কাঁপা কাঁপা হাতে মুরারিবাবু স্টেটমেন্টের তলায় নাম-ঠিকানা লিখে থানা থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ একটু থেমে গিয়ে ভাবলেন বড়বাবুকে কি বলে আসবেন, খুনি বেচুলাল ঠিক কথাই বলেছিল তার দুই স্যাঙাতকে!
কিন্তু আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। পুলিশের আইনে ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই। তাছাড়া আসল ঘটনা খুলে বলতে গিয়ে হয়তো নিজেও এই খুনের কেসে জড়িয়ে যাবেন। পুলিশ ভূতপ্রেতের চেয়ে সাংঘাতিক। তার চেয়ে চুপচাপ কেটে পড়াই নিরাপদ।
তবে হ্যাঁ। একটা কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সুশীলবাবুর আত্মা যেন ঠিক এটাই চেয়েছিলেন। মুরারিবাবুর মতো ভালোমানুষ শেষ অবধি তার ছড়িটা থানাতে জমা না দিয়ে পারবেন না। তাই ছড়িটা ওইভাবে বেঞ্চে তাঁর কাছে ফেলে রেখে সুশীলবাবুর আত্মা উধাও হয়ে গিয়েছিলেন।…
কালো বেড়াল
এই নিয়ে পরপর তিন দিন। দিন না বলে সন্ধেবেলা বলাই উচিত। জগমোহন শবেড়াতে বেরিয়ে ঠিক একই জায়গায় একটা কালো বেড়াল দেখতে পেলেন।
কালো বেড়াল এমন কিছু বিদঘুঁটে প্রাণী নয়। কিন্তু একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? আর জায়গাটাও তো সন্দেহজনক। গদাইবাবুর আমবাগানে। কিছুদিন আগে যেখানে মোনাই-ফকিরের লাশ পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল, সেখানেই।
মোনাই-ফকিরের আস্তানা একটু দূরে অবশ্য। সে নাকি লটারিতে অনেক টাকা পেয়েছিল। তারপর ডাকাত পড়েছিল রাত্রিবেলা। সকালে দেখা গেল ফকিরের লাশ পড়ে আছে গদাইবাবুর বাগানের ধারে। ধরো আর মুন্ডু আলাদা। সে এক বীভৎস দৃশ্য।
মোনাই-ফকির কালো আলখাল্লা পরে থাকত। মাথার টুপিও ছিল কালো। গাঁজার নেশায় সব সময় চোখদুটো রাঙা। আস্তানা বলতে একটা পুরানো বাদশাহি আমলের মুসলমান সাধুর কবরের ওপরের পাথরের একতলা ঘর। কবরের পাশেই মোনাই-ফকির খেত, ঘুমোত। ওখানেই তার সংসার আর সাধনভজন। হাটবারে লোকেরা এসে তার কাছে ওষুধ চাইত। ভূত-ভবিষ্যৎ জানতে চাইত। পয়সাকড়ি দিত।
এহেন ফকিরমানুষ লোভের বশে লটারির টিকিট কিনেছিল। একেবারে নাকি ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিল। কমপক্ষে লাখ টাকা তো বটে। চারদিকে হইচই পড়ে গিয়েছিল এই খবরে।
কথায় বলে লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। ফকিরবেচারা প্রাণে মারা পড়ল।
জগমোহন রোজ নদীর ধার অবধি বেড়াতে যান বিকেলে। সন্ধেবেলা লাঠি ঠুকঠুক করে বাড়ি ফেরেন। ওই সব কথা ভাবতে-ভাবতেই হাঁটেন। আমবাগানের ধারে এসে একবার তাকান জায়গাটার দিকে এবং শিউরে ওঠেন। মনে হয়, আবছা আঁধারে ধড় আর মুণ্ডু আলাদা রেখে ফকির শুয়ে আছে এবং মুন্ডুটা যেন মিটিমিটি হাসছে তাঁর দিকে তাকিয়ে।
অমনি জগমোহন চলার গতি বাড়ান। গলার ভেতর রামনাম দু-চারবার হয় না, এমন নয়!
