দিবুর বাবা প্রণবেশ বললেন, কী কাণ্ড! মশারির দড়ি ছিঁড়ল কীভাবে?
দিবুর মা অরুণা বললেন, নিশ্চয় বেড়াল পড়েছিল। আমি তো জেগেই ছিলুম। কখন থেকে শুনছিলুম, এ ঘরে যেন বেড়াল ডাকছে। ভাবলুম, দুই বেড়ালে ঝগড়া বেধেছে।
জগমোহন অতি কষ্টে বললেন,–এক গ্লাস জল।
হ্যাঁ, কথাটা তো ঠিক। দুই বেড়ালের ঝগড়া বলা যায়। কিন্তু ঝগড়াটা টাকা নিয়ে। লটারির টাকা। ব্যাপারটা ভারি রহস্যময়। মাথামুন্ডু খুঁজে পাচ্ছেন না জগমোহন।
জল খেয়ে সুস্থ হয়ে জগমোহন বললেন, কী বলছিলে বউমা, বেড়ালের ঝগড়া না কী?
অরুণা বললেন, হ্যাঁ। মনে হচ্ছে দুটো বেড়াল ঝগড়া করতে করতে আপনার মশারির ওপর পড়েছিল।
জগমোহন জোরে মাথা নেড়ে বললেন, না। টাকা! লটারির টাকা।
তার মানে?–প্রণবেশ অবাক হয়ে বললেন,–বাবা, লটারির টাকা মানে কী?
জগমোহন ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হাঁটু মুড়ে খাটের তলায় ঢুকলেন। বাড়ির লোকেরা হতবাক। দিবু ঘুমজড়ানো চোখে তাকিয়ে বলল,–ও দাদু! ওখানে ঢুকছ কেন? বেড়ালের ভয়ে? হি হি হি হি।
তাই শুনে রাঁধুনি হরুঠাকুর, কাজের লোক আন্নাকালী আর চাকর নবা পরস্পর চাওয়া-চাওয়ি করে ফিকফিক করে হাসতে লাগল। অরুণা ধমক দিয়ে বললেন, এতে হাসির কী আছে? যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো সব। সকাল সকাল উঠতে হবে। দেওঘরের ঠাকুরপো আসবেন না কাল? কত কাজ?
ওরা ব্যাজার মুখে যে-যার জায়গায় চলে গেল।
খাটের তলায় ঘষটানো শব্দ হচ্ছিল। জগমোহন কী একটা টেনে বের করছেন।
একটা পুরোনো সুটকেস। একদিকে ছোট্ট তালা আটকানো। সুটকেসটা টেবিলে রেখে জগমোহন বললেন, একেবারে ভুলে গিয়েছিলুম। হায় ভুলো মন! মোনাই ফকির খুন হওয়ার কদিন আগে এটা আমায় রাখতে দিয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছে, ডাকাতব্যাটারা খামোকা বেচারাকে খুন করে গেল। খামোকাও হয়তো নয়, রাগে। টাকাগুলো পেলে খুন করত না। পায়নি বলেই রেগেমেগে মুণ্ডু কেটে ফেলেছিল। কিন্তু দেখো, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এই সুটকেসের মধ্যে…কী ভুল! কী ভুল!
প্রণবেশ বললেন,–ও বাবা, ব্যাপারটা কি বলবেন খুলে?
জগমোহন দাঁত খিঁচিয়ে বললেন,–বলব আবার কী? মোনাই-ফকিরের টাকা। শিগগির একটা জাবির গোছা আন। তালা না খুললে ভাঙতেই হবে শেষপর্যন্ত।
.
মোনাই-ফকিরের আস্তানা ঘিরে জগমোহন একটা অনাথ আশ্রম বানিয়ে দিয়েছেন। অনাথ ছেলেমেয়েরা সেখানে লেখাপড়া শিখছে। কারিগরি কাজ শিখে মানুষ হচ্ছে।
মোনাইয়ের লটারির টাকা। জগমোহনও কিছু দিয়েছেন নিজের পুঁজি থেকে। আজকাল সেই অনাথ আশ্রম নিয়েই থাকেন তিনি! বাকি জীবনের জন্য একটা ভালো কাজ পেয়ে গেছেন।
আর কালো বেড়ালটা?
