কৃতান্তের শেষ অবধি ভালোই লাগল ব্যাপারটা। কথায় কথায় লোকে আপশোস করে বলে না–হ্যায় রে সেকাল? কৃতান্তবাবু কতবার বলেন কথাটা। অতএব, বৈকুণ্ঠবাবুর দেশে সত্যি সত্যি জলজ্যান্ত সেকাল যদি টিকেই থাকে, সে তো খাসা! আহা, সেকালে মানুষের নাকি কত আনন্দ, সুখসুবিধে ছিল! পুকুরভরা মাছ, গোলাভরা ধান, গামলা-গামলা দুধ! এই সে পরান গয়লার নর্দমার জল মেশানো দুধ নয়, হরিণঘাটায় বোতলের সর তুলে সাদা তরল পদার্থও নয়–খাঁটি দুধ।
আর ঘি? নির্ভেজাল প্রকৃত ঘৃত। কৃতান্তের নোলায় জল এসে গেল। হায় রে! কতকাল প্রকৃত ঘৃতপ লুচি আর খেতে পাওয়া যায় না। কৃতান্ত দীর্ঘশ্বাস না ফেলেও পারলেন না।
এবং মনে-মনে আনন্দে নেচেও উঠলেন। বৈকুণ্ঠের বাড়িতে প্রকৃত ঘৃতপক লুচির কথা ভেবেই।
এদিকে অশ্বচালিত রথে বসে রাজপুরুষটিও তাঁর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি।
কৃতান্ত সৌজন্য দেখিয়ে করজোড়ে নমস্কার করলেন।
তখন রাজপুরুষ নমস্কার করে সংস্কৃত ভাষায় তাঁকে বললেন,–আর্য! ত্ব অভিনন্দতে কঃ ত্বাম্? কুত্র গচ্ছসি?
এই সেরেছে। কৃতান্তবাবু মুশকিলে পড়ে গেলেন। সেই পঞ্চাশ বছর আগে ম্যাট্রিকে সংস্কৃত পড়েছেন। তার কি মনে আছে কিছু? ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণ কৌমুদীখানা হাতের কাছে থাকলে বরং চেষ্টা করা যেত।
রাজপুরুষটি মনে হচ্ছে খুবই ভদ্র। মুখের হাসিটি দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু শাস্ত্রে আছে না? শৃঙ্গী প্রাণী আর অস্ত্রধারী মনুষ্য থেকে শতহস্ত দূরে থাকা উচিত। বলা যায় না, কখন কীসে মেজাজ চড়ে যায়।
কৃতান্তবাবু ঘাবড়ে গিয়ে–না, সংস্কৃত নয়–একেবারে ইংরেজিতে বলে ফেললেন, স্যার, আই অ্যাম কামিং ফ্রম ক্যালকাটা অ্যান্ড গোয়িং টু বৈকুণ্ঠবাবু হাউস। বাট স্যার, ভেরি হট ডে। ভেরি টায়ার্ড স্যার। ওল্ড ম্যান স্যার–
রাজপুরুষ হোহো করে হেসে ফেললেন। এবার বিশুদ্ধ বাংলায় তার মানে সাধুভাষায় বলে উঠলেন, বুঝিয়াছি মহাশয়! বুঝিতে পারিয়াছি। থাউক। ইংরাজি ভাষায় কথোপকথনের আবশ্যকতা নাই। আপনি স্বচ্ছন্দে বাংলা ভাষায় কথা কহিতে পারেন। তবে তার আগে আপনি আমার রথে আরোহন করুন। পশ্চাৎ যাহা কহিবার কহিবেন।
কৃতান্তবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এবং সাবধানে ময়ূরপঙ্খী রথের পেছনদিকের পাদানি দিয়ে অনেক কষ্টে চড়ে বসলেন। রাজপুরুষ তাঁর হাত ধরে পাশে বসিয়ে মৃদু হেসে ফের বললেন,–মনে হইতেছে আপনি ক্ষুধার্ত এবং যৎপরোনাস্তি ক্লান্ত। চিন্তা করিবেন না। আমার প্রাসাদে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া যথা ইচ্ছা গমন করিবেন।
কৃতান্ত খুশি হয়ে বললেন, আপনার প্রাসাদে আতিথ্যের আমন্ত্রণ আমি কি প্রত্যাখ্যান করতে পারি কি? হে ভদ্র! সেখান হইতে কাংকুলিয়া পল্লী কতদূর বলিতে পারেন কি?
