তাও তো রূপকথার তেপান্তরে একটা গাছ ছিল শুনেছেন ছেলেবেলায়– যে গাছের ডালে বাস করত ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমী।
কিন্তু এ যেন মরুভূমি। ঢেউ খেলানো ধুধু মাঠ, রুক্ষ নীরস হয়ে পড়ে আছে। হুঁ! সব গুল বৈকুণ্ঠের। চাষবাস না হাতি। এই পাথুরে মাটিতে এক চিলতে ঘাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেনি, শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে আর কিনা ওঁরা মামা-ভাগ্নে নাকি ফসল ফলিয়ে মা-লক্ষ্মীর বরপুত্র হয়ে গেছেন? ধুর, ধুর! বয়স হলেও বৈকুণ্ঠ এমন মিথ্যুক, ভাবা যায় না।
কৃতান্তবাবুর রাগ হচ্ছিল। কিন্তু এসে যখন পড়েছেন, এবং বুড়োমানুষ হলেও এখনও শরীরে যুবকের মতো শক্তি আছে বইকী, তখন বৈকুণ্ঠের মুখোমুখি হয়ে ঝাল ঝেড়ে ছাড়বেন না।
অতএব কৃতান্ত মাথায় রুমাল জড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। রুমাল না জড়ালে সূর্যদেবের দাঁতের কামড় খেয়ে প্রকাণ্ড টাকের অবস্থাটা ভারি কাহিল হয়ে যাবে। কাঁধে একটা ব্যাগ ছাড়া আর কোনও বোঝা নেই। সেই রক্ষে।
সত্যি বলতে কী, এই যে এমন করে বৈকুণ্ঠবাবুর বাড়ি যাচ্ছেন, তার কারণ গত রাত থেকে তার মন খারাপ। বৈকুণ্ঠ বলেছিলেন, মন খারাপ হলেই চলে যেও। আনন্দ পাবে।
মন খারাপের কারণ আর কিছুই না, চা। নেপাল নামে যে ছোকরাটিকে উমা সম্প্রতি বাসায় বহাল করেছে, সে চোরের ওস্তাদ। তিরিশ টাকা কিলোর চা কিনতে গিয়ে পনেরো টাকা কিলোর চা এনে দেবে এবং তিরিশ টাকা দরেই হিসেব দেখাবে। আর সেই চা কুকুরও ছোঁয় না। কৃতান্তবাবুর বরাবর এই এক অভ্যাস। ভালো এবং দামি চা খাওয়া তার শখ ছিল। এখন নিজে চা কিনতে যান না। তার মানে, ছেলে কিংবা বউমা তাঁকে চা কিনতে যেতে দেবে না। ওদের সম্মান যাবে নাকি!
আসলে নেপাল ওদের মাথাটি খেয়েছে। গত রাতে পার্ক থেকে বেড়িয়ে এসে অভ্যাস মতো চা চাইলেন। চা ঠিকই এল কিন্তু সে কি চা, না শুকনো কচুরিপানা সেদ্ধ জল?
নেপালকে বকাবকি করতে গেলে উল্টে বউমা তার হয়ে সাফাই গেয়ে বলল কিনা,–আজকাল চায়ে বেজায় ভেজাল দিচ্ছে যে। নেপু কী করবে?
নেপাল হল নেপু! ন্যাপলা নয়, আদর করে নে-পু! কোনও মানে হয়?
