বৈকুণ্ঠ অবাক হয়ে বললেন, সব ঠিক। কিন্তু তুমি কেমন করে জানলে?
কৃতান্ত আরও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কাঁচারাস্তার মোড়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ আছে।
–আছে বইকী। খুব পুরোনো আমলের বটগাছ। পাঁচশো বছর–
–তোমাদের কঁকুলের পাশে আঁদুল নামে একটা গ্রাম আছে?
–হুঁ, আছে। কিন্তু তুমি–
কৃতান্ত সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন,–দেখো বৈকুণ্ঠ, আমার মনে হচ্ছে, কোনও গোলমেলে ধাঁধায় আটকে গেছি। স্বপ্নের গোলকধাঁধা বলতে পারো। কিংবা এমনও হতে পারে, আমি আর বেঁচে নেই। পরলোকে চলে এসেছি।
বৈকুণ্ঠ হোহো করে হেসে বললেন,–মাথা খারাপ! কী সব আবোল-তাবোল বলছ!
–তাহলে আমায় একটা চিমটি কাটো তো।
বৈকুণ্ঠ বললেন, নাঃ! আমার আঙুলে জোর নেই। তবে কাতুকুতু দিতে পারি। দেব নাকি!
–তাই দাও দিকি ভায়া।
বৈকুণ্ঠের কাতুকুতু খেয়ে কৃতান্ত হিহি করে হেসে আকুল হলেন। নাঃ আর স্বপ্ন নয়। নিশ্চয়ই নয়। তাহলে ঘুম ভেঙে যেত।
কিন্তু স্বপ্নে সত্যিকার একটা জায়গা দেখলেন–এর রহস্য কী? হঠাৎ চোখ গেল বালিশের পাশে রাখা বইটার দিকে। তক্ষুনি বুঝলেন কী ঘটেছে। সব মনে পড়ল। কৃতান্তবাবু নিশ্চিন্ত হয়ে নড়েচড়ে বসলেন। বাপস! জোর বাঁচা গেল।
বুঝলেন বৈকুণ্ঠও। তিনিই বইটা তুলে নিয়ে দেখে বললেন,–তাই বলো। ওমালি সায়েবের পুরোনো জেলা গেজেটিয়ার পড়ছিলে রাত্রে?–এই যেআমাদের এলাকার ঐতিহাসিক বিবরণও আছে দেখছি। পাতা মুড়ে রেখেছ। বুঝলে ভাই কেতো? কঁকুলে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক জায়গা। গুপ্তযুগে একসময় এক রাজার রাজত্ব ছিল। তার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আছে। পাঁচশো বছরের অক্ষয় বটগাছ আছে। কত কী আছে। দিঘির ধারে শ্মশানটারই বয়স দুশো বছর হয়ে গেল।
কেংকেলাস
গদাধরবাবু বললেন, আমার ধানবাদের পিসিমাকে তো তোমরা দেখেছ। পিসিমার খুড়শ্বশুরের নাতির নাম ছিল অশ্বিনী। অশ্বিনীর সম্বন্ধীয় মাসতুতো দাদা হল গিয়ে নগেন। নগেনের মেজকাকার বড় ছেলে নিবারণ। নিবারণের শ্যালক হরেনের ছেলের নাম সত্যেন। সত্যেনের ভগ্নিপতির পিসতুতো ভাইয়ের…
সাতকড়ি গোঁসাই খেপে গিয়ে বললেন,–মলো ছাই! হলটা কী, তা বলবে না। খালি কার পিসি, কার দাদা, কার শ্যালক!
রমণী মুখুয্যে বললেন,–আহা! বলতে দাও, বাধা দিচ্ছ কেন? খোলাখুলি পরিচয় না দিলে বুঝবে কেন তোমরা? বলল হে গদাইভায়া, বলো।
গদাধর কিন্তু গোঁসাইয়ের ওপর চটেছেন বাধা পড়েছে বলে। বাঁকামুখে বললেন, আর বলব না।
অমনি হইচই উঠল আড্ডায়। রমণীবাবু, বটকুবাবু, বংশীলোচনবাবু একসঙ্গে বলে উঠলেন, বলো, বলল। আমরা শুনব।
একঘরে হয়ে যাচ্ছেন টের পেয়ে অগত্যা গোঁসাইও মিনমিনে গলায় বললেন,–আহা! গল্পের রস বলে একটা কথা আছে তো! তাই বলছিলাম, শর্টকাটে এলে রসটা জমে ভালো। গদাই, কিছু মনে কোরো না ভায়া। নাও, শুরু করো।
তখন গদাধর তার উল্লেখযোগ্য আরামকেদারায় একটু চিতিয়ে চোখ বুজে হঠাৎ বললেন,-কেংকেলাস!
