দেরি হল না। নেপালচন্দ্র জলভরা সোনার গেলাস রূপোর রেকাবে রেখে সামনে তুলে ধরল। কৃতান্ত তৃষ্ণার্ত। হাত বাড়ালেন। হাতটা হঠাৎ বড় ভারী লাগছে। হা, লাগবেই তো। সোনা হীরে মানিক বসানো রাজপপাশাক। ওজন আছে।
বাইরে প্রজার মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি দিচ্ছে–জয় মহারাজ কৃতান্তদেব। তুরি, ভেরি কাড়ানাকাড়া বাজছে। তারপর কী একটা ঘটল। ঠিক বুঝতে পারলেন না কৃতান্ত। কিন্তু গুরুতর কিছু নিশ্চয় ঘটল।
কারণ কৃতান্তবাবুর মনে হল আচমকা বুঝি আছাড় খেয়েছেন। খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
কোথায় কী! কোথায় কাংকালিকা রাজপ্রাসাদ। কোথায় রাজপোশাক, ন্যাপলা, প্রতুল, বউমা, পরিচারক-পরিচারিকা, বীণা বাদক-বাদিকা, গায়ক-গায়িকা! কোথায় বা পেন্নায় চেহারা কালান্তক প্রহরীরা!
তবে ধুধু রোদ্দুরে নয়, ছায়াতেই শুয়ে আছেন। গাছটা বটগাছ। ডালে অজস্র পাখি লাল টুকটুকে বটফল ঠোকরাচ্ছে।
আর হ্যাঁ, আকাশের নিচু দিয়েই একটা এরোপ্লেন যাচ্ছে। তুরি ভেরি কাড়ানাকাড়া নয়। নিছক এরোপ্লেন।
আর কৃতান্তের পরনে ধূলিধূসর সেই পাঞ্জাবি-ধুতি, পায়ের পাম-শুজোড়া ব্যাগের তলায় রাখা আছে। ব্যাগটা দিব্যি বালিশ করে বটতলার শুকনো ঘাসে শুয়ে আছেন।
.
তাহলে নিছক স্বপ্নই দেখছিলেন।
দুঃখে ও রাগে মন খারাপ হয়ে গেল সঙ্গেসঙ্গে। কোনও মানে হয়? কৃতান্ত উঠে বসে হাই তুললেন। পাকারাস্তাটা দূরে দেখা যাচ্ছে। হু-হুঁ রোদ্দুরে কাঁচের মতো ঝকঝক করছে।
তাহলে কাঁচারাস্তায় আনমনে হাঁটতে-হাঁটতে কখন এই বটতলায় পৌঁছে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু তেষ্টায় গলা কাঠ। এখনই জল খাওয়া দরকার। কৃতান্ত এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ দেখলেন, বটগাছেরই ডালে কে যেন বসে আছেন। আঁতকে উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে! কালো কুচকুচে একটা লোক এখানে বসে কী করছে?
ভূতপ্রেত নয় তো? কিছু বলা যায় না। বৈকুণ্ঠের এই দেশে সব সম্ভব। কাঁপা কাঁপা গলায় কৃতান্ত বললেন,–কে? কে ওখানে?
ভূত অথবা লোকটা ঘুরে বসল। কালো মুখে সাদা দাঁত ঝকমক করছে। হাসছে, না ভয় দেখাচ্ছে?
কৃতান্ত ভয় পেয়েছেন বলেই ধমক দিতে পারলেন, দাঁত বের করছ কেন বাবা? আঁ? হনুমানের মতো ডালেই বা বসে আছো কেন শুনি?
না, ভূত নয়। নাকিস্বরে কথা বলল না। লোকটা বলল, আজ্ঞে, পাকা বটফল পাড়ছি।
–বটফল? খায় বুঝি?
–আজ্ঞে, পাখপাখালিতে খায়; আমি একটা পাখি পুষেছি কিনা। তার জন্যে বটফল পাড়ছি।
–তা কেশ করছ। এখানে জল আছে কোথায় বলতে পারো?
জল? এই যে এখানে একটা দিঘি আছে।লোকটা কথা বলতে-বলতে নেমে এল গাছ থেকে। এসে করজোড়ে প্রণামও করল–
–আপনি শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন দেখলুম। তা কোত্থেকে আসছেন বাবুমশাই? কোথায় যাবেন?