বেশ, নেপু নিয়ে তোমরা ভেঁপু বাজাও। আমি চললুম যে-দিকে দুচোখ যায়।
কৃতান্তবাবু অবশ্য টেবিলে একটা চিরকুট সবার চোখে পড়ার মতো জায়গায় রেখে এসেছেন। তাতে লিখে রেখেছেন : আমাকে খুঁজিও না। পাইবে না।
বাস থেকে কাকুলিয়া রাস্তার এই মোড়ে নেমে একটু পস্তানি অবশ্য হয়েছিল। এতটা করা কি ঠিক হয়েছে? বড়ছেলে প্রতুল কি চুপ করে থাকবে? হাজার হলেও বাবা। বাবা নিরুদ্দেশ হলে ছেলেদের পক্ষে চুপচাপ বসে থাকা অসম্ভব। থানা-পুলিশ করবে। কাগজে বিজ্ঞাপন দেবে। খামোকা হয়রান হবে।
কিন্তু যা করার করে ফেলেছেন, আর পস্তিয়ে লাভ নেই। তবে যদি প্রতুল তার খোঁজ পেয়ে যায় এবং মুখোমুখি এসে পড়ে কৃতান্ত বলবেন,-হা, ফিরে যাব একটা শর্তে। ওই ন্যাপলাকে তাড়াতে হবে।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে কৃতান্তবাবু চলেছেন।
একটা সুবিধে, কঁকা মাঠ বলে হুহু করে বাতাস বইছে। তাই রোদ্দুরটা খুব একটা কষ্ট দিচ্ছে না।
কিন্তু রাস্তা যেমন এবড়ো-খেবড়ো, তেমনি ধুলোয় ভরা। হাঁটু অবধি ধুলোয় সাদা হয়ে যাচ্ছে। একদমে এতখানি হাঁটা অভ্যেস নেই বলে ক্লান্তিও আসছে।
বৈকুণ্ঠের দেশের লোকেরা এমন গবেট যে রাস্তার ধারে একটা গাছও লাগায়নি। একেই বলে পাণ্ডববর্জিত দেশ। আর সরকারি সড়কদফতরই বা কী করছে? প্রতি বছর ওই যে বৃক্ষরোপণ উৎসব হয়, কত ধুমধাম শুনতে পাওয়া যায়, সে সব কঁকুলিয়া এলাকায় হয় না? আসলে তদ্বিরের লোক নেই এখানে। সরকার তো অন্তর্যামী ভগবান নন। গিয়ে সব জানাতে হবে তবে না! ছ্যা, ছ্যা, বৈকুণ্ঠের দেশের লোকেরা এখনও সেই মান্ধাতার আমলে পড়ে আছে।
কৃতান্ত তেতো মুখে এসব কথা ভাবছেন, এমন সময় আচমকা পেছনে আবছা শব্দ শুনতে পেলেন টংলং টংলংটংলং।
ঘোড়ার গাড়িটা দেখামাত্র রাস্তার ধারে সরে গেলেন কৃতান্ত। মনে ক্ষীণ আশা হল, গাড়িটা থামিয়ে বলবেন নাকি, একটা লিস্ট দিতে?
ঘোড়ার গাড়িটা যত কাছে আসছে, কৃতান্তবাবু কিন্তু তত অবাক। একালে এমন অজ পাড়াগাঁয়ে ঘোড়ার গাড়ি কেন, পালকি থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু এই গাড়িটা একেবারে রাজকীয়। সোনার মতো ঝকঝক করছে। কী অপূর্ব নকশা! ঘোড়াদুটোও প্রকাণ্ড এবং সাদা রঙের। তাদের সাজও দেখবার মতো। কোচোয়ানের দিকে তাকিয়ে কৃতান্ত আরও অবাক হলেন। জরি আর মখমলের পোশাক, মাথায় বিচিত্র উষ্ণীষ!
কৃতান্ত এত অবাক হয়েছিলেন যে গাড়িটাকে হাত তুলে থামাবার কথাই ভুলে গেছেন।
কিন্তু গাড়িটা আচমকা তার কাছে এসেই থেমে গেল। সাদা ঘোড়াদুটো সামনের দুই পা শূন্যে তুলে বিকট চিহিঁ করে উঠল।
যাকে কোচোয়ান ভেবেছিলেন, সে যে কোচোয়ান নয় বুঝতে দেরি হল না কৃতান্তের। কী সুন্দর বীরোচিত চেহারা! কী উজ্জ্বল গৌর গায়ের রং! আবার কোমরে খাপেভরা তরোয়ালও ঝুলছে।
কৃতান্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
এই মহাকাশযুগেও বৈকুণ্ঠবাবুর দেশের বড়লোকেরা এমন ঝলমলে সেকেলে পোশাক পরে কোমরে তরোয়াল ঝুলিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে বেড়ায়, ভাবলে অবাক লাগে না?
বোঝা যাচ্ছে, যে কারণেই হোক, কাঁকুলিয়া এলাকা এখনও সেই ঐতিহাসিক রাজরাজড়ার যুগেই পড়ে আছে। একে ঘোড়ার গাড়ি বলা উচিত নয়। এ তো অশ্বচালিত রথ!
