কৃতান্ত সিঁড়িতে পা বাড়ালে বীণাবাদক আর বীণাবাদিকা মিলে জনা পনেরো পুরুষ ও স্ত্রীলোক দুধারে দাঁড়িয়ে গান করতে লাগল।
কৃতান্ত যুবরাজের পাশাপাশি সপ্রতিভ ভঙ্গিতে অর্থাৎ কিনা স্মার্ট হয়ে, রাষ্ট্রনেতারা যেভাবে গার্ড অফ অনার ভিজিট করেন, সেইভাবে উঠে গেলেন।
সামনে কারুকার্যময় সুদৃশ্য দরজার পরদা দুদিকে টেনে ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুজন পরিচারিকা। আর ঘরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন পরিচারক তার হাতে বিশাল রুপোর রেকাব, তার ওপর সোনার গেলাসে সম্ভবত সুশীতল শরবত-টরবত হবে। দেখামাত্র তৃষ্ণা বেড়ে গেল কৃতান্তবাবুর।
কিন্তু তারপরই থমকে দাঁড়ালেন।
সুশীতল পানীয় নিয়ে যে পরিচারক দাঁড়িয়ে আছে, সে আর কেউ নয়– স্বয়ং নেপাল। সেই ন্যাপলা। বউমার আদরের নেপু। নেপু না বলে নেপো বলাই ভালো। যে নেপো দই মারে। কিন্তু অসম্ভব? একই চেহারার লোক তো থাকে। কৃতান্তবাবু হাত বাড়ালেন। প্রচণ্ড তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেল।
কিন্তু শরবতের গেলাস নিতে গিয়ে দেখলেন, হা–এ ব্যাটা সেই ন্যাপলাই বটে, ফিক করে হাসল। তারপর ফিসফিস করে বলে উঠল, কর্তাবাবু, ভালো আছেন।
অমনি ঝনঝন করে হাতের গেলাস মেঝেয় পড়ে গেল। যুবরাজ অবাক! পরিচারক, পরিচারিকারা অবাক। কৃতান্ত গর্জন করে বললেন, ন্যাপলা! তুই এখানে!
–আজ্ঞে হ্যাঁ কাবাবু।
কৃতান্ত রেগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,–গেট আউট। গেট আউট।
কাল রাত্তিরে চায়ের নামে শুকনো কচুরিপানার শেকড়সেদ্ধ জল ফুটিয়ে খাইয়েছিল। এখন এই কাংকালিকা রাজপ্রাসাদে শরবতের নামে নির্ঘাত নর্দমার জল এনেছে। স্বভাব যাবে কোথায়? আসল শরবতটুকু খেয়ে ফেলেছে ব্যাটা। এ ভেজাল মাল।
কৃতান্তের তাড়া খেয়ে যথারীতি নেপাল গ্রাহ্যই করল না। সে মুচকি হাসতে থাকল। যুবরাজ বললেন,–কী হল আর্য? খুলিয়া বলিবেন কি?
কৃতান্ত হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন,–এই দুবৃত্ত, দুর্জন ছোকরাকে এখনই বিদায় করুন যুবরাজ। এ ব্যাটা ভেজালরাজের গুপ্তচর।
অমনি যুবরাজ ফুঁসে উঠলেন, কী! ভেজালরাজের গুপ্তচর? আমার প্রাসাদে? সর্বনাশ! ভেজালরাজ ঝুনঝুনওয়ালা গুলঞ্চ প্রসাদ যে আমাদের শত্রু। এই কে আছে! ইহাকে বন্দি করো।
দুজন কালান্তক চেহারার প্রহরী এসে নেপালকে ধরে ফেলল। নেপাল তাও মুচকি মুচকি হাসে যে। কৃতান্ত চেঁচিয়ে উঠলেন,–আবার হাসি হইতেছে? যুবরাজ! দেখিতে পাইতেছেন কি দুবৃর্ত্ত এখনও অম্লানবদনে হাসিতেছে?
