জগমোহন অমনি লাঠি তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন,–মার। মার। মার।
দিবু অবাক হয়ে বলল, কী হল দাদু? কী হল? কাকে মারতে যাচ্ছ?
জগমোহন হাঁপাত-হাঁপাতে লাঠি তুলে বললেন,–ওইগুই কালো বেড়ালটাকে।
বেড়াল! –দিবু আরও অবাক।–কই, কোথায় বেড়াল?
–ওই তো! দেখতে পাচ্ছিসনে? ওই যে!
দিবু হাসতে লাগল।–তোমার চোখ খারাপ দাদু। ওটা তো একটা কালো কাঠ পড়ে রয়েছে। সে দৌড়ে গিয়ে একটুকরো কাঠে লাথি মারল।
জগমোহন দেখলেন, বেড়ালটা সত্যি কাঠ হয়ে গেছে। তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে পা বাড়ালেন। মনটা ভালো হয়ে গেল। একেই বলে রজুতে সর্পভ্রম অর্থাৎ দড়িকে সাপ মনে করা। ছ্যা-ছ্যা কী লজ্জার কথা।
কিন্তু কিছুটা গিয়েই হঠাৎ মনে হল, যেন চাপাস্বরে বেড়ালটা ডাকল–মিউ! অমনি ঘুরলেন। ঘুরেই আঁতকে উঠলেন। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।
সেই কালো বেড়ালটা পেছন পেছন আসছে!
জগমোহন ফের লাঠি তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন,–মার! মার! মার!
দিবু এবার রেগে গেল! বলল,–ও দাদু! আবার কী মারতে যাচ্ছ?
জগমোহন কাঁপতে কাঁপতে বললেন,-বেড়াল! সেই কালো বেড়াল।
–কই বেড়াল?
–এই তো!
দিবু আরও রাগ দেখিয়ে বলল, তোমার মুন্ডু। আমি চললুম।
কালো বেড়ালটা এখন একটু সরে গিয়ে রাস্তার পিচে বুক ঠেকিয়ে বসেছে। এ রাস্তাটা খাঁ-খাঁ নির্জন। জগমোহন প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, দিবু! দিবু যাসনে। কাটলেট, রসমালাই!
তখন দিবু দাঁড়াল। তারপর হাসতে-হাসতে বলল,–বেড়ালকে এত ভয় কীসের বলো তো? বেড়াল ইজ বেড়াল।
জগমোহন হাঁটেন আর বারবার পিছু ফেরেন। আশ্চর্য! কালো বেড়ালটার সঙ্গে তার দূরত্ব সেই একই থেকে যাচ্ছে! ভিড়ে ভরা বড়রাস্তায় পৌঁছে অবশ্য আর তাকে দেখতে পেলেন না।
সেই রাতে জগমোহন অস্থির। চোখে ঘুম নেই।
একটা ব্যাপার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কালো বেড়ালটাকে তিনি একা দেখতে পান, আর কেউ পায় না। দিবু দেখতে পায়নি তো!
আর তার চেয়েও বড় কথা, দিবুকেও বেড়ালটা গ্রাহ্য করল না। একবার বেমালুম কাঠে রূপান্তরিত হল।
দ্বিতীয়বার তার সামনে অদৃশ্য হয়ে রইল। শুই তাই নয়, জগমোহনকে অনুসরণ করল কতদূর।
অতএব বেড়ালটা সেই মোনাইফকিরের আত্মা, অর্থাৎ ভূত। হায়-হায়! এতকাল পরে এই বুড়োবয়সে জগমোহন একটা ভূতের পাল্লায় পড়লেন?
কথাটা যত ভাবছেন, আতঙ্কে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে আর কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। ফকিরের ভূত তার গলা কামড়ে ধরবেই ধরবে।
বাড়িটা শহরের শেষপ্রান্তে। জগমোহনের ঘরের পেছনে জঙ্গুলে জায়গা খানিকটা। তার ওধারে সেই নদী! এমন জায়গায় বাড়ি করাই ভুল হয়েছিল।
তার ওপর মশারও খুব উপদ্রব বারোমাস।
তবে একটা সুবিধে হয়েছে দেখা যাচ্ছে। মশারির ভেতর শুয়ে থাকার ফলে রাতের বেলা নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন। বেড়াল তোক আর ভূতপ্রেতই হোক, মশারির ভেতর ঢুকতে পারবে কি? না পারাই উচিত। কোন বইয়ে যেন পড়েছিলেন, মশারির ভেতর মানুষ খুব নিরাপদ!