শেষবার দেখেছিলেন অনাথ আশ্রম উদ্বোধনের দিন। কলকাতা থেকে এক মন্ত্রীমশাই গিয়েছিলেন উদ্বোধন করতে। জগমোহন দেখেছিলেন অত ভিড়ের মধ্যে কালো বেড়ালটা দিব্যি এসে তাঁর দু-পায়ের ফাঁকে কিছুক্ষণ বসে থাকল। পা শিরশির করছিল। তবু আর ভয় পাননি জগমোহন। এমন কী যাওয়ার সময় বেড়ালটা মিউ বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেল।
মোনাই-ফকিরের আত্মার শান্তি হয়েছে! আর জগমোহনকে জ্বালাতে আসে না।
অবশ্য জগমোহন এখন কদাচিৎ কালো বেড়াল দেখলে চমকে ওঠেন। তবে আর মারমার বলে তাড়া করেন না। এরা তো ভূত নয়, নেহাত পাড়ার হুলো। একটু হেসে বেড়ালের ভাষায় ধমক দিয়ে শুধু বলেন, মিউ। অর্থাৎ তুই আবার কে রে? ভাগ-ভাগ!…
কৃতান্তবাবুর কাঁকুলে যাত্রা
বাস থেকে নেমে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল কৃতান্তবাবুর। ভুল জায়গায় নামিয়ে দেয়নি তো কন্ডাক্টর! পাকা রাস্তার দুধারেই ধু-ধু মাঠ। দিগন্তে ধোঁয়ার মতো যা দেখা যাচ্ছে, তা নিশ্চয় গ্রাম। কিন্তু এই প্রখর রোদূরে পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছতে শরীরের অর্ধেক রক্ত ঘাম হয়ে বেরিয়ে যাবে যে।
হ্যাঁ, ঘাম হয়ে। শরীরের রক্তই যে ঘাম হয়ে বেরোয়, তাতে কৃতান্তবাবুর এখন আর কোনও সন্দেহ নেই। এই ধু ধু মাঠ, লোক নেই, জন নেই, গাছ নেই, পালা নেই, যাকে তেপান্তর বলা হয় রূপকথায়–সেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক এমন কথাই মনে হবে মানুষের।
বৈকুণ্ঠবাবুকে না জানিয়ে এভাবে হুট করে এসে পড়াটা ভালো হয়নি। জানিয়ে এলে তিনি পাকারাস্তার মোড়ে গাড়ি-টাড়ি নিশ্চয় রাখতেন! বৈকুণ্ঠ পয়সাওলা মানুষ।
পরক্ষণে কৃতান্ত মোড়ের কাঁচারাস্তাটা দেখে ভাবলেন–হ্যাঁ, গাড়ি ঠিকই রাখত বৈকুণ্ঠ। তবে নির্ঘাৎ সেটা গরু বা মোষের গাড়ি। অবশ্য ওর জিপ থাকাও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু যে কিপটে মানুষ, রিটায়ার করার পর দেশের বাড়ি গিয়ে জিপ কিনবে? তাহলেই হয়েছে।
কমাস আগে কলকাতায় দেখা হয়েছিল দুই বন্ধুর। দুজনেরই বয়স হয়েছে। চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। কৃতান্ত থাকেন বড়ছেলের কাছে। বৈকণ্ঠ গ্রামে পৈতৃক ভিটেয় গিয়ে উঠেছেন। কিছু জমিজমাও আছে। ছেলেপুলে নেই, আছে এক ভাগ্নে। সেই এতদিন সব দেখাশোনা করছিল। এখন মামা-ভাগ্নে মিলে নাকি উন্নত প্ৰথায় চাষবাস করছেন। কথায় কথায় বৈকুণ্ঠ বলেছিলেন, মন খারাপ করলে সোজা চলে যেও ভাই কেতো। কীভাবে যেতে হবে, বলে দিচ্ছি।
পথ ঠিকই বাতলে দিয়েছিলেন বৈকুণ্ঠ। ওই তো কাঁচারাস্তা মাঠের বুকে সোজা চলে গেছে। ওই রাস্তায় তিন মাইল গেলেই বৈকুণ্ঠের গ্রাম কাকুলিয়া। কিন্তু বৈকুণ্ঠ সবই বলেছিলেন,–শুধু বলেননি মাঠটা অবিকল রূপকথার সেই তেপান্তর–আর এই এলাকার আকাশে সূর্যদেবও বেজায় রাগী। বাপ! সবে তো দশটা বেজেছে, এরই মধ্যে মেজাজ কী তিরিক্ষি। কটমট করে তাকাচ্ছেন কৃতান্তের দিকে রোস্ট করে খেয়ে ফেলবেন একেবারে।