যুবরাজ আরও রেগে হুকুম দিলেন, উহাকে এইখানেই বধ করো। এই মুহূর্তে দুবৃত্তের মস্তক ছেদন করো।
ওরে বাবা! সে বড় রক্তারক্তি কাণ্ড! এখানেই মুন্ডু কাটবে? কৃতান্ত ঘাবড়ে গেলেন। চোখ বুজে ফেললেন। নেপালটা কী গাড়োল! কেন এখনও ক্ষমা চাইছে।? দেখো দিকি, কী বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এতখানি হবে, ভাবতে পারেননি কৃতান্ত।
হঠাৎ তাঁর কানে এলা বউমারই গলা, তাতে কোনও ভুল নেই। কী হইল? কী হইয়াছে? আমার নেপু কী অপরাধ করিয়াছে শুনি?
চোখ খুলেই কৃতান্ত দেখতে পেলেন। বড়বউমাই বটে। কিন্তু এ কী বেশ! এ যে একেবারে রাজ্ঞীর পোশাক পরনে! মাথায় সোনার মুকুট পর্যন্ত। এসে যুবরাজের সামনে হাত-মুখ নেড়ে ফের বলে উঠল, নেপু আমার পিতার দেশের ভৃত্য। উহার মস্তক ছেদন করিলে আমি পিত্রালয়ে যাত্রা করিব, বলিয়া দিতেছি –হ্যা!
যুবরাজ বললেন, কিন্তু ও যে ভেজালরাজের গুপ্তচর।
বউমা বলিল,-হাতি! ঘোড়া! তোমার শ্রেষ্ঠীরাই ভেজালরাজের গুপ্তচর!
যুবরাজ্ঞীবেশিনী বউমা আবার বলল, এই তো আমি পাকশালা হইতে আসিতেছি। শ্ৰেষ্ঠীর বিপণী হইতে যে ঘৃত পাঠানো হইয়াছে, উহা ঘৃত নহে, অন্য কোনও বস্তু।
বন্দি নেপাল বলল, ডালডাও নহে। জলহস্তীর চর্বি।
যুবরাজ গর্জন করে বললেন, কে আছো? শ্ৰেষ্ঠীকে বন্দি করিয়া লইয়া আইস।
এবার যুবরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে কৃতান্তবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন।
–প্রতুল! তুই।
–হ্যাঁ পিতা।
–ওরে হতভাগা। এতক্ষণ কহিস নাই কেন? আমি যে তোকে চিনিতে পারি নাই!
বড়ছেলে আর বড়বউমা ঢিপ করে একসঙ্গে কৃতান্তের পায়ে প্রণাম করতেই সব রাগ জল হয়ে গেল কৃতান্তের। আশীর্বাদ করে বললেন–সুখমস্তু! চিরজীবি হও!
তারপর নেপালও প্রহরীদের হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে তাঁর পায়ে একটি প্রণাম ঠুকে বলল,–অপরাধ লইবেন না কর্তামশায়! আসুন, আপনাকে উৎকৃষ্ট চা পান করাইতেছি।
এই সময় বাইরে ভেরি, তুরি, কাড়াকাড়া বেজে উঠল। একজন দৌবারিক ঘরে ঢুকে প্রণাম করে বলল, মহারাজ! আপনি ফিরিয়া আসিয়াছেন শুনিয়া কাংকালিকার প্রজাবৃন্দ আপনার দর্শনপ্রার্থী।
কৃতান্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ছ্যা-হ্যাঁ, এই ধুলোময়লা নোংরা পাঞ্জাবি-ধুতি পরে কি প্রজাদের দর্শন দেওয়া যায়? কাঁধের ঝোলাটা ফেলে দিয়ে বললেন,–কে আছো? আমাকে উৎকৃষ্ট রাজবেশ পরাইয়া দাও।
সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড রেকাবে রাজবেশ নিয়ে পরিচারকবৃন্দ এসে দাঁড়াল। নেপাল একগাল হেসে বলল, আমি মহারাজের মস্তকে মুকুট পরাইব।
ইচ্ছে হয়েছে তো পরাক না। নেপাল ছেলেটা তো এমনিতে খারাপ নয়। বড় মধুর মিষ্টি স্বভাব। আসলে ভেজালরাজের চেলারা জিনিসিপত্রে ভেজাল দিলে ও বেচারা করবে কী?
বাইরে তুমুল বাদ্য বাজছে। প্রজারা জয়ধ্বনি দিচ্ছে। নেপাল কৃতান্তের মাথায় মুকুট পরিয়ে বলল,-এবার সুশীতল জল আনয়ন করি মহারাজ। আপনি তৃষ্ণার্ত।