–কলকাতা থেকে। যাব কাকুলিয়া।
–কাকুলে? সে তো এখনও দু-মাইলটাক পথ বাবুমশাই।
–বলো কী হে। তা এ জায়গাটার নাম কী?
–বাজে-কাঁকুলে আজ্ঞে।
–বাজে কাকুলে! সে আবার কী হে?
–আজ্ঞে বাবুমশাই, শুনেছি কোন আমলে নাকি এখানেই আসল গেরামটা ছিল। এখন জঙ্গল হয়ে গেছে। লোকে বলে বাজে কাঁকুলে।
কৃতান্ত উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, তোমার বাড়ি কোথায়।
লোকটা জবাব দিল, আমার বাড়ি আজ্ঞে কঁকুলের পাশে আঁদুলে।
কী অদ্ভুত নাম সব। কঁকুলে-আঁদুলে। পুঁদুলে নামেও হয়তো গ্রাম আছে, বলা যায় না। কৃতান্ত মনে-মনে হেসে বললেন,–ওহে! আমাকে দিঘিটা দেখিয়ে দিয়ে এসো তো!
অমনি লোকটা হাতজোড় করে বলল, ক্ষমা করবেন বাবুমশাই! আমি যেতে পারব না। ওই তো দেখা যাচ্ছে উঁচু পাড়আপনি চলে যান। খুব ভালো জল আছে। টলটলে কালো জল। ঘাটও পাবেন।
কৃতান্ত একটু অবাক হয়ে বললেন,–কেন যেতে পারবে না?
লোকটা জবাব না দিয়ে আবার বটগাছে গিয়ে উঠল। অদ্ভুত লোক তো! বৈকুণ্ঠের দেশের লোক কিনা। এমনিই তো হবে। মনেমনে গজগজ করতে করতে কৃতান্তবাবু দিঘির পাড় লক্ষ করে এগিয়ে চললেন।
ক্ষয়াখবুটে ঝোঁপঝাড় গাছপালার জঙ্গল পেরিয়ে পাড়ে উঠে দেখলেন, প্রচুর ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর তার আগাছা গজিয়ে রয়েছে। ঘাটটাও পাথরে বাঁধানো। ধাপগুলো ভাঙাচোরা। শ্যাওলা জমে আছে। বিশাল দিঘিটা দামে ভর্তি। তাহলে কি এখানে ঐতিহাসিক যুগে এক সময় সত্যি-সত্যি রাজপ্রাসাদ ছিল?
সে পরে হবে। আপাতত জলতেষ্টা মেটানো যাক। সত্যি, জলটা যাকে বলে কাজলবৰ্ণ। স্বচ্ছ। আঁজলায় জল তুলে প্রাণভরে পান করলেন কৃতান্ত। সূর্য এখন একটু ঢলেছে। হাত-ঘড়িতে বেলা দেড়টা বাজে।
জল খেয়ে মুখ কাঁধ-হাত-পা রগড়ে ধুলেন কৃতান্ত। আঃ কী আরাম। বরং আরও কিছুক্ষণ ওই বটতলায় বিশ্রাম করে রোদের তেজ কমলে বৈকুণ্ঠের গ্রামের দিকে রওনা হবেন।
আরামে নিশ্বাস ফেলে কৃতান্ত ঘুরে সিঁড়ির ধারে পা ফেলেছেন, সেই সময় ধুপধাপ শব্দ হল সিঁড়ির ওপর দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন কৃতান্ত।
রাত হলে কিছু বলার ছিল না। এ যে একেবারে দিনদুপুর! উজ্জ্বল রোদ্দুর।
তাছাড়া তখন না হয় ঘুমোচ্ছিলেন বটতলায়, তাই স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু এখন? এখন তো স্বপ্ন নয়। তাহলে?
ঘাটের মাথায় সার-সার দাঁড়িয়ে আছে তিন-তিনটে কঙ্কাল।
হ্যাঁ, পুরোদস্তুর কঙ্কাল।
তারপর তারা চেরা-গলায় অমানুষিক চেঁচিয়ে উঠল,–পেয়েছি! পেঁয়েছি! পেয়েছি!
তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কৃতান্তের ওপর।
