কৃতান্ত টের পেলেন তাকে অসম্ভব ঠান্ডা হাড়ের হাতে চ্যাংদোলা করে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনবরত খটখটখটাখট শব্দও শোনা যাচ্ছে।
না–অজ্ঞান হলেন না। অজ্ঞান হওয়ার অভ্যাস নেই কৃতান্তের। ভয় পেলে মানুষের অজ্ঞান হওয়া স্বাভাবিক। কৃতান্ত ভয় পেয়েছেন বললে ভুল বলা হবে। কারণ, এ ব্যাপারটাও চরম মুহূর্তে স্বপ্ন বলে মেনে নিয়েছেন। এবং স্বপ্নে মুভুই কাটা যাক, আর ভূতেই ঘাড় মটকাক, ক্ষতি কী?
বরং এই গরমে ঠান্ডা হাড়ের ছোঁয়ায় আরামই লাগল। কৃতান্ত চোখ বুজে থাকলেন। দেখা যাক্ না স্বপ্নটা শেষ অবধি কোথায় দাঁড়ায়।…
কিন্তু একি সত্যি-সত্যি স্বপ্ন?
কঙ্কালগুলো কৃতান্তবাবুকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গিয়ে একটা ভাঙা ঘরে ঢুকল। তারপর দুম করে ফেলে দিতেই আছাড় খেলেন কৃতান্ত এবং ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন। অতএব এটা স্বপ্ন নয়।
আছাড় খেলেই তো স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার কথা। এতকাল কত ভীষণ সব স্বপ্ন দেখেছেন এবং আছাড়ও খেয়েছেন। তারপর দেখেছেন খাটের নিচে পড়ে গেছেন। ঘুমও ভেঙেছে।
এটা স্বপ্ন নয়। আসলে বৈকুণ্ঠবাবুর কাকুলিয়া গ্রামের ব্যাপারটাই এমনি বিদঘুঁটে। এ এক সৃষ্টিছাড়া দেশ।
কৃতান্ত আছাড় খেয়ে ব্যথায় কাতরে উঠলে কে নাকিস্বরে বলল, লাগল নাকি ভঁয়া?
ঘরের দেয়াল ভাঙা, ছাদও ফাটলধরা। তার ফাঁকে যেটুকু আলো আছে তাতেই কৃতান্ত অবাক হয়ে দেখলেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা কঙ্কাল।
কঙ্কালের মুখে ভঁয়া বলা সহ্য করা যায় না। কৃতান্ত দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন,–থাক, আর সিমপ্যাথি দেখাতে হবে না। কে হে তুমি? এমন করে এদের পাঠিয়ে আমাকে জবরদস্তি ধরে আনলে। একি মগের মুল্লুক পেয়েছ নাকি?
কঙ্কালটা হিহি করে হেসে উঠল। তারপর বলল,–সে কি ভয়া! আঁমায় চিনতে পারছ না? আঁমি বৈকুণ্ঠ।
অ্যাঁ! বলে কী ব্যাটাচ্ছেলে ভূত! বৈকুণ্ঠ এখনও দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন। ভাগ্নেকে গিয়ে এগ্রিকালচার ফার্ম খুলেছেন। কৃতান্ত হাত তুলে বললেন,-থাপ্পড় মারব বলে দিচ্ছি। ইয়ার্কির জায়গা পাওনি?
কঙ্কাল আবার হিহি করে হেসে উঠল। বলল,-মাইরি কেঁতো, তোমার দিব্যি। আঁমি তোমার বন্ধু সেঁই বোঁকা!
কৃতান্ত গোঁ ধরে বললেন,–মুখে বললে তো চলবে না। প্রমাণ চাই।
এদিকে যে তিনটে কঙ্কাল কৃতান্তবাবুকে ধরে এনেছে, তারা এতক্ষণ পিছনে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ। এবার তাদের একজন চেঁচিয়ে উঠল,–ওঁরে বাবা, ঐ যে প্রমাণ চাইছে।
আরেকজন বলল,–তাঁহলে তোঁ মুশকিল বেঁধে গেঁল রে!