দেয়ালঘড়িতে টকটক শব্দ। তারপর ঢংঢং করে রাত বারোটা বাজল। আর তারপরই জগমোহন শুনলেন, মিড। অমনি চমকে মুখ তুললেন।
বাইরে অন্য পাশের রাস্তার আলো ত্যারচা হয়ে একটা জানালায় পড়েছে। আর সেখানে ফের আবির্ভূত হয়েছে সেই কালো বেড়াল। জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ। মশারির ভেতর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গোঁফের তলায় তেমনি একটা হাসিও। হাসিটা এখন কেমন ক্রুর। কালো বেড়ালটা ফের বলল–মিউ।
জগমোহন ততক্ষণে একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাঁদরের বেলায় যেমন, তেমন ভূতের বেলাতেও এক কথা। বেশি পাত্তা দিতে নেই। পাত্তা দিলেই মাথায় উঠে বসবে। ভূতকে ভয় করলেই ভূত আরও পেয়ে বসবে।
অতএব জগমোহন ভয় চেপেচুপে রেখে সোজা ভেংচি কাটলেন ভূত অর্থাৎ কালো বেড়ালকে, মিউ।
কালো বেড়ালও সঙ্গে সঙ্গে বলল,-মিউ! আর এতক্ষণে জগমোহন টের পেলেন, তিনি বেড়ালের ভাষা বুঝতে পেরেছেন। কী বলছে, ঠাহর হচ্ছে। কালো বেড়াল বলছে, টাকা।
অ্যাঁ টাকা! জগমোহনের টনক নড়ল। বেড়ালের ভাষায় বলে উঠলেন, মিয়াও! মিয়াও! টাকা? কীসের টাকা?
কালো বেড়াল বলল,–ম্যাঁও! ম্যাঁও! কেন? লটারির টাকা?
ওরে বাবা! বলে কী ব্যাটা! লটারির টাকা মানেটা কী?
জগমোহন হতভম্ব হয়ে বললেন,–মিঁই-ই! অ্যাঁ! বলল কী হে?
মিঁ-ও-ও! মিঁ-ও-ও! কেন উকিলবাবু, আমার লটারিতে পাওনা টাকার কথা ভুলে যাচ্ছেন!
মিঁউ, মিঁউ! কী মুশকিল! তোমার লটারির টাকা তো তোমায় খুন করে ডাকাতব্যাটারা নিয়ে পালিয়েছে–জগমোহন বললেন, ও বুঝেছি। তা তুমি কি আমাকে মামলা করতে বলছ তোমার হয়ে? মলো ছাই! ডাকাতব্যাটাদের কি আমি চিনি! তুমি বরং দারোগাবাবুর কাছে যাও। তিনি তোমার টাকা উদ্ধার করে দেবেন। ও ব্যাটাদের জেলে পুরবেন। যাও দিকি বাবু দারোগার কাছে।
–ম্যাঁও-ম্যাঁও! ওকথা বললে তো চলবে না উকিলবাবু।
ম্যাঁ-অ্যাঁ-ও–চলবে না মানে? আমি তো কবে ওকালতি ছেড়ে দিয়েছি হে!
–মিঁউ মিঁউ মিঁউ। টাকা টাকা টাকা! কোনও কথা শুনব না। টাকা চাই।
জগমোহন বিব্রত হয়ে মানুষের ভাষায় বললেন, কী আপদ! ভাগো, ভাগো বলছি। নইলে লাঠিপেটা করব।
কালো বেড়াল এবার নিজের ভাষায় তবে রে, বুড়ো! বলে এক লাফে তাঁর মশারির ছাদে এসে পড়ল। অমনি পটাপট দড়ি ছিঁড়ে মশারি আর বেড়াল পড়ল জগমোহনের ওপর। মুহূর্তে হুলুস্থুল ঘটে গেল। জগমোহন আর্তনাদ করতে লাগলেন, বাঁচাও! বাঁচাও! বাঁচাও। মশারির ভেতর জড়িয়ে-মুড়িয়ে খাটের নিচে পড়ে গেলেন। বাড়ির সবাই জেগে গেল। দরজায় ধাক্কা দিতে থাকল। কিন্তু দরজা খুলবে কে? শেষে প্রচণ্ড ধাক্কায় কপাট ভেঙে ফেলা হল। তারপর মশারি থেকে উদ্ধার করা হল জগমোহনকে।