আড্ডার সবাই থ। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন পরস্পর। তারপর বটুকবাবুই প্রশ্ন করলেন, কী বললে?
–কেংকেলাস!
রমণীবাবু কৌতূহলী হয়ে বললেন, তার মানেটা তো বুঝতে পারলাম না গদাই! হঠাৎ কেং কৈলাস-টৈলাস…এর মানে?
গদাধর গম্ভীরমুখে বললেন,–কেংকৈলাস নয়, কেংকেলাস। গোঁসাই ওঁর দিকে ঝুঁকে বললেন,–কেংকেলাসটা কী শুনি?
গদাধর তেতোমুখে বললেন, তোমাদের মাথায় তো খালি গোবর পোরা। সহজে কিছু বোঝানো যাবে না। যার কথা বলতে যাচ্ছিলাম, কেংকেলাসের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তারই মারফত।
বংশীলোচনবাবু রাশভারী মানুষ। জমিদারি ছিল তার বাবার আমলে। এখনও সেই আমলের পাদানিওয়ালা কালো কুচকুচে ফোর্ড গাড়িটা আছে। সেটা হাঁকিয়েই এই আড্ডায় আসেন। তাকে সবাই খুব খাতির করেন। তিনি বললেন,–মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। শুরু করে গদাইভায়া।
গদাধর উৎসাহিত হয়ে বললেন, রহস্যময় মানে? রীতিমতো মিসট্রিয়াস। এই দেখো না! লোমগুলো কেমন সূচের মতো হয়ে গেল! দেখো, দেখো।
গোঁসাই বললেন, হ্যাঁ, ক্ষান্তপিসি অনায়াসে কথা সেলাই করতে পারবে। বলল, বলে যাও!
গদাধর ফের চটতে গিয়ে হেসে ফেললেন। বললেন, তুমি তো বরাবর অবিশ্বাসী। ভূত-ভগবান কি মানো না। তবে কেংকেলাসের পাল্লায় পড়লে ঠ্যালাটা বিলক্ষণ টের পেতে। যাকগে, তোমাকে কিছু বোঝানো বৃথা।
বলে একটিপ নস্যি নিয়ে বিকট একটা হচ্চো করে রুমালে নাক মোছর পর গদাধর বকসী শুরু করলেন।
–হ্যাঁ, কদ্দুর বলেছিলাম যেন? সেই সত্যেনের ভগ্নিপতির পিসতুতে ভাইয়ের নাম ছিল ভূতনাথ। এই ভূতনাথ বড় ডানপিটে সাহসী ছেলে ছিল। আর তখন আমার বয়স কম। আমার গায়েও তখন একটা খুদে পালোয়নের জোর। দুজনেই ক্লাস টেনের ছাত্র–তখন বলা হতো ফার্স্ট ক্লাস। তো সেবারে পুজোর ছুটিতে বেড়াতে গেছি ধানবাদ। ভূতনাথ আর আমি দিনরাত টো-টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছি এখানে-সেখানে। ওদিকে তো খালি খনি আর খনি। মাটির তলায় টন টন কয়লার চাঙড়। সেইসব কয়লা তোলা হচ্ছে সুড়ঙ্গ কেটে। আমি নতুন গেছি বলে ভূতনাথ ঘুরে-ঘুরে সব দেখাচ্ছে। ওর অনেক আত্মীয় খনিতে চাকরি করেন। তাই একেবারে খনির ভেতরে–মানে পাতালপুরীতে গিয়ে সব দেখছি-টেখছি। এইসময় একদিন হঠাৎ ভূতনাথ বলল,–গদাই, এখান থেকে মাইল পাঁচেক দূরে সিন্দ্রির ওদিকে মাঠের মধ্যে একটা পোড়োখনি আছে, যাবে সেখানে? আমি উৎসাহে চনমন করে উঠলাম। পোড়ো-বাড়ির মতো পোড়োখনিও যে থাকে জানতাম না কিনা। এইসব খনি থেকে খনিজ জিনিস তুলে শেষ করা হয়েছে। তারপর আর সেখানে কেউ যায় না। মাটির তলায় সুড়ঙ্গ, গুহা আর যেন পাতালপুরী শাখা করে। অবশ্য সেইসব পোড়োখনির মুখ বন্ধ করে দেওয়াই নিয়ম। কিন্তু ভূতনাথ যেটার কথা বলল, সেটা নাকি বন্ধ করা যায়নি। কেন যায়নি, সেটাই বড় রহস্যময়। যতবার বন্ধ করা হয়েছে, ততবার দেখা গেছে কে বা কারা মাটি-পাথর সরিয়ে ফেলেছে। তো এই খনিটা ছিল অভ্রের।
