–কী বললেন বাবু?
–বৈকুণ্ঠবাবু। কাকুলিয়ার বৈকুণ্ঠ তলাপাত্রের নাম শোনোনি?
লোকটা চোখ কপালে তুলে বলল,–বৈকুণ্ঠবাবু? মানে কাঁকুলের বোকা বাবুর কাছে যাবেন? ও বাবুমশাই, উনি যে গতকাল মারা গেলেন!
–অ্যাঁ! মারা গেছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ওনার ভাগ্নেবাবুরা কাল সন্ধেবেলা ওই শ্মশানে ওনাকে পুড়িয়ে গেলেন যে! বলে লোকটা দিঘির অন্যপাড়ে একটা ঝোঁপ ঝাড় ও শিমূলগাছের দিকে আঙুল তুলল।ওই যে দেখছেন, ওটাই শ্মশান।
কৃতান্তবাবু আস্তে-আস্তে ঘাটে বসে পড়লেন। তাহলে সত্যিসত্যি বৈকুণ্ঠের আত্মা বা ভূত কঙ্কালের রূপ ধরে দেখা দিয়েছিল তখন। তিনি প্রমাণ চেয়ে বসে খামোকা ঝামেলা বাধালেন।
আহা, বেচারা বৈকুণ্ঠকেও এন্তার ঘুসি মেরেছেন। না জানি কত ব্যথা সে পেয়েছে। বন্ধুর শোকে এবং তার ভূতের ব্যথা পাওয়ার দুঃখেও বটে, কৃতান্তবাবু কেঁদে ফেললেন, ওরে বোকা রে। তোকে খামোকা কেন অত ঘুসি মারলুম রে।…
লোকটা সহানুভূতি দেখিয়ে বলল, আহা! কাঁদবেন না বাবুমশাই। আমারও কান্না পাচ্ছে যে। কাকেও কাঁদতে দেখলে আমারও কান্না পায়।
তারপর সে-ও বিকট ভ্যাঁ করে উঠল।
সঙ্গে-সঙ্গে কৃতান্তবাবু উঠে থাপ্পড় তুলে তার গালে মারলেন।–আমার বন্ধুর মরেছে এবং ভূত হয়েছে আমি কাঁদতে পারি। তাই বলে তুই ব্যাটা কঁদবার কে?
কিন্তু থাপ্পড় মেরেই দেখলেন–এতক্ষণে দেখলেন যে যাকে থাপ্পড় মেরেছেন, সে আর কেউ নয়, স্বয়ং নেপাল। তার বউমার আদরের চাকর নেপু।
ব্যাপারটা কী—
.
ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়।
থাপ্পড় সত্যি তিনি নেপালচন্দ্রকেই মেরেছেন। তবে সেটা ওর গায়ে লাগেনি। লেগেছে চায়ের কাপে এবং কাপটা উল্টে গেছে। ঝনঝন শব্দ হয়েছে। বড়বউমা দৌড়ে এসেছে। নাতি-নাতনিরাও এসে পড়েছে।
নেপাল বলল,-দিলেন তো চা-টা ফেলে। অত ভালো চা সেই নিউমার্কেট থেকে খুঁজে আনলুম আপনার জন্যে। কাল সন্ধেবেলা বাজে চা খেয়ে বকাবকি করলেন বলে তক্ষুনি দৌড়েছিলুম নিউমার্কেটে। ভেবেছিলুম সকালবেলা কর্তাবাবুকে যদি ফাস্টকেলাস চা না খাওয়াতে পারি তো আমার নাম নেপালই নয়।
কৃতান্তবাবু ধড়মড় করে উঠে বসলেন।
হ্যাঁ, নিজের ঘরের খাটেই সব কিছু ঘটেছে। তবে আগে এখনই টেবিলে রাখা চিরকুটটা হাতসাফাই করা দরকার। সেই যে লেখা আছে? আমাকে বৃথা খুঁজিও না। পাইবে না। রাতে মনের দুঃখে লিখে রেখেছিলেন। ভোরবেলা কেউ ওঠার আগে কেটে পড়ার মতলব করে শুয়ে পড়েছিলেন। তারপর কত কী ঘটেছে। স্বপ্ন ভেবেছিলেন, কিংবা স্বপ্ন নয় তাও-ভেবেছিলেন এ সবই স্বপ্নের মধ্যে ভাবা।
চিরকুটটা মুঠোয় লুকিয়ে ফেলে কৃতান্ত ছেলেমানুষের মতো হাসলেন। বললেন, কী সব স্বপ্ন। স্বপ্নের মধ্যে হাত ছুঁড়ে চায়ের কাপ ফেলে দিয়েছি। বুঝলে বউমা?