কাঁকুলিয়া সাধুভাষায় কাংকুলিয়া হওয়াই উচিত বলে মনে করলেন কৃতান্ত। রাজপুরুষ তার কথা শুনে বললেন, কাংকুলিয়া? ওহো! বুঝিয়াছিকাংকালিয়ার কথা বলিতেছেন।
কৃতান্ত বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। কাংকালিয়াই বটে।
–কাংকালিয়া আমার পিতার রাজধানী। আপনি কাহার নিকট যাইবেন?
–আজ্ঞে বৈকুণ্ঠ। তিনি আমার সুহৃদ বটেন।
–বৈকুণ্ঠ। আহা বুঝিয়াছি। শ্ৰেষ্ঠীপ্রবর বৈকুণ্ঠের নাম এরাজ্যে কে না জানে– বলে রথের অশ্বকে কশাঘাত করলেন রাজপুরুষ।
রথ চলতে থাকল। ক্রমশ গতি বাড়ছিল। কিন্তু এতটুকু কঁকুনি নেই। অদ্ভুত রথ বানাতে পারে এরা ইতিহাসের দেশের লোকেরা। কৃতান্ত মনে-মনে তারিফ করছিলেন। কিন্তু বৈকুণ্ঠকে শ্রেষ্ঠীপ্রবর বলছেন কেন যুবরাজ? শ্ৰেষ্ঠী মানে তো বণিক বা ব্যবসায়ী। বৈকুণ্ঠ কি তাহলে এখন চুটিয়ে ব্যবসা করতে নেমেছে?
দেখতে-দেখতে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দিগন্তের সেই ধোঁয়াটে ব্যাপারটাতে অর্থাৎ গ্রামে এসে পড়ল। কিন্তু গ্রাম বলা কি ঠিক হচ্ছে? গাছপালার ফাঁকে সাদা-হলদে নীল, রংবেরঙের পাকা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এ যে রীতিমতো শহর!
কিন্তু না–ইলেকট্রিক লাইন নেই। আকাশ পরিষ্কার। ঘরবাড়িগুলোর গড়নও ছবিতে যেমনটি দেখা যায় তেমনি। আর ওই বুঝি রাজপ্রাসাদ! বিশাল তোরণ। সশস্ত্র প্রহরী। ওরে বাবা! কী পেন্নায় দানোর মতো ওদের চেহারা! মস্ত বল্লম কাঁধে। কোমরে চ্যাপ্টা খাঁড়ার মতো অদ্ভুত তরোয়াল ঝুলছে। মাথায় লোহার টুপি। ওদিকে উঁচুতে ফটকের মাথায় একদল প্রহরীর হাতে তীরধনুকও রয়েছে। ভুল করে শত্রু ভেবে তির ছুড়লেই হয়েছে! কৃতান্ত ভয়ে চোখ বুজলেন।
ফের যখন চোখ খুললেন, দেখলেন বিশাল এক প্রাঙ্গণে রথ ঢুকছে। প্রাঙ্গণে কত ফুলের গাছ, মর্মরমূর্তি, ফোয়ারা।
চওড়া মস্ত সিঁড়ি উঁচু, সোপান বলাই উচিত, তার ধারে রথ থামলে একদল পরিচারক আর সশস্ত্র প্রহরী এসে অভিবাদন জানিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
যুবরাজ কৃতান্তের একটা হাত ধরে বললেন, আর্য! গাত্রোত্থান করুন।
কৃতান্ত সাবধানে নামলেন।
সিঁড়ির ওপরদিকে চওড়া বারান্দার মতো জায়গায় বীণা বাজিয়ে কারা গান জুড়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। গানের ভাষা সংস্কৃত। মলোচ্ছাই! এত সংস্কৃতের মধ্যে বাংলা নিয়ে বিপদে পড়তে হবে যে! হিন্দি হলে ততটা অসুবিধে ছিল না। আজকালকার হিন্দি তো হ্যায়-ট্যায় এসব ক্রিয়াপদ বাদ দিলে খাঁটি সংস্কৃত। এদিকে বাংলার ক্রিয়াপদ বাদ দিলে তো স্রেফ ইংরিজি। এই যেমন আমি হাংগ্রি ফিল করছি!