তারপর এক সন্ধেয় হঠাৎ এই কালো বেড়ালের আবির্ভাব। প্রথম দিন বিশেষ গা করেননি। দ্বিতীয় দিন একটু চমকে উঠেছিলেন। তৃতীয় দিন তো ভীষণ ভড়কে গেলেন ফকিরের কালো আলখাল্লার কথা মনে পড়েই।
জগমোহন এই মফস্বল শহরের একজন রিটায়ার্ড উকিল। বয়স হয়ে গেছে। মাথার চুল তুলোর মতো সাদা। বিকেলবেলা কিছুক্ষণ নদীর ধারে পার্কে গিয়ে না বসলে জীবন বড্ড একঘেঁয়ে লাগে। রাশভারী চেহারার মানুষটি যখন মোটাসোটা ছড়ি অর্থাৎ রীতিমতো লাঠিটি নিয়ে ঠুকঠাক করে হেঁটে যান, পথে সবাই খুব সম্ভ্রম রেখে কথা বলে।
সন্ধেবেলা গদাইবাবুর বাগানের ওদিকটায় রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে মিটমিটে আলো ছড়ায়। সেই আলোয় কালো বেড়ালের জ্বলজ্বলে হলুদ চোখজোড়া যেন জগমোহনের মনে গেঁথে গেল। সে-রাতে আর ঘুমোতেই পারলেন না। চোখ বুজলেই দেখতেন যেন কালো বেড়ালের হলুদ চোখজোড়া। আতঙ্কে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায় বুঝি।
পরদিন বিকেলে আর একা বেড়াতে যেতে ভরসা পেলেন না। ব্যাপারটা কাকেও যে বলবেন, তাও খুব লজ্জা করে। একসময়কার বাঘা উকিল জগমোহন বেড়ালের ভয়ে কাবু–এ বড় খিটকেলের কথা নয়? সবাই হাসাহাসি করবে, আদালতের তাবড় তাবড় দুদে হাকিমকে যিনি ভয় পেতেন না, তিনি সামান্য বিড়াল দেখে ভয়ে পেয়েছেন?
নাতি দিবু খুব ডানপিটে ছেলে। সদ্য ক্লাস নাইনে উঠেছে। এরই মধ্যে সবরকম খেলাধুলায় নাম কুড়িয়েছে। জগমোহন দিবুকে আজ সঙ্গে নিলেন। দিবু কি খেলা ছেড়ে বিকেলবেলাটা বুড়ো দারুর সঙ্গে বেড়াতে বেরোবার ছেলে? অনেক বলেকয়ে লোভ দেখিয়ে তবে সে রাজি হল। ফেরার পথে মেধোর বেঁস্তোরায় কাটলেট কিংবা অম্বুর মিষ্টান্নভাণ্ডারে যথেচ্ছ রসমালাই খাওয়াবার কথা দিলেন জগমোহন। দিবু কাটলেট আর রসমালাইয়ের ভীষণ ভক্ত।
দিবু যখন সঙ্গে আছে, জগমোহনের তখন ভয় কীসের? এখন তিনি আলেকজান্ডার দি গ্রেট। কই এবার আয় দেখি ব্যাটা কালো বেড়াল অথবা মোনাই ফকির আমার সামনে। মাথা ছাতু করে ফেলব না?
আজ পার্ক থেকে একটু দেরি করেই ফিরছিলেন জগমোহন। দিবুর সঙ্গে আদালতের গল্প করতে করতে আসছিলেন। কোন হাকিম এজলাসে বসে ঢুলতেন, কোন হাকিম মামলার রায় পড়ার আগে জোর হেঁচে ফেলতেন, এইসব ক্যারিকেচার শুনে দিবু হেসে খুন হচ্ছিল। রাশভারী, গম্ভীর চেহারার দাদুকে এমন রসিকতা করতে শোনেনি সে।
কখন গদাইবাবুর আমবাগানের কাছে এসে পড়েছেন খেয়াল নেই। এসে যেই ডাইনে মুখ ঘুরিয়েছেন আর দেখতে পেয়েছেন সেই বিদঘুঁটে কালো বেড়ালটাকে। একই ভঙ্গিতে বসে আছে। তীব্র জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ। তেমন চাউনি। আর আজ যেন গোঁফের তলায় কেমন একটা হাসিও রয়েছে।