তৃতীয়জন বলল, কিঁচ্ছু নাঁ রেঁ! আঁয় আঁমরা এঁর মাঁথায় গাঁট্টা মারি। তাঁহলে প্ৰঁমাণ চাঁইবে না।
বৈকুণ্ঠবাবুর পরিচয় দিচ্ছিল যে কঙ্কালটা, সে বলল,–ওঁহে এবাঁর মাঁথা বাঁচাও! বলে সে হাড়ের হাতে তালি বাজিয়ে হিহি করে হাসতে লাগল।
তারপরই ভীষণ কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। কৃতান্তবাবু বুড়োমানুষ হলে কী হবে? এখনও গায়ে জোর আছে। যৌবনে দস্তুরমতো ডনবৈঠক ভাঁজতেন। ফুটবলও খেলতেন। বক্সিং, জুডো এসবেও অল্পস্বল্প হাত ছিল। ওরা হাড়ের হাতে গাঁট্টা মারতে আসার সঙ্গেসঙ্গে এক প্যাঁচে সবাইকে ধরাশায়ী করে ফেললেন। একজন তো উঁ হু হু করে ককিয়ে উঠল।
তারপর কৃতান্ত ধুন্ধুমার যুদ্ধ বাধিয়ে ফেললেন। স্রেফ ঘুসির চোটে কঙ্কালগুলোকে কোণঠাসা করে দিলেন। এমন আজব বক্সিং ক্যাসিয়াস ক্লে ওরফে মহম্মদ আলির লড়ারও সাধ্য ছিল না।
হ্যাঁ, খটখটে হাড়ে ঘুষি মারলে হাত ব্যথা তো করবেই। তাই বলে কৃতান্তবাবু দমবার পাত্র নন।
দেখা গেল, ভূত বা কঙ্কালগুলো বক্সিংয়ে একেবারে আনাড়ি। ওদের রাজ্যে বক্সিং নেই সম্ভবত। কাতুকুতু আছে। ঘাড় মটকানো আছে। চোখে আঙুল দেওয়া আছে। বক্সিং নেই। অবশ্য একটু-আধটু জুডো থাকলেও থাকতে পারে।
ঘুসির চোটে শেষ অবধি জানালা-দরজা গলিয়ে চারটে কঙ্কালই পালিয়ে গেল। তারপর হাত ব্যথা করতে থাকল কৃতান্তের।
তা করুক। ভূতের সঙ্গে লড়াইতে জিতেছেন। এই গর্বে বুক ফুলিয়ে বেরুলেন।
বেরিয়ে দেখেন দিঘির ঘাটের কাছে সেই বটগাছের লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে সে আগের মতো দাঁত বের করে হাসল।
কৃতান্ত তার কাছে গিয়ে বললেন,–হাসি কীসের? আঁ? তখন খুব তত দিঘি দেখিয়ে দিয়েই হনুমানের মতো গাছে চড়ে বসলে। ব্যাপার কী?
লোকটা চাপাগলায় এবং চোখ নাচিয়ে বলল, ওনাদের দেখা পেলেন নাকি বাবুমশাই!…ওনাদের ভয়েই তো আমি আসিনি।
–এখন এলে যে?
–আজ্ঞে, পরে ভেবে দেখলুম আপনি বিদেশি মানুষ। একা কোনও বিপদে পড়লেন নাকি। তাই এলুম। তা বাবুমশাই, ওনারা কেউ আসেনি?
কৃতান্ত ফের ঘাটে হাত ধুতে নামছিলেন। ছ্যাঃ, কঙ্কালের গায়ের ছোঁয়া লেগেছে, স্নান করতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু বিদেশ-বিভূঁয়ে পুকুরের জলে স্নানের অভ্যাস নেই। ঠান্ডা লেগে অসুখ-বিসুখ হতে পারে। তাই হাতদুটো রগড়ে বোবেন!
হাত ধুতে ধুতে কৃতান্ত লোকটার কথার জবাব দিলেন। ব্যাটারা এসেছিল হে। বুঝেছ? এলে কী হবে? হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছি।
লোকটা খুশি হয়ে বলল, ভালো করেছেন আজ্ঞে। খুব ভালো করেছেন।
কৃতান্ত এত কাণ্ডের মধ্যেও কাঁধের ব্যাগ কিন্তু ফেলেননি। তার ভেতর থেকে তোয়ালে বের করে হাত মুছে বললেন,–যাকগে। তোমার বাড়ি তো বৈকুণ্ঠবাবুদের পাশের গায়ে বলছিলে। চলো তো আমায় রাস্তা দেখিয়ে দেবে।
