেল। একসঙ্গে আঙুল তুলে এদের দিকে শাসানির ভঙ্গিতে বলতে লাগল, মুন্ডু খাব, ঠ্যাং খাব! ঘিলু খাব, ফুসফুস খাব। কলজে খাব, পিলে খাব। চোখ খাব, নাক খাব।
ভূতনাথ হাসতে-হাসতে বলল,–আর দাঁত? দাঁতগুলো খাবিনে?
সঙ্গে সঙ্গে তারা আবার একসঙ্গে বলে উঠল, দাঁত খাব, দাঁত খাব।
ভূতনাথ কী বলতে যাচ্ছে, গদাধর ততক্ষণে ওইসব খাওয়ার শাসানি শুনে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বলে ফেলল,–কেংকেলাস আসছে! কেংকেলাস!
ব্যস! কাজ হয়ে গেল। প্রাণীগুলি অমনি চাঁ-া করতে করতে যে-যেদিকে পারল, অন্ধকারে পালাতে শুরু করল।
তিন ফুট উঁচু যেটা, সে ধাক্কা খেয়ে গড়িয়ে পড়ে ঊ্যা করে কেঁদে উঠেছিল। একজন এসে তাকে টানতে-টানতে নিয়ে পালাল।
ভূতনাথ বলল, বাঃ গদাই! তাহলে কেংকেলাসের মর্ম পেয়ে গেছ।
গদাধর ততক্ষণে অনেকটা সাহসী হয়েছে। বলল, ভাই ভুতু, আন্দাজে কিংবা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কেংকেলাস ব্যাপারটা কী? ওটা শুনেই ওরা পালিয়ে যাচ্ছে কেন?
ভূতনাথ বলল, যাদের দেখলে, এরা হল গিয়ে পোডো-খনির ভূত। কেংকেলাস তাদের থানার দারোগাবাবুর নাম।
গদাধর অবাক হয়ে বলল, আঁ! ভূতের আবার দারোগা! থানা-পুলিশ!
ভূতনাথ আগুনের কুণ্ডে একটা শুকনো কাঠ ফেলে বলল,-বাঃ! ওদের বুঝি থানা-পুলিশ থাকতে নেই? না থাকলে চলবে কেন? ভূতদের মধ্যে চোর-ডাকাত নেই বুঝি? চোর-ডাকাত থাকলেই পুলিশ থাকবে। সেই ভৌতিক পুলিশের দারোগাবাবুর নাম কেংকেলাস। খুব জাদরেল দারোগা।
গদাধর বলল,-বুঝলাম। কিন্তু তুমি কেমন করে জানলে ভাই ভুতু?
ভূতনাথ হাসতে-হাসতে বলল, আমার নাম ভূতনাথ ওরফে ভুতু। আমি ভূতের খবর জানব না তো কে জানবে?