বউমা হাসি চেপে চলে গেল। নাতি-নাতনিরা বলল, কী স্বপ্ন? কী স্বপ্ন দাদুভাই?
কৃতান্ত বললেন, শুধু কি স্বপ্ন? স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন। তার ভেতর স্বপ্ন। আয়নার ভেতর আয়না। তার ভেতর যেমন আয়না। বুঝলে তো?
এই সময় বাইরের ঘরে কে চড়া গলায় বলল,–কেতোভায়া, আছো নাকি?
কৃতান্ত আশ্বস্ত হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, এসো, এসো বৈকুণ্ঠ এসো। আজ রাত্রে কী হয়েছে শোনো। অদ্ভুত সব স্বপ্ন
বৈকুণ্ঠ ঘরে ঢুকে বললেন,–পরে শুনব ওসব। কই, তুমি তো গেলে না। সন্ধেবেলা কলকাতা এসেছি। এসেই ঠিক করেছিলুম সকালে তোমার বাসায় আসব। তা এত বেলা অবধি শুয়ে থাকো আজকাল? বাতে ধরবে যে।
কৃতান্ত হাসতে-হাসতে বললেন, আরে আগে স্বপ্নটাই শোনো না। দেখলুম, তুমি মারা গেছ আর
বৈকুণ্ঠবাবু হোহো করে হেসে বললেন,–এ তো আমার পক্ষে সুস্বপ্ন। কারুর মারা যাওয়ার স্বপ্ন দেখা মানেই তার আয়ু বাড়ল।
কৃতান্ত যতের মুঠো দেখছিলেন। কিন্তু ব্যথা করছে যে? স্বপ্নে ঘুসি মারলে তো ব্যথা লাগা উচিত নয়।
অবশ্য নেপালের চায়ের কাপে হাত ছুঁড়েছিলেন। কিন্তু তাতে ব্যথা হওয়ার কথাই ওঠে না। তাহলে?
কৃতান্তবাবু উদ্বিগ্ন হলেন। এবার যা দেখছেন, এও আগের স্বপ্নের মধ্যে আরেকটা স্বপ্ন নয় তো? যেমন আয়নার ভেতর আয়না, তার ভেতর আবার আয়না।
বৈকুণ্ঠবাবু বললেন, কী হল ভায়া? হাতে কী হল? ব্যথা নাকি? চলো, আমার সঙ্গে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো। আমাদের কাকুলিয়ায় ভালো কবরেজ আছেন। চিন্তা নেই।
কৃতান্ত নিস্তেজ ভঙ্গিতে বললেন,–ও কিছু না।
তারপর আবার দুর্ভাবনায় পড়ে গেলেন। এও যদি স্বপ্ন হয়?
হুঁ, এটা যে স্বপ্ন নয়, তার প্রমাণ কী? আগের স্বপ্নে এই বৈকুণ্ঠের ভূত ঠিক কথাই তো বলেছিল। প্রমাণ ব্যাপারটা সত্যি বড় কঠিন। বিশেষ করে নেপাল এইমাত্র যে ভালো চা এনে দিলে দুকাপ, তা সত্যি অপূর্ব বলেই ধাঁধা ঘুচছে না। নেপালের চা তো এত ভালো হয় না।
ও বেশি দামের চা এনেছে বলে আনে কম দামের। পয়সা মারে। তাই এমন ভালো চা যে খাওয়াবে, তা অবিশ্বাস্যই বলা যায়।
কৃতান্ত চা খেতে-খেতে বললেন, আচ্ছা বৈকুণ্ঠ, তোমাদের কাঁকুলিয়াকে কি লোকে কাকুলে বলে?
বৈকুণ্ঠ বললেন, হ্যাঁ। তুমি কেমন করে জানলে?
–আচ্ছা, একটা বাজেকাঁকুলেও আছে কি?
–আছে। জঙ্গলমতো একটা জায়গা
–সেখানে একটা দিঘি আছে। ভাঙা পাথুরে ঘাট আছে। দক্ষিণ পাড়ে শ্মশান আছে। পুবপাড়ে ভাঙা ঘরবাড়ি আছে। তাই না?
